সেলুলয়েডের গল্প

একজন সফল রাষ্ট্রপ্রধান কিন্তু একজন ব্যর্থ প্রেমিক – এরশাদ

“আমি কোন মেয়ের কাছে যাই না। মেয়েরাই আমার নিকট আসে। মূলত: আমার চেহারা আর অভিব্যক্তির মধ্যেই এক ধরনের প্রেমিক প্রেমিক ভাব আছে”। – হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এভাবেই নিজের প্রেমিক জীবনের বর্ননা করতেন।  হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রেমিকার লাইন ছিলো অনেক লম্বা। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা মারফত যতদুর জানা যায়, এরশাদের প্রেমিকার তালিকায় ছিলেন শাকিলা জাফর, বিদিশা, মেরি, নাশিদ কামাল, জিনাত মোশাররফ, নীলা চৌধুরী, সালমা বিন হেনা, আমেনা বারী প্রমুখ। এরশাদের পরকীয়া কাহিনী তৎকালীন ‘সাপ্তাহিক যায় যায় দিন’ পত্রিকায় ছাপা হয়।

রওশন এরশাদঃ পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি বিয়ের পর দূরে থাকা স্ত্রীকে প্রচুর চিঠি লিখতেন। চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে সম্বোধন করতেন ‘হৃদয়ের রানী’ ‘হৃদয়ের ধন’ ‘ওগো মোর জীবন সাথী’ ‘খুশি বউ’ ‘খুশি পাগলী’ ‘সোনা বউ’ ‘খুকু বউ’ ‘ওগো দুষ্টু মেয়ে’ ‘নটি গার্ল’ ‘বিরহিনী’ ইত্যাদি অবিধায়। স্ত্রীর ডাকনাম ডেইজী হওয়ায় ভালবেসে ডাকতেন ডেজু, ডেজুমনি, ডেজুরানী। চিঠির শেষে নিজের পরিচয় লিখতেন ‘পেয়ারা পাগল সাথী’ ‘বড্ড একাকী একজন’ ‘প্রেম-পূজারি’ ‘বিরহী’ ইত্যাদি। ৬২ বছরের সংসার জীবন। স্ত্রীকে নিয়ে বিশ্বের বহুদেশ ঘুরেছেন। ৯ বছর দেশ শাসন করেছেন। স্ত্রীকে রাজনীতিতে এনে এমপি, মন্ত্রী এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতাও বানিয়েছেন। সেই স্ত্রী এখন অসুস্থ স্বামীর খোঁজ নেন না। গুরুত্বর অসুস্থ স্বামীকে দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। যাদের সম্পর্কে এই কথাগুলো বলা হলো তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বেগম রওশন এরশাদ। এরশাদের ডাক নাম পেয়ারা ও রওশনের ডাক নাম ডেইজি। ১৯৫৬ সালে বিয়ের পর সেনা কর্মকর্তা স্বামী এরশাদকে চাকরিতে এখানে সেখানে থাকতে হয়। আর পড়াশুনার জন্য স্ত্রী রওশন এরশাদ ডেইজিকে এক বছর থাকতে হয় বাবার বাড়ি ময়মনসিংহে। তখন এইচ এম এরশাদ দূরে থাকা স্ত্রীর বিরহে লেখা চিঠিতে এই শব্দগুলো ব্যবহার করেন। স্বাম-স্ত্রীর সেই স্বর্ণালী দিনগুলো এখন যেন হয়ে গেছে তামাটে।
কবি এরশাদ নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, বিয়ের পর সংসার করার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। রওশন ওদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছিল। চাকরির জন্য আমি আজ এখানে কাল ওখানে। সে সময় দূরে থাকা স্বামীরা স্ত্রীদের কাছে চিঠি পাঠাতো। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। বহু চিঠি লিখেছি; চিঠির প্রথমে রওশনকে অনেকভাবে ‘সম্বোধন’ করতাম।

মেরিঃ এরশাদ আশির দশকে মেরি নামের এক নারীকে গোপনে বিয়ে করেছিলেন বলে শোনা যায়। যদিও মেরিকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা গেছে। এরশাদ নিজে কখনো এই বিয়ের কথা স্বীকারও করেননি। কথিত আছে, এরশাদ তার শাসনামলে যে বিপুল অংকের সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন তার কিছুটা তিনি মেরিকে দিয়েছিলেন। এরশাদের ক্ষমতাগ্রহণের বছর দুয়েক পর মেরির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় তার। বিচ্ছেদের পর মেরিকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে শোনা যায়। এক সন্তানের জননী মেরি ২০১৫ সালে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকা যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান তার সাপ্তাহিকের মাধ্যমে এরশাদের মেরিকে বিয়ে করার বিষয়টি সবিস্তারে সামনে নিয়ে আসেন। তাদের বিয়ের তথ্য প্রমাণসহ প্রকাশিত সংবাদের কারণে সাংবাদিক শফিক রেহমানকে প্রায় চার মাস জেলও খাটতে হয়।

জিনাত মোশাররফঃ এরশাদের ডজনখানেক বান্ধবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে জিনাত মোশাররফের নাম। ক্ষমতায় থাকাকালে জিনাতের সঙ্গে এরশাদের পরকীয়া ছিল ওপেন সিক্রেট। এরশাদের সঙ্গে নামের মিল রেখেই জিনাত মোশাররফ জিনাত হুসেইন নাম গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। তার সঙ্গে পরকীয়া নিয়ে একটি সংবাদপত্রে খোলামেলা সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন এরশাদ। এরপরই সাবেক মন্ত্রী মোশাররফের সঙ্গে জিনাতের ঘর ভাঙে। এরশাদ ১৯৯৭ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি একজনকে ভালোবাসতাম।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘তিনি কি জিনাত মোশাররফ?’ জবাবে এরশাদ বলেন, ‘অফকোর্স, তোমরা আমার ছেলের মত। তার নামটা লিখো না প্লিজ !’

