মুক্তধারা

ডাক্তার রাকিব হত্যার দায় আমাদের সকলের রয়েছে

গোলাম রাব্বানী: ডাঃ রাকিবকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ফুটেজটি দেখলাম।

যে ঘটনার জের ধরে ডাঃ রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে তা হল, শিউলী বেগম নামের এক গর্ভবতী মহিলাকে ডাঃ রাকিবের মালিকানাধীন খুলনার রাইসা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে শিউলী বেগমের সিজার করানো হয় সেখানে। প্রথমদিকে বাচ্চা এবং মা সুস্থ ছিল। পরে রোগীর রক্তক্ষরণ হলে তাকে তৎক্ষণাৎ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানের চিকিৎসকরা রোগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পেরে তাকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যায় শিউলী বেগম। আর তারপর রোগীর স্বজনরা ডাঃ রাকিবকে বেড়ধক পিটিয়ে হত্যা করেন। এতটুকু আমরা সবাই জানি।

যা জানি না তা হল, ডাঃ রাকিবকে যে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হল, কেন করা হল? কী দোষ ছিল তার? শিউলী বেগম নামের ওই মহিলার মৃত্যুতে ডাঃ রাকিবের দোষ কোথায়? যদি দোষ না’ই থাকে তাহলে তাকে কেন এভাবে নির্মম নির্যাতন করা হল? কেন এভাবে তাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হল? কে নেবে এর দায়? কে নেবে?

লেখকঃ গোলাম রাব্বানী

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় ডাঃ রাকিব হত্যার দায় শিউলী বেগমের স্বজনের, যারা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। হ্যাঁ, দায় তাদের অবশ্যই রয়েছে। যে অপরাধ তারা করেছে তার শাস্তি তাদেরকে পেতেই হবে। কিন্তু তারা যতই শাস্তি পাক ডাঃ রাকিব কী আর ফিরে আসবেন? ফিরে পাবেন তার জীবন? না। তাহলে, এই দায়ের মূল্য কোথায়?

আমি মনে করি ডাঃ রাকিব হত্যার দায় কেবল শিউলী বেগমের স্বজনদের নয়। বরং এর দায় আমাদের সকলের রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় দায় হল রাষ্ট্রের। কারণ রাষ্ট্র ডাঃ রাকিব তথা দেশের কোন ডাক্তারকেই ততটুকু নিরাপত্তা দিতে পারে নি। এখন অনেকেই বলবেন, রাষ্ট্র কি তবে ডাক্তারদের বাসায় সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? অবশ্যই না। রাষ্ট্র যেভাবে ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতো তা হল ‘প্রপার সিস্টেম মেইন্টেইন করতে’। সেই সিস্টেম কি আমাদের আছে? নিশ্চয়ই নেই। কেন নেই? এর দায় কার? রাষ্ট্রের নয় কি!

আমরা জানি, ডাক্তারদের অভিভাবক হলেন মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাহলে কথা হল, প্রপার সিস্টেম মেইন্টেইন করতে না পারার ব্যার্থতা কিংবা ডাঃ রাকিবদের মত মেধাবী ডাক্তারদের নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ব্যার্থতার দায় কি আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নয়? তিনি সেই দায় নিয়েছেন? কিংবা তিনি আদৌ কি নিজের ব্যার্থতার দায় নেবেন?

আমি অন্তত এক্সপেক্ট করি না যে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই ব্যার্থতার দায় নেবেন। কিভাবেই বা নেবেন? তিনি নিজেই তো ডাক্তার না। তো তিনি কী করে জানবেন কী পরিমাণ ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং অধ্যবসায়-সাধনার পর একজনকে ডাক্তার হতে হয়। তাছাড়া, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হতে হলে প্রথম যোগ্যতা হওয়ার কথা ছিল তাকে অবশ্যই ডাক্তার হতে হবে। কিন্তু আফসোস। দেশে এত বড় বড় ডাক্তার থাকার পরেও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় ইংলিশ লিটারেচার পড়া একজনকে। তিনি ডাক্তারদের সুখ-দুঃখ বুঝবেন সেই আশা করাটাও তো বোকামি। তাহলে প্রত্যেকটা মেডিকেল কলেজে যে ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে সব ধরনের রাজনীতি চলে তার ফায়দা কোথায়? এই প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়!

