'ও ডাক্তার'

নিজেকে ভালবাসুন

আপনার আশেপাশের মানুষরা যখন আপনাকে নির্দয়ভাবে ক্রিটিসাইজ করবে, তখনও আপনি ঘুরে দাড়াতে পারবেন। সারাজীবন পাশে থাকার কথা বলা প্রিয় মানুষটাও যখন ক্রমেক্রমে অচেনা হয়ে যাবে, তখনও আপনি দাঁতে দাঁত চেপে সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু আপনার অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া শুরু হবে সেই মুহুর্ত থেকে যখন আপনি নিজেই আর নিজের পাশে থাকবেন না, নিজেই আর নিজেকে ভালবাসবেন না। পরিবার, বন্ধু, প্রিয় মানুষের ভালবাসা জীবনে অবশ্যই দরকার, কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজেকে নিজে ভালবাসতে শেখা।
নিজেকে ভালবাসার প্র্যাকটিস বাড়ানো টা তাই ভীষনভাবে জরুরী।
কিন্তু কিভাবে?
নিজেকে ভালবাসার হাজারটা উপায় আছে, আমি শুধু কয়েকটির কথা বলব, যেগুলো আমি নিজে অনুসরণ করি।
১) প্রতিদিনকার ছোট ছোট পজিটিভ ঘটনাগুলো একটা কাগজে লিখে আমরা একটা কাচের বোতল বা জারে জমিয়ে রাখতে পারি। বোতলটার নাম দিলাম ‘আমার যা কিছু ভাল’ বা আপনার ইচ্ছেমত যে কোন কিছু। কিন্তু, কোন ঘটনা গুলি লিখবেন?
ঘটনাটা যত ছোটই হোক বা বড়, সেটা ব্যাপার নয়, ঘটনাটার সাথে আপনার কোন পজিটিভ ইমোশন জড়িয়ে আছে এটাই ব্যাপার। যেমন ধরুন আপনি লিখলেন ‘আজকে আম্মুকে ঘরের কাজে সাহায্য করেছি’ অথবা ‘আজকে আমার কলিগের পাবলিক স্পিকিং স্কিলের প্রশংসা করেছি’ (হ্যা এটাও অবশ্যই লিখতে পারেন, কারন মন থেকে কারো প্রশংসা করা সহজ কাজ নয়। সবাই পারে না। সুতরাং এটা অবশ্যই একটা পজিটিভ কোয়ালিটি)।
এরপর একদিন যখন আপনার হয়ত খারাপ সময় যাচ্ছে, ভীষন হতাশ লাগছে, নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে তখন এই ‘আমার যা কিছু ভাল’ জার নিয়ে বসুন। প্রত্যেকটি লেখা পড়ুন, সেই পজিটিভ ঘটনা, পজিটিভ ইমোশন গুলোকে মনে করুন। দেখবেন নিজের মাঝে একধরনের শক্তির অস্তিত্ব টের পাচ্ছেন।
২) আপনার সবচেয়ে বড় সমালোচক কে বলুন তো? পাশের বাসার আন্টি? না। আপনার সবচেয়ে নির্দয় ক্রিটিসিজম আপনি নিজেই করেন। আমাদের সবার ভেতরেই একটা আমি আছে যে সারাক্ষন আমাদের মনে করিয়ে দিতে চায়
‘তুমি তো কিছুই পারো না।
আজকেও সাতটার এলার্ম মিস করেছো!
তোমার বন্ধুরা সবাই পারে, তাহলে তুমি কেন না?
তুমি আসলে ভালবাসা পাওয়ার যোগ্যই না! ‘
নিজের এই নেগেটিভ ইনার ভয়েস কে আপনাকেই থামাতে হবে। যতবার আপনার ভেতরের নেতিবাচক সত্ত্বা বলবে, আমি পারব না ; ততবার আপনার নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে, আমি পারব; আমি অবশ্যই পারব।
৩) নিজেকে অন্য কারো সাথে কম্পেয়ার করা এই মুহূর্ত থেকে বন্ধ করে দিন। আপনি ঠিক আপনারই মত। পৃথিবী নামক এই গ্রহটাতে আপনার মত একজনই মানুষ আছে, সেটা হলেন আপনি। তাই নিজের তুলনা শুধু নিজের সাথেই করুন। গতকালকের আপনার চেয়ে আজকের আপনিকে আরেকটু বেশি দক্ষ যোগ্য, আরেকটু বেশি মানবিক করে গড়ে তুলুন।
৪) সেইসব বিষাক্ত মানুষকে জীবন থেকে ছেঁটে ফেলুন যারা শুধু নেগেটিভিটির বীজ ই বুনে যায়। আপনার ভেতরের কোন ভাল গুনকেই যারা দেখতে পায় না, আপনার ভাল কিছুকেই যারা স্বীকৃতি দিতে পারে না, আপনার জীবনে জায়গা দখল করে থাকার অধিকার কি তাদের আছে?
৫) নিজের প্রত্যেকটা অর্জন কে উদযাপন করুন, তা যত ছোটই হোক না কেন। হয়ত আপনার বানানো চা টা এই প্রথমবার পারফেক্ট হয়েছে, বা হয়ত আপনি আপনার চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছেন। উপলক্ষ্য ছোট হোক বা বড়, উদযাপন করুন। নিজেকে বলুন যে আপনি পেরেছেন। নিজেকে বলুন যে ইউ আর প্রাউড অফ ইউরসেল্ফ।
৬) নিজেকে ক্ষমা করে দিন। অতীতের এমন অনেক ঘটনা আপনার ভেতর জমে আছে যার জন্যে আপনি হয়ত লজ্জিত, বিব্রত বা অনুতপ্ত। এমন অনেক ঘটনাই হয়ত আছে যা হয়ত আপনার করা ঠিক হয়নি, বা অন্যভাবে করা উচিত ছিল। অতীত হয়ত আপনি বদলাতে পারেন না, কিন্তু ভবিষ্যৎ কে পারেন। ওইসব ঘটনাগুলোকে এক একটা অভিজ্ঞতা হিসেবে নিয়ে এগুলো থেকে বের হয়ে আসুন। লেট ইট গো।
৭) মোটিভেশন, বা পজিটিভ এনার্জি বা সবকিছুকে বদলে দেওয়ার শক্তি, সেটা আপনার ভেতরেই আছে। নিজের ভেতরই সেটাকে খুঁজতে হবে। প্রতিদিনই নিজের সাথে কিছুটা কোয়ালিটি টাইম কাটান। না মুঠোফোন, না টিভি, না কোন নেতিবাচক চিন্তা, শুধুই নিজের সাথে সময় কাটান। দেখবেন নিজের ভেতরের ইতিবাচক শক্তিগুলোর অস্তিত্ব টের পাবেন।
নিজেকে আপনি যদি এক গুন ভালবাসতে শেখেন, জীবন আপনাকে একশ গুনে সেই ভালবাসা ফিরিয়ে দিবে। তাহলে আজ থেকেই শুরু হোক নিজেকে ভালবাসার নতুন অধ্যায়।
শান্ত সীমন্তিনী (সাইকোলজিস্ট)