'ও ডাক্তার'

সুইসাই্ড

ডা.তামান্না তারিনঃ একটা মানুষ হুট করে একদিনের ভাবনায় আত্নহত্যা করে ফেলে না। আত্নহত্যা করার আগে সে অসংখ্যবার কাছের দূরের বহু মানুষের কাছে সুযোগ পেলেই বলতে থাকে নানা ভাবে, সে ভালো নেই, সে বাঁচতে চায়না, তার অনেক স্ট্রেস অথবা হয়তো কখনো কিছুই বলেনা, কিন্তু বুঝাতে চায় নানা ভাবে বারে বারেই।
কেউ কেউ আবার উল্টোটাও করে, এক বুক কষ্ট থাকার পরেও খুব হাহা হিহি করে, হয়তো দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহুর্তেও ফেইসবুকের প্রোফাইল ফটোতে খুব হাসিখুশি একটা ছবি আপলোড করে, খুব সুন্দর কোনো স্ট্যাটাস দেয়, খুব চমৎকার কোনো গান শুনে, হয়তো প্রিয় মানুষটাকে ফোন দিয়ে বলে- আমি না তোমাকে অনেক ভালোবাসি। বন্ধু বান্ধবকে টেক্সট করে কিংবা কল দেয়!! এমনভাবে জীবন গুছাতে থাকে সবার সামনে যে কাউকে সে বুঝতেও দেয়না একটা মুহুর্তের জন্য, ঠিক কতোখানি আকাশ সমান যন্ত্রণা সে বয়ে বেড়াচ্ছে এবং সে কি করতে যাচ্ছে!!

লেখকঃ ডা. তামান্না তারিন

কখনো পরিবার, কখনো সমাজ অথবা কখনো প্রিয়জনের কথা ভেবে হয়তো খুব ভালনারেবল অবস্থায় গিলে ফেলে এমন অনেক কিছু যা সে গিলতে পারছিলোনা!! আর এখানটাতেই হয় বিপত্তি!! মানুষ আসলে সবকিছুর সাথে ডিল করতে পারে, জীবনের সমস্ত কঠিন সময় ফাইট করতে পারে যদি তার নিজের মানুষদের সাপোর্ট পায়!! কিন্তু যদি সেই মানুষদের জন্যই সে গিলে ফেলতে চায় নিজের অনেক বড় বড় ট্রমা, তখনই বদহজমটা হয়।

আসলে কি জানেন? বেঁচে থাকার শেষ খড়কুটোটাও যখন নড়বড়ে হয়ে যায়, শেষ একটা মানুষের জন্যও যদি মানুষটা বাঁচার স্পৃহা না পায়, তখন তার মনে হতে থাকে- এ জীবন অর্থহীন!! শুধুমাত্র একজন.. জ্বী, একটা মানুষ, একটা হাত, একটা ছায়া- ঠিক কতোখানি আগলে রাখতে পারে ভেঙেচুড়ে ক্ষয়ে যেতে থাকা একটা পুরো মানুষকে হয়তো আমি আপনি অনুভবও করতে পারবোনা, কিন্তু জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া সেই মানুষটা জানে এই আগলে রাখার মানে!! সেই হাতটা হতে পারে বাবা-মা, ভাই-বোনের, হতে পারে স্বামী-স্ত্রীর, হতে পারে কাছের কোনো কাজিন কিংবা বন্ধুর অথবা হতে পারে একজন প্রিয় মানুষের!! কিন্তু হ্যা, তার মাথার উপর নিশ্চয়ই সেই একটা হাত থাকা পর্যন্ত সে কোনোদিন একেবারে মরেই যাবে- এটা ভাবেনা!!

আমি প্রায়ই খুব ক্লোজ যে ক’জন (৪জন) সুইসাইড করেছে তাদের নিয়ে ভাবি, স্বপ্নে দেখি এবং তাদের সাইকোলজিটা বুঝার চেষ্টা করি!! আমি উত্তর পাই- কেউ কেউ সাহায্য চেয়েও পায়নি, আর কেউ কেউ সাহায্য চাওয়ার মতো কম্ফোর্টজোন- টাই পায়নি!!
কিন্তু কেন!! কেন আসলে?? কেন পাবেনা!! একটা মানুষ কেন এইটুক মানসিক সাপোর্ট পাবেনা যে তাকে মরেই যেতে হবে??