সুতরাং স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা রাষ্ট্র তার ব্যার্থতার দায় নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হল, প্রপার সিস্টেম মেইন্টেইন তো তখনই হবে যখন সেখানে প্রপার সিস্টেম থাকবে। আমাদের কি সেই সিস্টেম আছে? প্রশ্ন রেখে দিলাম আপনাদের কাছে।

এই তো সেদিনের কথা। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মঈন উদ্দিন। মনে আছে বাঁচার জন্য তার শেষ আকুতির কথা? যে ডাক্তার হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করেছেন শেষ মুহূর্তে তিনি এ্যাম্বুলেন্স চেয়েও পান নি। মনে আছে? কোথায় ছিল তখন অথোরিটি? কোথায় ছিল রাষ্ট্র? কোথায় ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তিরা?

কোন নেতার শারীরিক অবস্থার খানিকটা অবনতি হলেই হেলিকিপ্টার ম্যানেজ করে তাকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া যায়। আর যিনি কী না এত এত মানুষকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করে গেলেন সেই ডাঃ মঈন উদ্দিনকে শেষ মুহূর্তে আমরা একটি এ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করে দিতে পারলাম না। এই লজ্জা কার? ডাঃ মঈন উদ্দিনকে যেমনিভাবে হত্যা করেছে এই দেশের সিস্টেম একইভাবে ডাঃ রাকিবকেও হত্যা করেছে এই দেশের সিস্টেম। যারা ডাঃ রাকিবকে মেরেছেন তারা উছিলা মাত্র। যদি তা না হত, তাহলে ক্লিনিকের সামনে এসে ডাক্তারকে পিটিয়ে মেরে ফেলার দুঃসাহস দুবৃত্তরা কোথায় পায়?

নাকি রাষ্ট্র এখানেও বলবে, ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়া গেছে’। রিয়েল্লি? কেবল ডাক্তাররাই জানেন ঠিক কতখানি ত্যাগ-তিতিক্ষার পর তারা ডাক্তার হতে পারেন। যেদিন থেকে তারা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন ঠিক সেদিন থেকে মৃত্যু অবধি তাদেরকে কঠিন পড়াশোনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নর্মাল লাইফ বলতে কিছুই থাকে না তাদের। আমরা যারা নন মেডিকেল তারা তো সব একসাথে মেইন্টেইন করি। কিন্তু ডাক্তাররা তা পারে না। কারণ সব সমানভাবে মেইন্টেইন করতে গেলে তারা যে ডাক্তারি পাশ করতে পারবে না। তাদের সারাটা জীবন কেটে যায় পড়াশোনা করতে করতে। এত এত সেক্রিফাইস শেষে যখন কেউ ডাক্তার হয় তখন বিনা কারণে আমরা তাদের পিটিয়ে হত্যা করবো আর বলে বেড়াবো ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়া গেছে’। রিয়েল্লি? হাউ ফানি!

গতকাল দেখলাম, সারাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এমন বিশিষ্ট ১২০ ব্যাক্তিবর্গের নাম নিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, সেই ১২০ জনের মধ্যে একজন ডাক্তারের নামও স্থান পায় নি। কেন? যেখানে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের বাঁচাতে গিয়ে প্রায় অর্ধশত ডাক্তার প্রাণ হারিয়েছেন এবং আক্রান্ত হয়েছেন দেড় হাজারের মত ডাক্তার, সেখানে কোন ডাক্তারের স্থান হয় নি প্রথম আলোর সেই ১২০ জন ব্যাক্তির তালিকার মধ্যে। এই হল আমাদের দেশের সেরামানের একটি পত্রিকার সেন্স। কি লাভ এসব ইয়োলো জার্নালিজমের? আমি জানি পত্রিকায় নিজের ছবি ছাপানোর জন্য কোন ডাক্তার সেবা প্রদান করেন না। তবুও কথা প্রসঙ্গে বলা আর কী!

আমাদের সবচেয়ে বড় প্রবলেম কোথায় জানেন? আমরা মনে করি, ডাক্তাররা আমাদের বাপ-দাদার কিনে নেওয়া গোলাম। আমরা উঠতে বললে তাদের উঠতে হবে। বসতে বললে বসতে হবে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই তাদেরও একটা ব্যাক্তিগত জীবন আছে। এটা ভুলে যাই বলেই পান থেকে চুন খসলে ডাক্তারদের বানিয়ে দেই কসাই। আর নিজেদেরকে বানিয়ে দেই ফেরেশতা। কী অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা আমাদের!

