হুতুমপেঁচা বলছি

ডিভোর্সি কিন্তু তারা খুনী নয়

তামান্না তারিনঃ ডিভোর্সি!! কি? শুনতে খুব ধাক্কা লাগা একটা শব্দ এটা, তাইনা?? অথচ ভেবে দেখেছেন কখনো- আপনার যদি শুনতে এতো ধাক্কা লাগে, তবে যে মানুষটা এই প্রসেসের মধ্য দিয়ে গেসে অথবা যাচ্ছে- তার কেমন লাগে?? সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ভয়াবহ একটা স্টেজের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরে দেখা যায়, আমরা সেই মানুষটার বেঁচে থাকার অধিকার টুকুও ছিনিয়ে নিতে চাই!! বিশেষ করে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদেরকে এই সামাজিক আঘাতের তীব্রতার স্বীকার হতে হয় সবচেয়ে বেশি!! সমাজ আমাদেরকে এমন জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে, যেখানে আমরা ভাবি, এই মেয়ে ডিভোর্সি, তাহলেতো এর আর নতুন করে সাধ আহ্লাদ থাকতে পারবেনা, তার কোনো বন্ধু থাকবেনা, থাকবেনা কোনো ক্যারিয়ার, থাকবেনা নিজস্বতা, থাকবেনা কোনো ভালোবাসাবাসি!! আরেহ, ওতো ডিভোর্সি!! ওর আবার এতো কিসের শখ আহ্লাদ!! মেয়ে খারাপ, আরেহহ, চরিত্র খারাপ, আরেহ মেয়েতো সাংসারিক না, আরেহ মেয়েতো খালি ক্যারিয়ার নিয়ে পরে থাকে, আরেহ মেয়ে এতো ডিমান্ডিং যে জামাই অতিষ্ঠ হয়ে গেসে!!! এমনকি সমাজের কথাতো বাদই, মেয়ের আপন মা বাপ ভাই বোনও তাকে দেখা শুরু করবে বাঁকা চোখে!! সবার মধ্যমনি হয়ে থাকা মেয়েটা রাতারাতি হয়ে যাবে নিজের ফ্যামিলিরই সবার জন্য একটা বোঝা কেবল!! হাহাহা!!

এসবতো গেলো ডিভোর্স পরবর্তী বেশ কিছু আলাপ, এবার আসি ঘটনাক্রমে যদি একজন ডিভোর্সিকে কোনো আনম্যারিড কেউ ভালোবেসে ফেলে!! ওহ মাই গড!! বাংলাদেশের সমাজে একজন ডিভোর্সিকে বিয়ে করা নিয়ে যে স্ট্রং ট্যাবু সেই ১৯৫৩ সাল থেকে চলে এসেছে, তা কি এই ২০২০ এ এসেও ভাঙতে পেরেছে কেউ?!? যে আনম্যারিড মানুষটা একজন ডিভোর্সিকে ভালোবেসে ঘর করতে চাইবে, সমাজ সংসার তাকে এমনভাবে চেপে ধরবে যেন সে কাউকে বিয়ে করতে চাইছে না, বরং ৭টা খুন করতে চাইছে!! বন্ধুরা বলবে- আরেহ ব্যাটা, আর মাইয়া পাইলিনা, শেষমেশ ডিভোর্সি!! সমাজ বলবে, ইছছিঃ ছেলেটার কি কান্ড দেখসো, এতো মেয়ে থাকতে ডিভোর্সি!!! ছেলের পরিবার বলবে, আমাদের কোনো মতামত নাই, শুধুমাত্র তুই এই বিয়ে করলে বাসা থেকে বের হয়ে যাবি, আমরা তোকে ত্যাজ্য করবো, আমাদের চেহারা আর কোনোদিন দেখবিনা, এমনকি মরে গেলেও মাটি দিতে আসবিনা!!

