হুতুমপেঁচা বলছি

এবং আমাদের দেশের অসুস্থ প্যারেন্টিং

জোবায়দা ফাতেমাঃ আমাদের দেশে এখনও সুস্থ প্যারেন্টিং এর চর্চা হয়না। যদি হয়েও থাকে ‘লাখো মে এক’ বলা যায়।
আজকের নিউজ জাবির এক ছোট বোন ব্রেক আপ এবং পারিবারিক ইস্যুতে আত্মহত্যা করেছে। এটাকে কি আত্মহত্যা বলবো, নাকি পরিবার কর্তৃক হত্যা বলবো? 
কৈশোর বয়সে ছেলে মেয়েরা অনেক রকম ভুল করে করতেই পারে, করাটাই স্বাভাবিক। এই সময়ে সেই কিশোর/ কিশোরীকে পরিবার কিভাবে হ্যান্ডেল/ ডিল করছে তার উপর নির্ভর করে তার পুরো ভবিষ্যৎ।
এখন আমি / আমরা মধ্যবয়সী। ফেইসবুকে ব্যাচভিত্তিক গ্রুপের কারণে সমবয়সী অনেকের অনেক স্মৃতি, ঘটনা, পুরনো কথাগুলো শুনি, জানি। অনেককেই দেখি যে যদি তারা কৈশোর এবং যৌবনের প্রারম্ভে পরিবারকে ঠিকভাবে পাশে পেত তাহলে এখন অনেক উন্নতি করতে পারত, অনেক সাফল্য ছুঁতে পারত জীবনে। কিন্তু সেটা না হবার কারণে একা চলে, একা নিজের ভুলগুলো টেনে জীবনে অনেক পিছিয়ে পড়েছে, যার ফলাফল হতাশা, হীনমন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা। এবং এই চিত্র নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই।
কৈশোরকালীন যে পরিবর্তন মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক এবং তার কারণে বিপরীত লিংগের কারো প্রতি আকর্ষণ নতুন নতুন অনুভব করা এবং প্রেমের অনুভূতি, সেকারণে হয়ত ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া এগুলো সাধারণ, হতেই পারে। কিন্তু তার ফলাফলে একটা জীবন কেন নষ্ট হয়ে যাবে? একটা জীবন কেন ঝরে পড়বে?
এইসকল কিছুর প্রতিরোধ এবং প্রতিকার আমরা কী রেখেছি? কতটুকু রেখেছি?
কৈশোরের সময়টাতে কতজন বাবা মা ছেলে মেয়ের বন্ধু হতে চায়? কোনরকম জাজমেন্ট বা বিচারে না গিয়ে শুধুমাত্র বন্ধু হয়ে তার মনস্তত্ত্ব, তার চাওয়া পাওয়া, স্বপ্নকে বুঝতে চায়?
আমরা তো নিজেদের অনেক আধুনিক, ক্ষেত্রবিশেষে উত্তরাধুনিক ভাবি৷ কিন্তু ভেবেই কি শেষ! যদি ভাবিই তার প্রমাণ কোথায়?
পাপুয়া নিউগিনির কোন এক আদিবাসী সমাজের (এই মুহুর্তে নাম এবং রেফারেন্স মনে নেই) অতি পুরাতন রীতি, প্রথা অনুযায়ী একজন ছেলে বা মেয়ে যখন কৈশোরে পদার্পণ করে তখন ছেলের ক্ষেত্রে সমাজের পুরুষরা এবং মেয়ের ক্ষেত্রে সমাজের নারীরা তাকে নিয়ে বসে একধরণের সামাজিক কাউন্সেলিং করে।
আমরা কি করি?
আমাদের পিতামাতাদের এক দফা এক দাবী পড়ালেখা, ভালো রেজাল্ট। কিশোর/ কিশোরী কিছু করে ফেললে, ‘কি করলি! সমাজের কাছে মুখ রাখলি না! বাবা মায়ের মুখে চুনকালি দিলি!’ ব্যস। ক্ষেত্রবিশেষে, ‘বের হয়ে যা বাড়ি থেকে! মুখ দেখতে চাইনা! আজ থেকে ভাববো একটা সন্তান কম! খোদা/ ঈশ্বর আমার ঘরেই কেন এরকম কুলাংগার দিল!’
ডিয়ার প্যারেন্টস, একটা বার ভেবে দেখেছেন কি করছেন সন্তানের সাথে? এর রেশটা কত গভীর, কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে?
শুধুমাত্র যেখানে প্যারেন্ট/ অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব ছিল বিকেল/ সন্ধ্যায়/ ছুটির দিনে সময় করে সন্তানের সাথে গল্প করা। গল্পচ্ছলে তার জীবনে কি ঘটছে তা জানা, প্রয়োজনে বন্ধুবেশে কাঁধে হাত রেখে দিকনির্দেশনা দেয়া।
সন্তানকে সাথে নিয়ে একবেলা ঘুরতে যান, শপিং এ যান, বা রেস্টুরেন্টে যান, বা পিকনিকে যান। তার সাথে খেলাধুলা করুন। তাকে বুঝুন/ বুঝতে চেষ্টা করুন, তাকে বোঝান।
জীবনটা অনেক বড়, অনেক পরিব্যাপ্ত। নিজে অনুধাবন করুন, এবং সন্তানকেও অনুধাবন করতে শেখান। কোন একটা ক্ষুদ্র ঘটনা, ছোট্ট ভুলের প্রেক্ষিতে একটা জীবন যেন ঝরে না যায়, থেমে না যায়, একটা স্বপ্ন যেন মরে না যায়।।