বিদিশা সিদ্দিক

বিদিশা সিদ্দিকের সঙ্গে এরশাদের বিয়ের বিষয়টি সবারই জানা। প্রায় ছয় বছরের পুরো জেল জীবনে বিদিশার সাথে চুটিয়ে প্রেম করেন এরশাদ। ২০০০ সালে বিদিশাকে বিয়ে করার বিষয়টি ফাঁস করেন তিনি। সেদিন ছিল তাদের ছেলে এরিকের প্রথম জন্মদিন। বিদিশার সঙ্গে এরশাদের সংসারও বেশিদিন টেকেনি। চার দলীয় জোট সরকারের সময় বিদিশাকে তালাক দিয়ে চুরির মামলায় জেলে পাঠান এরশাদ।  বিদিশা বর্তমানে বাংলাদেশেই থাকেন। এরশাদের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘শত্রুব সঙ্গে বসবাস’ নামে একটা বইও লিখেছেন বিদিশা।

শাকিলা জাফরঃ এরশাদের আলোচিত আরেক প্রেমিকা কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর বা শাকিলা শর্মা ! এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে একপর্যায়ে বিটিভির পর্দা দখলে থাকত তার। এরশাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুরু হত তার গান দিয়ে। ১৯৮৩ সালে বিটিভির ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে ‘তুলা রাশির মেয়ে’ গানটির মাধ্যমে শাকিলার পরিচিতি ঘটে দর্শক, শ্রোতাদের সঙ্গে। এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি বেশ কয়েকবছর আত্মগোপনে ছিলেন। শাকিলা শর্মা প্রথমে মান্না জাফরকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তার নামের সাথে “জাফর” যুক্ত হয়। এই দম্পতির একটি সন্তান আছে। কিন্তু শাকিলা শর্মা ও মান্না জাফরের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। এর দীর্ঘদিন পর শাকিলা শর্মা ভারতের মুম্বাই শহরের একজন কবি রবি শর্মাকে বিবাহ করেন। বিয়ের পর তার নাম হয় শাকিলা শর্মা। তিনি এখন ব্যস্ত ‍আছেন সঙ্গীতচর্চা নিয়ে।

 

নাশিদ কামালঃ এরশাদের আরেক প্রেমিকা নাশিদ কামাল সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে। এরশাদের সাথে সম্পর্কের অবনতির পর ক্যাপ্টেন মুসাকে বিয়ে করেন। তবে বিয়েটি টেকেনি। মুসা ও নাশিদ কামালের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায। নাশিদ কামাল এখন টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনির্ভিসিটিতে শিক্ষকতাও করেন।

নীলা চৌধুরীঃ প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীও ছিলেন এরশাদের আলোচিত পরকীয়ার তালিকায়। বছর কয়েক আগে তার স্বামী কমর উদ্দিন চৌধুরী মারা গেছেন। তিনি এখন সিলেটে থাকেন।

 

প্রথম প্রেমিকার কথা জানাতে গিয়ে আত্মজীবনীতে ‘সেই চিঠি: ভালো লাগার প্রথম অনুভূতি’ অধ্যায়ে এরশাদ বলেছেন, ওই সময় রংপুরের কারমাইকেল কলেজে বিএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। তার নিজের ভাষায়, ‘আমার নিচের ক্লাসের একটি মেয়ে একদিন আমাকে একটি চিঠি লেখে। প্রতিদিন ও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কলেজে আসত’। (পৃষ্ঠা: ৬৫)

এরশাদ জানিয়েছেন, প্রায় ৬৬ বছর আগের সেই সময়ে ছেলেমেয়ের মধ্যে কথা বলার রেওয়াজ ছিল না। চিঠির আদান-প্রদান ছিলো অনেক দূরের ব্যাপার। বই দেওয়া-নেওয়া চলত। এরশাদের প্রথম প্রেমিকা চিঠিটি বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ খামে করে দেওয়া চিঠির ভাঁজে ভাঁজে ছড়ানো ছিলো গোলাপের পাঁপড়ি ও বকুল ফুল। এরশাদ লিখেছেন, ‘তরুণ বয়সে কোনো মেয়ের কাছ থেকে চিঠি পেলে হৃদয়ে যে কিরকম অনুভূতি ঢেউ খেলে যেতে পারে, তা কেবল ওই সৌভাগ্যের মুহূর্তটি যাদের জীবনে এসেছে, তারাই অনুভব করতে পারেন, অন্যেরা নয়।’ (পৃষ্ঠা: ৬৫)

এছাড়াও তৎকালীন এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে এফডিসির অনেক নায়িকাদের এরশাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হিসেবে ধরা হত। যার গভীরে গেলে হয়ত সত্য মিথ্যা দুটোই খুঁজে পাওয়া যাবে, নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে একজন অত্যন্ত আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ !

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট