হুতুমপেঁচা বলছি

এইসব দিন রাত্রি

মৌরীঃ বিটিভিতে নতুন করে আবার “এইসব দিন রাত্রি” নাটক দেখানো শুরু হয়েছে। আম্মার কাছে এই নাটকের এতো গল্প শুনেছি, তাই খুব উৎসাহ নিয়ে দেখা শুরু করেছি। নাটকের প্রথম পর্বেই দেখায় নীলু (ডলি জহুর) একটা চাকরী পেয়ে যায়। তার স্বামী, শফিক (বুলবুল আহমেদ) কাকতালীয়ভাবে সেদিন এতো মানুষের সংসার টানতে তার যে অবস্থা যায়যায়, এটা বলার পর নীলু জানায় যে, সে একটা চাকরী পেয়েছে এবং সে চাকরীটা করবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এটা শোনার পর শফিকের মুখ আমশি হয়ে যায়। বউ চাকরীর টাকায় তাকে ঘড়ি উপহার দিচ্ছে, বাসার জন্যে টিভি কিনছে, সবাই মিলে সেই টিভি দেখছে, বউ অফিসের সহকর্মীদের সাথে খেতে যাচ্ছে, সবকিছুতেই তার বিরাগ অবস্থা। বাসার মানুষও নীলুর বাচ্চাকে রাখার ব্যাপারে রাগান্বিত, বাচ্চা খায় না – মায়ের দোষ, বাচ্চা ঘুমায় না – মায়ের দোষ। বাবা-মা চাকরী করে তাহলে বাচ্চাকে পড়াবে কে? অবশ্যই মা পড়াবে! অফিস করে এসে শত ক্লান্তই থাকুক, মাকেই পড়াতে হবে। ফুপু একজন বাসাতেই থাকে, যার কি না কলেজ বন্ধ, সে বাচ্চাকে পড়াতে পারে না, মাকেই নিয়ে বসতে হবে। নীলু কাজে এতো ভালো করছে যে, ম্যানেজমেন্ট তাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে কিছুদিনের জন্যে চিটাগাং পাঠাতে চাচ্ছে, সাথে আরো মানুষও যাবে। কিন্তু শফিক যেতে দিবে না। কারণ? কোনো কারণ নেই। আর যদি যেতে হয়, তাহলে যেন বাসা থেকে বের হয়ে যায়। নীলুও বের হয়ে গিয়েছিল কিন্তু পরে আবার ফিরে এসেছিল, চাকরীটাও ছেড়ে দিয়েছিল।

নাটকটা দেখতে যেয়ে অনুধাবন করলাম, এইদেশে ৩৫ বছর আগেও চাকরীরত মেয়েদেরকে যেসব প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো, ৩৫ বছর পরের চিত্রও সেই একই। এখনও মেয়েদেরকে শর্তসাপেক্ষে চাকরী করতে হয়। বিবাহিত চাকুরীজীবী মেয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখনও শ্বশুরবাড়ি থেকে তেমন একটা সহযোগিতা, সহমর্মিতা পায় না। ঘরের কাজ থেকে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। এখনও যদি চাকরীর প্রয়োজনে শুধুমাত্র কিছুদিনের জন্য হলেও অন্য শহরে যেতে হয়, তাতে হাজারও বাঁধা। আর সবকিছুর পরে একটা হুমকি তো সবসময় আছেই মাথার উপর খড়্গ হয়ে, বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি। যেকোন অসুবিধার কথা বলতে গেলেই শুনতে হয়, “চাকরী ছেড়ে দাও!” “ বাসা থেকে বের হয়ে যাও!” কারণ চাকরী করার এক চেটিয়া অধিকার তো শুধুমাত্র পুরুষদের!

আমার যেসব ছেলেবন্ধু আছে, যাদের কিনা চাকরীজীবি বউ আছে, তাদের আমি খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করি তারা ঘরে ফেরার পরে কি করে। বেশীর ভাগেরই উত্তর থাকে, একটু ফ্রেশ হয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে চলে যায়, কারণ সারাদিনের অফিসের পরে একটু রিফ্রেশমেন্ট তো চাইই-চাই! আর তাদের বউরা? তারা আর কি করবে, তাদের কি বাইরে থাকলে চলবে নাকি! বাড়ির কাজ কে করবে! রাতের খাবার কে বানাবে! ঘর কে পরিষ্কার করবে! পরেরদিনের খাবার কে বানিয়ে রাখবে! বাড়িতে যদি শ্বশুর-শাশুড়ি থাকে, তাদের সেবা কে করবে! বাচ্চা থাকলে তাকে কে পড়াবে, কে খাওয়াবে! বউদের রিফ্রেশমেন্ট! বাহ! এইসব করাটাই তো তাদের জন্য রিফ্রেশমেন্ট! সংসারের কাজ করছে, এরচেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে একটা মেয়ের জন্যে! আর যদি এইসবকে খুব বেশী ঝক্কির কাজ মনে হয়, তাহলে ছেড়ে দাও চাকরী। তাছাড়াও মা বাসায় না থাকলে সন্তান মানুষ হবে কিভাবে! সন্তান মানুষ করার দায়ভার যে শুধু একা মায়ের। সন্তান যদি খারাপ করে সে তো মায়ের দোষেই। যদি ভালো করে তাহলে অবশ্য বাবার কৃতিত্ব।

একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। আমার অফিসের প্রাক্তন মহিলা সহকর্মী, যার বাসা ছিল মিরপুর আর অফিস ওয়ারীতে। রোজার সময় অফিস শেষ হতো সেই সাড়ে তিনটায়। এই রোজার সময়গুলোতে সেই ওয়ারী থেকে উনি কখনো দৌড়ায়, কখনো হেঁটে, কখনো বাসে ঝুলে বাসায় যেতেন। বাসায় যেয়ে ৪ রকমের শরবত করতেন, ৭-৮ পদের ইফতারির আয়োজন করতেন, সব বাসাতেই রান্না করা হতো। বাসায় মানুষ কিন্তু তারা আড়াই জন, উনি, উনার স্বামী আর বাচ্চা একটা মেয়ে। ওহ, আর মেয়েকে দেখে রাখার জন্যে আরেকটা বাচ্চা মেয়ে। এতোকিছুর আয়োজন কারণ উনার স্বামী ভোজনরসিক। উনার যে কাজের মেয়েটা, তার শুধু একটাই কাজ, বাচ্চা মেয়েটাকে দেখে রাখার। আর কোন কাজ করতে বললে লবডঙ্কা। কাজের সুবিধার জন্যে বহুবার আরেকটা কাজের মানুষ রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু স্বামী, শাশুড়ি (সেই গ্রামের বাড়িতে বসবাস করা শাশুড়ি) রাখতে দিবেন না। উনার মেয়েকে সন্ধ্যায় অবশ্যই কোথাও ঘুরাতে নিয়ে যেতে হবে। কে নিয়ে যাবে? মা নিয়ে যাবে। শুক্রবারে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। কে নিয়ে যাবে? মা নিয়ে যাবে। আর বাবা? বাবা যে সারা সপ্তাহ কাজ করে ক্লান্ত! বাবার যে বিশ্রাম দরকার! বাসায় কাজ অনেক, এতদূর থেকে অফিস করে এসে কাজ করতে খুব কষ্ট হয়ে যায়, এসব কথার একটাই উত্তর, “চাকরী ছেড়ে দাও।”