অনুরণন

আতাউল হাকিম আরিফের একগুচ্চ কবিতা

মর্মঘাতী সুর
——————–

এই শহরে-তামাটে মানুষগুলো হলুদচোখে দেখছে-

কবি আতাউল হাকিম

বাতাসে বাতাসে উড়ছে আজ মর্মঘাতী সুর,
প্রতিদিনের চেনা পদচিহ্ন যেনো বিনাসী যাত্রাপথ
মা,মাটির বুক কেঁপে উঠে অপমৃত্যুর কান্নায়।

এই সময়, এই মহাকাল যেনো শরনার্থীর মিছিল
শোলমাছের লেজের মতো ঘাই মারে দৃশ্যমান প্রকৃতি
সমস্ত বিস্ময়, অনুভূতিগুলোতে চুরুটের গন্ধ।
প্রেয়সীর বুকটাও যেনো চুনকামহীন দেয়াল।
মাটিতে শুয়ে ছায়াকে ধারণ করি-মৃত্যুছায়া।

তবে কী ছুঁয়ে গেছে পাপ!
—————————————

মায়াজালে-ছায়াজালে,ভূমির অলিন্দে-বহুরূপ স্পর্শে- লাল,নীল,গোলাপি আভায় পাপ জমে যায়!

কুমারী শরীরের স্পন্দন যদি জেগে উঠে,উত্তেজনায় যদি বৃষ্টি নামে,এবং চোখের ভেতর তোমার বুক,তবে কী পাপ?

পুরুষ কেঁপে উঠে শিল্পে,পণ্যে, নারীর দেহলতায়!
কর্পোরেট প্রণোদনা-সময়ের উম্মাদনা।প্রকৃতিতে তুমি, আমি মিশে যায়, তবে কী ছুঁয়ে গেছে পাপ?প্যাপিলোমা জাতীয় ভাইরাস!সবটায় প্রবাহমান নদী এবং দীর্ঘশ্বাস!

কাঁথা

নকশী বুননে ছেঁড়াখোঁড়া একখানা কাঁথা
আমাকে নিয়ে যাচ্ছে পৌরাণিক স্মৃতির কিনারায়
পাইন-ছায়াঘেরা শান্ত নির্মিলিত নির্জনতা-
নিরবচ্ছিন্ন একখানা ভবন!শানবাঁধানো ঘাট।
বৃক্ষ পতনের মড়মরিয়ে শব্দ-যৌবনপোড়া অসুখ!


কাঁথাফোঁড়-আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে শৈশবে।
মা, কাঁথা বুনতেন-স্বপ্ন বুননের মধ্য দিয়ে।
বড় হতেই আমি দেখেছি ক্রমশ সে স্বপ্নের পতন!
বাহিরে বৃষ্টির শব্দ-আবহ সংগীতটা আজ খুব নিবিড়
শীতার্ত হাওয়ার ভেতরে বয়ে যাচ্ছে অতি প্রাচীন শব্দমালা।

এই পথটা অনেক দূর!
———————————-

এই পথটা অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে
বাল্মিকির যেখানে শুরু হয়তোবা সেখানে
উত্তরের স্রোতধারাটাও সামন্তদের
ঠিক চৌকোনাটায় আটকে গেছে হয়তোবা!
কিছু দূর্বোধ্য শব্দ,কিছু আগন্তুক বড্ড হৈ-চৈ শুরু করে দিয়েছে।
দত্তদের বটশীর সমান বয়সী পুরুষ সে
একবার করে আসে ঘোর অন্ধকারে
কিছু সংকেত দিয়ে যায়,কিছুটা অস্পষ্ট
ঘুমঘোরে হেঁটে যায় বটশী তলে
অশরীরির আগমনে কাঁপতে কাঁপতে
পুনরায় অন্ধকার রাতে ত্রিশোর্ধ রমনীর বশীকরণে!

হোঁচট
———–

ঘটনাটি বৃটিশদের সময়কার নীলকুঠি, নীলচাষের ইতিহাস
আমরা পেলাম নীলুফামারী,সুন্দর একটি নাম।
রক্তের দাগ,চোখের পানি-ইতোবৃত্ত হিসেবের খাতা!
ক্রমেই ইতিহাসের চাকা ঘুরতে থাকে-
ভিন্ন ভিন্ন নীলকুঠি জেগে উঠে আমাদের মজ্জায়।
রাজঙ্গিনি রাজবজরা বাজায়-হুইসেল বেজে উঠে!
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে কখনো কখনো হোঁচট খাই, খাইতে থাকি।

লালরঙা উত্তাপ
————————-

সোনালী জমিনে লালরঙা উত্তাপ
বাতাসে উড়ছে দুঃখ বিলাপ…..
ইসতেহারের পাতাগুলোয় ছাইরঙা আস্তর,
বিহঙ্গের কান্নায় হলুদ ভোরাই!
পুষ্পার্ঘ্য মহামাণ্যগণ যথারীতি মন্থনপাত্রে ডুবে আছেন!

