ব্যঞ্জন

গোয়ালন্দ স্টিমার কারি

উনিশ-বিশ শতক থেকে বাঙ্গালী খাবারদাবারে আরো ‘আধুনিক’ হতে থাকে ইংরেজদের হাত ধরে। একুশ শতকে ইউরোপীয় স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রবণতা প্রবেশ করে তাদের মননে। এছাড়া এসময় বিশ্বায়নের অভিঘাতে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া বাঙ্গালীর হাত ধরে ভারতীয় ও ইউরোপীয় খাবারের সাথে সাথে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের খাবারও ঢুকে যায় বাঙ্গালী হেঁশেলে এবং শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের রান্নায় তার উপস্থিতি হয়ে পড়ে অবশ্যম্ভাবী। একারণে বার্গার-পিজ্জা-স্যুপ-পারিজ-পুডিং ইত্যাদির সাথে টোপিওকা পার্ল দিয়ে বানানো ফিলিপিনো ডেজার্ট বুকো পানদান-র খোঁজও মেলে বাঙ্গালীর রান্নাঘরে।

শহুরে বাঙ্গালীর রান্নাঘরে সবসময় শুধু যে বিদেশী খাবারই গৃহীত হয়েছে, তা নয়। বরং কখনো কখনো মাঝিমাল্লার খাবারও ঠাঁই পেয়েছে তার রান্নায়। তেমনি একটি প্রসিদ্ধ খাবারের নাম ‘গোয়ালন্দ চিকেন কারি’ বা ‘গোয়ালন্দ স্টিমার কারি’। সৈয়দ মুজতবা আলী, ধীরাজ ভট্টাটার্যের মতো লেখকও এই খাবারের সুখ্যাতি করেছেন তাঁদের লেখায়। একসময়ের জনপ্রিয় এই খাবারটি বিস্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিলো সম্ভবত গোয়ালন্দ নদীবন্দর গুরুত্ব হারাবার সাথে সাথে। সম্প্রতি নেটে ছড়িয়ে পড়ে এই খাবারের বিভিন্ন রেসিপি। কিন্তু একাধিক রেসিপি সংগ্রহ করে দেখা গেছে, সেগুলোর সাথে আমাদের সুপরিচিত দেশী মুরগির ঝোলের তেমন পার্থক্য নেই। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এর সংগ্রহ করা রেসিপিটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে আমাদের কাছে। পাঠকদের জন্য এখানে সেই রেসিপিটি উল্লেখ করা হলো।

উপকরণ:

দেশী মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, হলুদ, লবণ, সরষের তেল, কুঁচো চিংড়ি মাছ। সব উপকরণ পরিমান মতো নিতে হবে।

প্রণালী:

পেঁয়াজ কুঁচি কুঁচি করে কাটুন। আদা-রসুন-কাঁচা ও শুকনো মরিচও কুঁচি করে কেটে নিন। এবারে মুরগি ভালো করে ধুয়ে একটা পাত্রে রাখুন। কেটে রাখা মুরগিতে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, হলুদ আর লবণ দিন। পরিমান মতো সরষের তেল দিন। এরপর খুব ভালো করে মেখে নিন। এবারে ২ ঘন্টা রেখে দিন ঢাকনা দিয়ে।

মাথা, খোলা ও পা বাদ দিয়ে কুঁচো চিংড়ি ভালো করে ধুয়ে নিয়ে খুব মিহি করে বেটে নিন। একটা ছোট ডেকচি বা কড়ায় অল্প সরষের তেল দিন। চিংড়ি বাটা মুরগিমাখায় মিশিয়ে দিন। তেল গরম হয়ে গেলে মুরগি মাখা কড়াযইতে ছাড়ুন। আঁচ কমিয়ে রাখুন। ৩-৪ মিনিট নাড়ুন। তার পরে আঁচ একেবারে কমিয়ে দিন আর ঢাকান দিন ভালো ভাবে, যেন খুব বেশী বাষ্প বেরিয়ে যেতে না পারে। আধ ঘন্টা পর ঢাকা খুলে আধ কাপ পানি দিন। এরপর আবার ঢাকনা চাপা দিয়ে ১০ মিনিট খুব কম আঁচে রান্না করুন। এবারে উনুন বন্ধ করে দিন। কিন্তু কড়ার ঢাকনা খুলুন আরো ১০-১৫ মিনিট পর। ব্যাস হয়ে গেছে আপনার গোয়ালন্দ চিকেন কারি।

তথ্যঋণ:

১. রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল ও অনার্য তাপস সম্পাদিত, নুনেতে ভাতেতে, ১ম ও ২য় খণ্ড, দ্য কাফে টেবল, ব্যান্ডেল, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১৬।

২. মিলন দত্ত, বাঙালির খাদ্যকোষ, দে’জ পাবলিশিং, কোলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১৫।