হুতুমপেঁচা বলছি

এই শহরের, এই দেশের প্রতি কোণায়, প্রতিক্ষণে, কেউ না কেউ এইকথাগুলা উচ্চারণ করে থাকে

ডিশটিং মৌরীঃ “এই! গায়ে হাত দিবি না! যত্তোসব ফকিরের দল!”
“এই হিজড়াগুলার জন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না! অসহ্য!”
“কি! ৫টাকা বাড়ায় দিবো মানে! শালা রিকশাওয়ালা! মাইর চিনিস!”
“আমার এতো দামী কাঁচের বাটি ভেঙ্গে দিলি! ঠাশ!”
“এই মালাউনগুলা টাকা কামায় এইদেশে আর পাচার করে ইন্ডিয়ায়!”
“এই হিন্দুগুলা পূজার নাড়ু এতো ছোট করে বানায় কেন?! কিপ্টা কোথাকার! হা হা হা!”

এই শহরের, এই দেশের প্রতি কোণায়, প্রতিক্ষণে, কেউ না কেউ এইকথাগুলা উচ্চারণ করে থাকে। মায়ের সাথে হাত ধরে মার্কেটে ঘুরে বেড়ানো বাচ্চা শোনে ফকিরদের প্রতি মায়ের তাচ্ছিল্যভাব। একটু বেশী ভাড়া চাওয়ার অপরাধে বাচ্চা বাবাকে দেখে রিকশাওয়ালাকে মারতে। বাচ্চা দেখে গৃহকর্মীকে যেকোন কারনে চড় মারা খুব স্বাভাবিক। বাবা ফোনে মালাউন বলে গালি দিচ্ছে, বাচ্চা পাশে বসে শুনছে। ড্রয়িং রুমে খেলার সময় বাচ্চা মাকে শোনে হিন্দুদের নিয়ে টিটকারি দিতে। সবই খুব স্বাভাবিক, দৈনন্দিন কথাবার্তা। পিএসসি পরীক্ষার্ত্রীর হাতে খুব খুশী মনে নকল ধরিয়ে দেই, তারপর সেই নকল করা পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেলে পাড়াপ্রতিবেশীকে মিষ্টি বিলিয়ে বেড়াই। আচ্ছা, কি শেখাচ্ছেন আপনাদের বাচ্চাদের? একটু প্রশ্ন করেছেন কি নিজেকে? নিজেকে কি আপনার বাবা-মা হওয়ার যোগ্য বলে মনে হয়?

লেখকঃ ডিশটিং মৌরী

অনেক বাচ্চা আছে যারা ঘরের বাহিরে bullyingএর শিকার হচ্ছে, physically abused হচ্ছে। কিন্তু বাসায় এসে বলে না, বলতে পারে না। কেন? কারণ বাসাকে তারা একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করতে পারছে না। আমরা, হুতুমপেঁচারা যখন বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে যাই, আমরা তাদের safe circle concept নিয়ে কত কথাই না বলে আসি। সেই safe circle কি তাদের বাসাটা পড়ে না, যেই বাসাতে তারা নির্ভয়ে তাদের সব কথা বলতে পারবে? কিন্তু আসলেই কি বাচ্চারা তেমন বাসা পায়, যেখানে তারা জানে যে, এইখানের প্রতিটা মানুষ আমার ভালতে-খারাপেতে আমার সাথে আছে, প্রতিটা কাজে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করবে না, দুনিয়ার সবাই আমার বিপক্ষে গেলেও এইমানুষেরা আমার সাথে থাকবে!

এই দুনিয়ায় শারীরিক ক্ষমতা থাকলে যেকেউ বাবা-মা হয়ে যেতে পারে। রাম, শ্যাম, যদু মধু, সবাই। বাচ্চাকে একটা নিরাপদ স্থান দিতে পারছেন না বেড়ে ওঠার জন্যে, কিন্তু বাবা-মা হয়ে যাচ্ছেন। বাচ্চার মনোবিকাশের প্রতি কোন নজর নেই, বাবা-মা হয়ে যাচ্ছেন। বাচ্চাদের রঙ্গীন জগতকে বুঝতে পারেন না, বাবা-মা হয়ে যাচ্ছেন। বাচ্চার মধ্যে সুস্থ মানবিক গুণাবলীর জন্ম দিতে পারছেন না, বাবা-মা হয়ে যাচ্ছেন। মানুষের প্রতি সম্মানজনক আচরণ শিক্ষা বাচ্চাকে শেখাতে পারছেন না, বাবা-মা হয়ে যাচ্ছেন।
বাচ্চা নাকি কাঁদার দলার মত, তাকে ইচ্ছামত আকার দেওয়া যায়। সত্যি কি ইচ্ছামত একটা আকার দিলেই হলো! একটা মানুষের ভবিষ্যৎ সামাজিক আচরণ, চিন্তাভাবনা, চেতনা, স্বভাব সবকিছু আপনার উপর নির্ভর করছে, আর একটা আকার দিলেই হয়ে গেল! আমরা চাকরীতে ঢোকার আগে কত কি করি! কত ধরনের skill develop করি, soft skill, hard skill, কত কি! চাকরী শুরু করার আগেই চাকরীতে ঢোকার যোগ্যতা অর্জন করি। আর একটা ছোট্টমানুষকে সুস্থ, সুন্দর মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন মানুষে পরিণত করার মত এতো বড় একটা challenging jobএ যোগ দেওয়ার জন্য কোন যোগ্যতাই লাগে না, কোন skill develop করতে হয় না। এইকাজে সবাই যোগ্য, সবার দ্বারা সম্ভব। নাকি বলা উচিৎ বাবা-মা হতে কোন যোগ্যতা লাগে না!