কখনো কাছের কেউ সুইসাইড করেছে? করে থাকলে ভেবেছেন কখনো? আপনার কাছের মানুষটা যখন আপনাকে খুলে বলতো- তার এই এই ব্যাপারগুলোয় খুব কষ্ট হচ্ছে, আপনি আপনার জায়গা থেকে উদাসীনতা না দেখিয়ে সম্পূর্ণটা দিয়ে তার জন্য চেষ্টা করেছিলেন তো? হ্যা, কেউতো আপনাকে আমাকে এটাও বলবেনা এসে, যে সে আর পারছেনা, সে এখন সুইসাইড করবে, কিন্তু আমি আপনি আমাদের জায়গা থেকে তাকে সম্পূর্ণ সাপোর্ট দিয়েছিলাম তো? আবার কখনও হয়তো কাছের সেই মানুষটা কিছুই বলেনি, আপনার সাথে হাহা হিহি করেই কাটিয়েছে কিন্তু দিনশেষে নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা সে তৈরী করছিলো আপন মনেই- এটাও ভেবে দেখেছেন কি? আপনার কি আসলেই জানার কথা ছিলোনা তার মানসিক অবস্থা? তবে আপনি কি করে তার প্রিয় মানুষ, প্রিয় বন্ধু কিংবা পরিবার হলেন??

একটা সম্পর্ক আসলে শুধু সম্পর্ক নয়৷ একটা সম্পর্ক অনেক বড় একটা দায়িত্বও!! আপনার দায়িত্বে অবহেলায় আপনার কাছের মানুষটার প্রাণ চলে যাচ্ছেনা তো? ভেবে দেখেছেন এভাবে কখনো??

তাই কারো সাথে চললে, মিশলে, ভালোবাসলে কিংবা আপনার আপন যারা যারা আছে, তাদের নিয়ে ভাবুন, কারো কোনো ইমোশনকে ইগ্নোর করে যাচ্ছেন না তো? কারো ভালনারেবল সময়কে উপেক্ষা করে যাচ্ছেন না তো? কাউকে এতোটা দুঃখ দিচ্ছেন না তো যা সে নিতে পারছে না? কারো বেঁচে থাকার অবলম্বন কেড়ে নিচ্ছেন না তো? অথবা হেয়ালি করে অযত্ন অবহেলায় কাউকে আত্নহত্যা করতে ঠেলে দিচ্ছেন না তো?

আমি এমন একজনের কথা জানি, যিনি বলেছিলো- “নিজের চারদিকে এমনভাবে লোহার একটা বর্ম তৈরী করতে হবে যাতে দুনিয়ার হাজার শক্তিও তোমাকে ভাঙতে না পারে”- তিনিও শেষ অবধি সুইসাইড করেছিলেন!!

তাই ভাবুন, আরেকবার ভাবুন, আরও একবার ভাবুন!!

বিশ্বাস করুন, একটা জীবন অমূল্য, যা চলে গেলে আর ফেরত আসেনা!! প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাউকে এতোটা হতাশায় ঠেলে দিবেন না কখনো যে সে কোনোদিন আর উঠে দাড়াতে না পারে। কারো কনফিডেন্স লেভেলকে এমনভাবে চুড়চুড় করবেন না যে সে আর বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে না পায়!! পারলে পাশের মানুষটার বেঁচে থাকার কারণ হোন, নিজেকে শেয়ার করুন, তারটা শেয়ার করতে সাহায্য করুন। একটা আস্থার জায়গা তৈরি করুন যাতে করে অকপটে আপনার কাছে সে এবং তার কাছে আপনি প্রাণ খুলে সব বলে দিতে পারেন, যেন সুইসাইড করে মরে যেতে না হয় দুনিয়ার আর কোনো প্রিয় মানুষকে!! যেন সে শেষ মিনিট অবধি অনুভব করে, তার প্রিয়জন তাকে আগলে রাখবে, কোনোদিন হাত ছেড়ে যাবেনা- অন্তত যেন একটা মানুষের জন্য হলেও সে বেঁচে থাকার ইচ্ছেশক্তি পায়!!

#মেন্টালহেলথ_ম্যাটারস