মুক্তধারা

শিবলিঙ্গ হল হিন্দু দেবতা শিবের একটি প্রতীকচিহ্ন

শিবলিঙ্গ হল হিন্দু দেবতা শিবের একটি প্রতীকচিহ্ন। ধ্যানমগ্ন শিবকে এই প্রতীকের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। শিব ব্রহ্মের ধ্যানে লীন থাকেন। আর সব মানুষকেও ব্রহ্মের প্রতি ধ্যানমগ্ন হতে উপদেশ দেন। আমরা দেখি যে শিব লিঙ্গের উপরে ৩টি সাদা দাগ থাকে যা শিবের কপালে থাকে। তাই শিবলিঙ্গ যদি কোন জনেন্দ্রিয় বুঝাত তাহলে শিবলিঙ্গের উপরে ঐ ৩টি সাদা তিলক রেখা থাকত না। হিন্দুমন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবের পূজা হয়। একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ। শিবলিঙ্গ ৩টি অংশ নিয়ে গঠিত, সবার নিচের অংশকে বলা হয় ব্রহ্ম পিঠ, মাঝখানের অংশ বিষ্ণুপিঠ এবং সবার উপরের অংশ শিব পিঠ । নৃতত্ত্বারোপিত মূর্তি ব্যতিরেকেও শিবলিঙ্গ আকারে শিবের পূজাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। শিব শব্দের অর্থ মঙ্গলময় এবং লিঙ্গ শব্দের অর্থ প্রতীক; এই কারণে শিবলিঙ্গ শব্দটির অর্থ সর্বমঙ্গলময় বিশ্ববিধাতার প্রতীক। ১৯০০ সালে প্যারিস ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেসে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে অথর্ববেদ সংহিতা গ্রন্থে যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ নামে একপ্রকার বলিদান স্তম্ভের স্তোত্র থেকে, কারণ এখানেই প্রথম শিব-লিঙ্গ পূজার কথা জানা যায়।-এই স্তোত্রের আদি ও অন্তহীন এক স্তম্ভ বা স্কম্ভ-এর বর্ণনা পাওয়া যায়। এই স্কম্ভ-টি চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত। যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, ছাই, সোম লতা, এবং যজ্ঞকাষ্ঠবাহী ষাঁড়ের ধারণাটির থেকে শিবের উজ্জ্বল দেহ, তাঁর জটাজাল, নীলকণ্ঠ ও বাহন বৃষের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তাই মনে করা হয়, উক্ত যূপস্তম্ভই কালক্রমে শিবলিঙ্গের রূপ ধারণ করেছে। লিঙ্গপুরাণ গ্রন্থে এই স্তোত্রটিই উপাখ্যানের আকারে বিবৃত হয়েছে। এই উপাখ্যানে কীর্তিত হয়েছে সেই মহাস্তম্ভ ও মহাদেব রূপে শিবের মাহাত্ম্য।

জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট শালগ্রাম শিলা ও শিবলিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে এগুলিকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে সৃষ্ট প্রতীক বলে উল্লেখ করলে, তারই প্রতিক্রিয়ায় বিবেকানন্দ এই কথাগুলো বলেছিলেন। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শালগ্রাম শিলাকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গ বলাটা এক কাল্পনিক আবিষ্কার মাত্র। তিনি আরও বলেছিলেন, শিবলিঙ্গর সঙ্গে পুরুষাঙ্গের যোগ বৌদ্ধধর্মের পতনের পর আগত ভারতের অন্ধকার যুগে কিছু অশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তির মস্তিস্কপ্রসূত গল্প। স্বামী শিবানন্দও শিবলিঙ্গকে যৌনাঙ্গের প্রতীক বলে স্বীকার করেননি। ১৮৪০ সালে এইচ. এইচ. উইলসন একই কথা বলেছিলেন। ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ইসারউড লিঙ্গকে যৌন প্রতীক মানতে চাননি। ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়ায় “Lingham” ভুক্তিতেও শিবলিঙ্গকে যৌন প্রতীক বলা হয়নি। যদিও অধ্যাপক ডনিগার পরবর্তীকালে তাঁর দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্ট্রি বইতে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার করে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে শিবলিঙ্গকে ঈশ্বরের বিমূর্ত প্রতীক বা দিব্য আলোকস্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব বইতে লিঙ্গের কোনো যৌন অনুষঙ্গমূলক অর্থ নেই। লিঙ্গ শব্দের আমরা শুধু একটি অর্থ জানি তা হলো জননেন্দ্রিয় এবং ব্যকরণগত অর্থ হলো পুংস্তত্ব বা স্ত্রীত্ব জ্ঞাপক অর্থ। লিঙ্গ শব্দের যে আরো অর্থ হতে পারে তার কোন চিন্তা আমরা করি না। লিঙ্গ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো সূক্ষ দেহ। এই দেহটিতে যুক্ত আছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়,৫টি কর্মেন্দ্রিয় এবং ৫ টি প্রাণ অপান বায়ু ,মন ও বুদ্ধি-মোট ১৭ টি অবয়ব যুক্ত দেহ। সকল সৃষ্টিরই সূক্ষ শরীর আছে। আমাদের যখন মৃত্যু হয় তখন জীবাত্মা সূক্ষ শরীরে বিচরণ করেন এবং পুনরায় দেহ ধারণ করেন। শিব, রুদ্র ও মহাদেব এই তিনটি নামই আমাদের মধ্যে বেশি পরিচিত। যে সূক্ষ শরীরকে আমরা লিঙ্গ বলে পূজা করি তা সৃষ্টির সূক্ষ শরীর প্রকৃতিতে বীজ বপনরূপ সূক্ষ বিষয়টিকে দেখানো হয়েছে। এখানে স্ত্রী-পুরুষের মিলিত অঙ্গ নয়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে তা অনুধাবন করা যায়। আমাদের প্রচলিত ধারনায় যা আসে তাকে আমরা সহজে ভুলতে পারি না। যে সূক্ষ শরীরে ১৭ টি গুণ নিয়ে অবস্থা করছেন তার পুনরায় স্থুল দেহ ধারণ অন্যদিকে প্রকৃতিতে অর্থাৎ মাটিতে বীজ বপণ কারণে বীজের সেই সূক্ষ এবং সুপ্ত শক্তিই অংকুরিত হয়ে বৃক্ষাদি শস্যাদি রূপ ফল আমাদের দেন। প্রত্যেক দেব-দেবীর বা সৃষ্টির এরূপ সূক্ষ দেহ আছে, সেই দেহের আহ্ববান করি ঘটে, পটে(ছবিতে), মূর্তিতে। শিবলিঙ্গও তদ্রুপ সৃষ্টির সূক্ষ দেহ। শিব শব্দের অপর একটি অর্থ হল যাঁর মধ্যে প্রলয়ের পর বিশ্ব নিদ্রিত থাকে; এবং লিঙ্গ শব্দটির অর্থও একই – যেখানে বিশ্বধ্বংসের পর যেখানে সকল সৃষ্ট বস্তু বিলীন হয়ে যায়। যেহেতু হিন্দুধর্মের মতে, জগতের সৃষ্টি, রক্ষা ও ধ্বংস একই ঈশ্বরের দ্বারা সম্পন্ন হয়, সেই হেতু শিবলিঙ্গ স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতীক রূপে পরিগণিত হয়।