আমাদের জন্ম হলেও বার্থ সার্টিফিকেট আনতে যাই এই ডাক্তারদের কাছ থেকে। আবার আমাদের মৃত্যু হলেও ডেথ সার্টিফিকেট আনতে যাই এই ডাক্তারদের কাছ থেকেই। এতকিছুর পরেও পান থেকে চুন খসলে আমরা তাদের সকল অবদানের কথা ভুলে তাদেরকে গালি দেই ‘কসাই’ বলে। অবশ্য ঠিকই বলি আমরা। তারা তো কসাই। তাদের দয়া-মায়া বলে কিছু নেই। আর দয়া-মায়া নেই বলেই তো নিজের জীবনের কথা ভুলে জনগণের সেবা করতে নেমে পড়েন। দয়া-মায়া নেই বলেই নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অসুস্থ রোগীকে বাঁচাতে পারেন। এমনকি পারেন নিজের কান্না চেপে রেখে রোগীর মুখে হাসি ফোটাতে। তাদের দয়া-মায়া নেই বলেই তো এসব করতে পারে। সুতরাং, তারা সবচেয়ে বড় কসাই। ঠিক না?

সত্যি কথা বলতে কী জানেন, বছরের পর বছর জুড়ে বাংলাদেশে ডাক্তারদের উপর এমন নির্মম নির্যাতনের পরেও নিজের লাইফ সেক্রিফাইস করে তারা যে এভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এর তুলনা হয় না। এই যে করোনার মহামারীতে ডাক্তাররা নিজের ফ্যামিলির কথা ভুলে গিয়ে ঠিকই কর্মক্ষেত্রে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তার বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন টা কী? অনেকে তো ঠিকমত পিপিই-মাস্ক-গ্লাভসও পায় নি। তবুও তো তারা তাদের জায়গা থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আর তার বিনিময়ে পাচ্ছে ধিক্কার, অপমান আর নির্যাতন।

আসলে, ডাক্তার জাত হল মায়ের জাত। মানুষের নানান কথা শুনে তারা যতই অভিমান করুক দিনশেষে তারা সকল দুঃখ ভুলে রোগীর সেবাদানে নিজেদের নিয়োগ করে। ঠিক যেমনিভাবে সন্তান মা’কে যতই কষ্ট দিক না কেন, মা ঠিকই সব ভুলে সন্তানকে বুকে টেনে নেয়। ডাক্তাররাও তেমনই। কিন্তু এভাবে আর কত? আর কত ডাক্তারের মৃত্যু হলে আমদের হুশ ফিরবে?

প্রিয় ডাক্তার ভাই-বোনেরা, জানেন তো আমরা খুব কিউট ‘ভুলনেওয়ালা’ এক জাতি। সব ভুলে যাই আমরা। ইতোমধ্যে ডাঃ মঈন উদ্দিনের মৃত্যুর কথা ভুলে গেছি। দুদিন পর ডাঃ রাকিবের কথাও ভুলে যাবো। তারপর বাজারে টিআরপি খাওয়ার মত নতুন ইস্যু আসবে। সেগুলো হয়তো আমরা ভুলে যাবো। কিন্তু ডাঃ মঈন উদ্দিন কিংবা ডাঃ রাকিবের পরিবার কিচ্ছু ভুলতে পারবে না। কিচ্ছু না। বাকী জীবন তাদেরকে এই ক্ষত বুকে বয়ে বেড়াতে হবে।

ডাক্তার ভাই-বোনেরা, উই নিড অ্যা রেভুলেশন। অ্যা পিওর সিস্টেমেটিক রেভুলেশন। তাই আমি বলি কী, আপনারা ঐক্যবদ্ধ হন। আপনারা জেগে ওঠেন। একতাবদ্ধ হয়ে হায়ার অথোরিটির সাথে কিভাবে সিস্টেম চেঞ্জ করা যায় তা নিয়ে কথা বলেন। কারণ দিনশেষে এই সিস্টেমটা চেঞ্জ করানো না গেলে কোন লাভ হবে না। ছোট শিশু কান্না না করলে স্বয়ং মা’ও তাকে বুকের দুধ খেতে দেয় না। সুতরাং আপনাদের অধিকার আদায়ের জন্য আপনাদের নিজেদেরকেই লড়তে হবে। সবকিছু খুব সহজেই আমরা ভুলে যাই। তাই ডাঃ রাকিব হত্যাকাণ্ড ভুলে যাওয়ার আগেই নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলুন। যেন আপনাকে অন্তত ডাঃ রাকিবের মত নির্যাতনের শিকার হয়ে মরতে না হয়। যেন আর কোন ডাক্তার মায়ের বুক খালি না হয়। যেন আগামীর ভোর হয় সবুজ উচ্ছ্বাসের আর পৃথিবীর হয় সোনালী সম্ভাবনার!