এক টুকরো আলো
———————————–

এক টুকরো আলো হঠাৎ-ই আমার বুক পকেটে
অত্যাশ্চর্য আনন্দে হুড়োহুড়ি করলাম কিছুক্ষণ
যৎকিঞ্চিত আলো-
আলোড়নে পিছুমোড়ায় বিদগ্ধ অতীত।
আমার বিস্মিত চোখ জোড়ায় ঢুকে গেছে কলাকান্দা গ্রাম।
সেখানে মৃত্তিকার বুকে জেগে উঠে সকাল।
সময়ের বিবর্তণে গ্রাবু খেলায়-জিতে যায় তোমার নাম।
বুক পকেটে এক টুকরো আলো তুমি,আলোর সমার্থক
একজন যৌবনবতী!

নারী
———
অতি যত্নে উর্বর করে
গড়ে নিয়েছি তোমায়!
অনাবাদী থেকে এখন
শিল্পের আবাদভূমি তুমি!

তোমার বুকে আজ
তরতাজা ফুলের ঘ্রাণ!
সুরভিত!

তোমার ভ্রুকুটিতেও
গভীর ধ্বণি,
নিশ্বাসে প্লাবিত হতে থাকি।

প্রেমার্ত পুরুষ….
শর্টভার্সন প্রশ্নপত্রের মতোই
সহজ করে নিয়েছে…
তোমার দৈহিক অবয়ব,
মনোজাগতিক বিষয়াবলী!

নারী–
তুমি ছলনাময়ী!
তবুও কামজবোধ
প্রসারিত শিল্প সংগমে।

মতাদর্শ ও মৃত্যুচিন্তা
——————————–


বিশাল এক অরণ্যের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি , সবুজ,হলুদ ,বাদামী কত যে রংয়ের মিশেলে সুবিস্তীর্ণ পথ, ডানা ঝাপ্টায় বনপাখি, নিশব্দে হেঁটে যায় পোকামাকড়,পশুগুলোর সতর্ক পদক্ষেপ,যাত্রা অনিদির্ষ্ট ,স্বপ্নের ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছি হয়তোবা অন্যকোনো গুহায়-মানবীসদৃস ঝিরঝিরে বাতাসের বুকজুড়ে।


কতগুলো অচেনা শব্দের ঘুঙুর বাজে,পরীরা নাচতে থাকে নীলরংয়ের হেরেমখানায়! পুষ্পরজ; এবং কামশাস্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ চলে….
বৃষ্টিধারায় জন্মনেয় কাব্যবালিকা!দূর্বার বেগে ছুটে চলা শব্দগুলো কবিগণ লুটে নেয়।


অন্য এক ভূখণ্ডের বুকে আছড়ে পড়ি, অচেনা সভ্যতা,আদিম পোষাকে খেলছে ভিন্নতর নর-নারী,
পাখির মতো করে শব্দের ব্যবহার,ওখানে কোনো ক্লেদ নেই,জাগতিক ক্ষুধা নেই, আছে যৌবিক মন্ত্রবাণ!


স্বপ্ন ভেঙে গেলে ফিরে আসি চেনা পৃথিবীর নৈমিত্তিক কোলাহলে,এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জাগতিক ক্ষুধার অজস্র সামগ্রী!মতাদর্শ ও মৃত্যচিন্তা আমাকে নিয়ে যায় নরকের খুব কাছে।

হাসপাতাল
——————-
করিডোরের পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে
আনন্দ-বেদনার কতকথা….
বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে
জীবনমৃত্যুর একএকটি উপাখ্যান।
টেলিকমিউনিকেশন অফারের মতো
প্রতিদিন পাল্টে যায় বিজ্ঞানের পরিভাষা।

কষ্ট-পাপবোধ-অনুশোচনা!
গভীর থেকে আসা কিছু বিলাপধ্বনি,
এবং আজরাঈল ফেরেশতা খুব নিকটে এসে
কিছুকিছু বার্তা পৌঁছে দিয়ে যায়।
ক্লোরোর্ফমের বিষক্রিয়া জনিত একটি
মৃত্যু সংবাদও এখানে ইট-পাথরে মিশে যায়।

পাখির গুঞ্জন নেই, ঝিঁঝি পোকার
কোলাহল নেই।
দুঃসংবাদ বহন করে নিয়ে যায়
প্রতিদিন কিছুকিছু হকারের দল…!
কথিপয় শব্দগুচ্চ ঘুরেফিরে আসে,
এখানে সময় কেবলি সময়কে তাড়িয়ে বেড়ায়।