ইচ্ছেঘুড়ি

নাজকা লাইন রহস্য

সারা বিশ্বে এখনও যেসব রহস্যের সমাধান করতে উঠতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা সেই তালিকার উপরের দিকে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর নাজকা লাইন। ১৭০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে অতিশয় বিশাল সেই লাইন কী ভাবে টানা হয়েছিল সে ব্যাপারে মোটামুটি একমত হয়েছেন পুরাবিদরা কিন্তু কেন ওই বিশাল এলাকা জুড়ে রুক্ষ্ম জমিতে এক হাজারের উপরে ছবি তৈরি করা হয়েছিল, তা আজও বুঝে উঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ১৯২০-৩০-এর দশকে উড়ান চালু হলে বিমানযাত্রীরা প্রথম এই লাইনগুলি দেখতে পান।

লাইনগুলি ঠিক কত বড় তা ছবিটি দেখে নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পেরেছেন। একটি হেলিকপ্টার থেকে আর একটি উড়ন্ত হেলিকপ্টার-সমেত এই লাইনের ছবি তোলা হয়েছে। তাই যতদিন পর্যন্ত বাণিজ্যিক ভাবে উড়ান চালু না হয়েছে ততদিন এর কথা আধুনিক যুগের মানুষ জানতেই পারেনি।

এক হাজারের উপর এই ছবি রয়েছে এখানে –পাখি, মাকড়সা, বাঁদর, বহু কাল্পনিক প্রাণী, জ্যামিতিক নকশা ও বহু ঢেউ খেলানো রেখা আঁকা রয়েছে এখানে। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, ইনকাদের অনেক আগে এখানে যে নাজকাদের বাস ছিল তারাই এর শিল্পী বা স্থপতি। ৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এগুলি তারা তৈরি করেছিল বলে মনে করেন পুরাতত্ত্ববিদরা।

নাজকা লাইন নিয়ে আশ্চর্য কয়েকটি ব্যাপার রয়েছে। প্রথমত প্রাকৃতির দুর্যোগ ও আধুনিকতার গ্রাস থেকে কী ভাবে রক্ষা পেয়ে গেল, দ্বিতীয়ত কী ভাবে এই কাজ সম্ভব হয়েছিল এবং তৃতীয়ত কেন এগুলি করা হয়েছিল।

পেরুর যে তটে এগুলি রয়েছে সেই তট খুবই ঊষর। সম্ভবত সেই কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করেও মানুষের তৈরি এই কাজ টিকে গেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম পেরুতে নাজকারা কৃষিনির্ভর সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়েছিল। পূর্বসূরী পারাকাদের প্রভাব তাদের মধ্যে পুরোমাত্রায় ছিল। তাদের মৃৎপাত্র ও পোশাক বিখ্যাত, তবে সবচেয়ে বিখ্যাত হল পৃথিবীর বুকে আঁকা নকশা। কেন তারা এগুলি এঁকেছিল তা আজও রহস্য। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, এই জায়গায় আসার আগে নাজকারা যেসব প্রাণী দেখেছিল সেগুলিকেই তারা এঁকেছে এই ভাবে। তাহলেও রহস্য উদ্ঘাটন হচ্ছে না কারণ এমন কিছু নকশা রয়েছে যা এখনও পর্যন্ত কাল্পনিক বলেই মনে করা হয়।

নকশা করার পদ্ধতি নিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য কিছু বলা গেলেও কারণ নিয়ে কোনও সূত্র খুঁজে পাননি তাঁরা। এখন গবেষকরা ভাবছেন এব্যাপারে তাঁরা পক্ষিবিশারদদের সহায়তা নেবেন। নকশাগুলির মধ্যে অনেকগুলির পাখির মতো দেখতে।

নাজকা লাইনে যেসব পাখির নকশা করা হয়েছে এখন সেই সব পাখি কোথায় পাওয়া যায়, আগে কোথায় পাওয়া যেত এসব জানতে চান গবেষকরা। এই পাখির মধ্য দিয়ে নাজকারা কোনও বার্তা দিতে চেয়েছেন কিনা তাও তাঁরা বোঝার চেষ্টা করবেন।

এখানে ১৬টি বিশাল বিশাল পাখির নকশা রয়েছে যে পাখিগুলির চঞ্চু, ডানা ও লেজ আঁকা হয়েছে শরীরের তুলনায় অনেক বড় করে। এই পাখির তালিকায় রয়েছে পেলিক্যান, গুয়ানো ও হার্মিট। এখানে আঁকা পাখিগুলি কোনওটিই স্থানীয় নয়। হার্মিট ও গুয়ানো দেখতে পাওয়া যায় বিষুবীয় বৃষ্টি অরণ্যে। হার্মিটকে হামিংবার্ডও বলা হয়। পেরুতে এই পাখির দু’টি প্রজাতি পাওয়া যায় – কোয়েপেকেজ হার্মিট ও রেডিশ হার্মিট। পেলিক্যান পাওয়া যায় একেবারে উপকূল অঞ্চলে।

জীবজন্তু ছাড়া বহু জ্যামিতিক নকশাও রয়েছে। গবেষকরা মনে করছেন এগুলির সঙ্গে সেই সময়ের মানুষের জ্যোর্তিবিজ্ঞান সংক্রান্ত কোনও রীতির যোগসূত্র থাকতে পারে। এমনও হতে পারে যে কোথায় খাবার ও জল রয়েছে এই ধরনের তথ্য পাকাপাকি ভাবে স্মরণে রাখতে এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল নাজকারা।