বাহ!! কি সুন্দর অপরাধ দেখলেন!! ডিভোর্সি হওয়ার মতো এত্তো বড় অপরাধ তাহলে আর কারো আছে বলেন?? আমার কতোজন আত্নার কাছের মানুষকে আমি এই সুন্দর অপরাধের আসামী হয়ে বছরের পর বছর পার করতে দেখতেসি জানেন? জানেন না আপনারা!! আপনারা যারা এই শব্দটাকে ট্যাবু করে রেখেছেন, আপনারা জানেন না, কি বয়ে বেড়ায় এই মানুষগুলো!! কারো কারো এক/দুই/তিন সন্তানও আছে, আপনারা জানেন না, কিভাবে তারা বাপ ছাড়া সেইসব সন্তান বড় করতেসে আপনাকে এক ফোঁটা চোখের পানি না দেখিয়েই!! একটা ডিভোর্স হতে দুইটা মানুষেরই দোষ লাগে, সম্মতি লাগে, কিন্তু জীবনটা নরক হয়ে যায় কিন্তু শুধুই মেয়েটার!! কারণ? সে মেয়ে!!

ডিভোর্স এর পর একটা মেয়ের হাসতে মানা, সাজতে মানা, ঘুরতে মানা, জীবন সাজাতে মানা!! যদি সে এসবকিছুর কিচ্ছুওওও করে, তবে এই আপনারাই বলেন -“এইতো দেখসো, বলসিলাম না, মেয়েটারই সমস্যা!!” অথচ সেই মেয়েটারই ডিভোর্সড হাজবেন্ড এর দ্বিতীয় বিয়ের ছবি আপনারা কিভাবে দেখেন জানেন? অনেকটা এইভাবে- “দেখছো দেখছো, অমুকের জামাই ছিলো যে, এখন আরেক বিয়ে করসে, আল্লাহ, বউটা যা ভালোওওওও, যা সুন্দর!!! ভাগ্যিস অমুকের হাত থেকে আল্লাহ বাঁচাইসিলো, নাইলে যে ছেলেটার কপালে কিইইইই হতো”!!!

হায়রে সুশীল!! আর কতো সুশীলতার নামে ডিভোর্স এর ঘানি টানতে থাকা মেয়েগুলার জীবন তামা তামা বানাবেন আপনারা!! আর কতোজন আছেন রিলিজিয়াস ভিউ এর নামে বিচার মানি তালগাছ আমার টাইপ মানুষ !! এতোই যদি ধর্ম বুঝেন তবে এটা বুঝেন না, একজন ডিভোর্সিতো অনেকটা অসহায়ও হয়!! তো আপনার ছেলে, আপনার ভাই, আপনার বন্ধু অথবা আপনারই আপন কেউ যদি সেই অসহায় এমন কারো জীবনসঙ্গী হয়ে একটা জীবনকে আলো দিতে পারে, তো আপনার কিসের এতো সমস্যা??? কেন এক্ষেত্রে ইসলাম এর সেই দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পারেন না তখন!?! কারণ ইসলাম হাজার সঠিক বিচার করলেও আপনারা আপনাদের আপনজনকে কোনো ডিভোর্সি দিয়ে বিয়ে করাতে চাননা, আফটার অল, আপনাদেরও একটা আনম্যারিড তালগাছ থুক্কু মেয়ে লাগবে তাই?!?

অন্তর আত্নার কাছের কিছু মানুষের জীবন নিয়ে শুনি, দেখি আর ভাবি!! আল্লাহ কেন এদের মতো এতো ভালো মানুষগুলোর আশপাশের এতো অবিবেচক মানুষজনকে হেদায়েত করেন না!! আমার কাছের দূরের প্রতিটা ডিভোর্সি মেয়েকে জানাই অনেক অনেক শ্রদ্ধা!! যে কষ্ট, অপমান, তিক্ততা নিজের বুকে চেপে রেখে অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে জীবনের এই কণ্টকাকীর্ণ সিড়িগুলো একটা একটা করে আপনি অতিক্রম করে যাচ্ছেন, তা আপনার জায়গায় দাঁড়িয়ে আর কেউ পারতো না, বিশ্বাস করেন, কেউ না মানে কেউ না!!

শো রেস্পেক্ট ফর ডিভোর্সড উইমেন
তারা ডিভোর্সড কিন্তু তারা খুনী নয়