ব্যঞ্জন

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম সিদল পাওয়া যায়

সিদল কী? এই প্রশ্নে অনেকেই একটু আমতা আমতা করেন। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম সিদল পাওয়া যায়। তাই এক কথায় বলা যায় না আসলে সিদল জিনিসটা কী। যােইহোক, আমরা আপনাদের জন্য চার ধরনের সিদলের গল্প শোনাতে এসেছি। শুটকি ও কচুর ডাঁটা দিয়ে বড়ার আকৃতির সিদল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের (বৃহত্তর রংপুর, বৃহত্তর দিনাজপুর) গ্রাম বাংলায় মুখরোচক খাবার হিসেবে জনপ্রিয়। ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে পুঁটি মাছের ভেজা শুটকিকে চ্যাঁপা শুটকি/ হুটকি বলা হয়। সিলেট অঞ্চলে এই চ্যাঁপা শুটকিই সিদল নামে পরিচিত। তবে এই দুই ধরনের সিদল বানানোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন।

উত্তরাঞ্চলের সিদল বানানোর প্রক্রিয়া:ছোট মাছ ভালো করে ধুয়ে রোদে মচমচে করে শুকিয়ে হামানদিস্তা, পাটা, ঢেকি, ঘাইল, ছিয়ায় মিহি গুড়ো করে চেলে নিতে হবে। কচুর ডাঁটা ধুয়ে, ছিলে ২/৩ ঘন্টা রোদে রেখে, পানি শুকিয়ে মিহি পেষ্ট তৈরী করতে হবে। শুটকির গুড়ো, কচুর ডাঁটার মন্ড এক সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এটি এই ধরনের সিদল বানানোর আদি পদ্ধতি। তবে আপনি চাইলে তাতে পেঁয়াজবাটা, হলুদ, মরিচ, ধনে, আদা, রসুন বাটা, তেল, লবণ সব কিছু ভালো করে মিশিয়ে হাতের তালুতে কিছুটা মন্ড নিয়ে টিকিয়া কাবারের আকারে গড়ে ৩/৪ দিন কড়া রোদে শুকিয়ে বয়ামে ভরে রাখতে হবে। শুকানোর সময় হালকা হলুদ মাখিয়ে নিতে পারেন। কড়া রোদে না শুকালে সিদলে পোকা ধরে যেতে পারে। ভালো করে শুকানোর পর শুকনো পাতিলে সংরক্ষণ করুন। চাইলে পাতিলে কিছু ছাই দিয়ে রাখতে পারেন, তাতে বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট পোকার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। রান্না করার সময় সিদল ছিই থেকে তুলে ফু দিয়ে প্রথমে ছাই পরিস্কার করে নিন। তারপর ভালো করে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

সিলেটি সিদল তৈরী প্রক্রিয়া:পুঁটি, ফাইস্যা বা যে কোন ছোট মাছ ভালো করে পরিস্কার করে ধুয়ে ৭/১০ দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। মাটির বড় হাঁড়ি, কলসি, মটকার ভেতর বাইরে মাছের তেল মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। শুকানো মাছ বড় ঝুড়ি, টুকরিতে নিয়ে একবার ধুয়ে সারা রাত পানি ঝরানোর জন্য রেখে দিতে হবে। সকালে সে মাছ মাটির পাত্রে ভালো করে বিছিয়ে ভরে নিতে হবে। ঠেসে ঠেসে ভরতে হবে, যাতে ভেতরে কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে। মাছ ভরার পর মটকার মুখে কলাপাতা, তেঁতুল পাতা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে, কাদা মাটি দিয়ে লেপে দিতে হবে- যাতে বাতাস ঢুকতে না পারে। তারপর মটকাটিকে গলা পর্যন্ত মাটির নিচে রেখে দিতে হবে কম পক্ষে ৪০ দিন। উপরে ৪/৫ মাস। অনেকে মটকার উপরে লাউ, কুমড়ো, সিমের গাছ লাগিয়ে দেন মটকায় ছায়া দেবার জন্য। সুপুরি গাছের ডোগলা দিয়ে বা টিন দিয়েও অনেকে ঢেকে দেন মটকার উপরের অংশ।

নাপ্পি:পার্বত্য-চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিদল (নাপ্পি ) তৈরী হয় অন্যভাবে। চিংড়ি ও অন্যান্য ছোট মাছ লবণ মাখিয়ে পেস্ট করে, রোদে শুকানো হয়। শুকনো পেস্ট আবার অল্প অল্প পানি দিয়ে পেস্ট করা হয়। কয়েক বার রোদে দিয়ে পেস্ট করে ময়দার মন্ডের মত করে নাপ্পি বানানো হয়। এরপর সেগুলো বাজারে বিক্রি করা হয়।

চুঙ্গা শুকটি:সিলেটের গ্রামাঞ্চলে আরেক রকম সিদল তৈরী হয় যেটি চুঙ্গা শুটকি নামে পরিচিত। এটি মূলত বাঁশের চোঙ্গের ভেতর তৈরী সিদল। বাঁশের চোঙ্গের ভেতর তেল মাখিয়ে একদিন রোদে রাখা হয়। ছোট মাছের শুঁটকি হলুদ মাখিয়ে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় চেপে চেপে ভরে মুখটা কলাপাতা বা কাঠাল পাতা দিয়ে আটকে চুলার আশে-পাশে বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। ১৫/২০ দিন পরে শুঁটকির মাছ গলে যায়। তখন এটা খাওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। এটি দেখতে আচারের মত হয়। তীব্র গন্ধ যুক্ত এ সিদল রান্নায় অল্প পরিমান ব্যবহার করা হয়।

লেখা: সুরঞ্জনা মায়া