মুক্তধারা

জীবন যেখানে যেমন

নূসরাত জাহানঃ Balance চাই। সুখ আর “কম সুখ” (দুঃখ বলতে অবসাদ লাগে) এর মাঝে । জীবনের অর্ধেক পার করেছি (pessimistically না, গড় আয়ুর হিসেব)। আমি গুনে বলতে পারব ঠিক কতজন আমার আজকের গড়ে ওঠার পিছে আছে (দুই জন, আমি আর মা) ।

এই মাকে নিয়ে কত যুদ্ধ। Post graduation এর সাথে সাথে কাজের সুযোগ পাই। ঠিক তারপরই মা অসুস্থ হয়ে গ্যালো । চার বছর বাসা – হসপিটাল – অফিস। এই ছিল জীবন। তবু এই সময় টুকু আমার সব চেয়ে প্রিয়। পিছে তাকাই না আমি, ভয় হয়, গা শিউরে ওঠ। মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখি পিছে ফিরে গ্যাছি, মনে হয় আর সামনে যেতে পারব না। কিন্তু এই চারটা বছর আমার প্রিয়। শুধু এই চারটা বছর।

মা চলে গ্যাল, ৩৫ দিন লাইফ সাপোর্ট এ থেকে। দাঁড়াতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল পায়ের নিচে মাটি নেই। মা হারাবার শোক ও করতে পারি নি। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়েছি। জানতাম মা ছাড়া জীবন কঠিন হবে, এতটা ! না, এতটা ভাবিনি। আমার অভিভাবক এর আরো একজন সন্তান আছে, আমি ওকে আর নিজের “কিছু” বলে পরিচয় দেই না। মা চলে যাবার পর ৩ টা বছর ওর অমানুষিক মার খেয়েছি। ৩ দিন senseless হয়েছি মার খেয়ে। কত ডেকেছি আব্বুকে, সাড়া দেয় নি। অনেকে ভাববেন হয়ত আমার কোন দোষ ছিল। না। আমি জন্মের পর থেকে দেখেছি মার সাথেও এমন হত। কেন সহ্য করলে মা? কিসের আশায় ? সব ঠিক হয়ে যাবে এই আশায়? কিন্তু আমি তো মা ঠিক বলেছিলাম, “মা, চলো এখান থেকে চলে যাই। ওরা বাঁচতে দিবে না।“ তুমি শুধু বলতে “ তোর ভবিষ্যৎ আছে।“ কীসের ভবিষ্যৎ মা? কিসের ভবিষ্যৎ?

কত শুনেছি “কম টাকায় চিকিৎসা করসে, ওর মা বাঁচবে কেমনে?” আমি তো বলতে পারি নি “ মা চলে যাবার আগের দিন, ডাক্তার বলছিল, আপনার মা এর সময় শেষ , আত্মীয়স্বজন ডাকেন, যে কোন সময় যে কোন কিছু হতে পারে। “ বয়স আমার তখন কেবল ২৭। ৩৪ দিনে প্রথম সাহায্য চেয়ে বসি। সবার এক উত্তর “ রোজা রাখসি, আসতে পারব না।“ পরদিন সকাল ৯ টায় আম্মু চলে যায়। বাবার ভাই বলে “ লাশ হসপিটাল থেকে গোসল করাই, বাসায় এগুলা ঝামেলা।“ আমার মা ৩০ বছর সংসার করল, বাসায় শেষ গোসল এর অধিকার নেই আমার মা-র? এত অসম্মান ! আমার মা এর আরেক সন্তান (আমার থেকে ৮ বছরের ছোট) যখন আমাকে সবার সামনে বলল “ ওর বেতন এর সব টাকা যদি আমার হাতে না দেয় , তাইলে ওরে বাসার দরজার সামনে বাঁধাকপির মত কুচি কুচি কইরা কাটমু,“ এই লোকই তখন বলেছিল , “ ও ত ভালো মেয়ে না, উচ্চশিক্ষিত হইয়া গ্যাসে, অবশ্যই কাটবা ওরে ।“। শুধুমাত্র আমার জন্মদাতার কিছু property-ই চেয়েছিলেন আপনি। এর জন্য এত নিচে নামতে হবে কেন?
আমার জন্মদাতা তখন ও চুপ।

শেষ যেদিন মার খেলাম, পশুর মত মেরেছিল আমাকে, আর পারি নি। ততদিনে আমার আরেকটা পরিচয় হয়েছে। খুব ছোট, কিন্তু শেষ অবলম্বন। সরে এসছি। যতটুকু সম্মান বেঁচে ছিল ততটুকু নিয়ে।
একা এবং কয়েকজন নয়। একা !
পিছে তাকাই না, ঘিন্না লাগে। খুব ঘিন্না।