মুক্তধারা

একজন মৃত্তিকা

আতাউল হাকিম আরিফঃ অর্নব রাহি,স্বপ্নবিলাসী তরুণ,কিছুটা খেয়ালী স্বভাবের, রাজনীতি ও কবিতা তাঁর চিন্তায় বদ্ধমূল। স্কুল জীবন থেকেই সে ছাত্ররাজনীতি ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী বলা চলে।সুযোগ পেলেই ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন কর্মসূচি অংশগ্রহণ করতো।এ দুটোই পারিবারিক সূত্রে পাওয়া বলা চলে।বড় দুইভাই রাজনীতিতে জড়িত,আওয়ামী
রাজনীতির সক্রিয় সদস্য।বাবা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন, পেশায় শিক্ষক। স্বভাবতই দেশী বিদেশি অজস্র বইয়ে ঠাসা পারিবারিক বুকশেলফ।শেক্সপিয়ার, কীটস,শেলী, বার্ণাড শ, কালমার্ক্স,র‍্যাবো,টলস্টয়, আর্নেস্ট হ্যামিংওয়ে, ভিক্টোরহুগো, বোর্হে লুইস, পাবলো নেরুদা,কাফকা,ট্রেড হিউজেস, এলেন গ্রিন্সবার্গ থেকে শুরু করে অনেক বাঙালি দার্শনিক, লেখক যেমন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল,বঙ্কিম,মাইকেল মধুসূদন, শশাঙ্ক মোহন,হরিপদ শাস্ত্রী, অক্ষয় কুমার মিত্র,নবীন চন্দ্র সেন,হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্ল দেব,আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ,সরদার ফজলুল করিম,অদ্বৈত মল্লবর্মন, সৈয়দ ওয়ালীউল্ল্যাহ, মোহাম্মদ ওয়ালীউল্ল্যাহ শওকত ওসমান, আবু ইসহাক,আব্দুল জাব্বার,
আরজ আলী মাতবব্বর,আক্তারুজ্জামানইলিয়াছ,কায়েস আহমেদ,কমল কুমার মজুমদার,হাসান আজিজুল হক,আহমদ ছফা,শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুন, আবুল হোসেন, আবুল হাসানসহ সহ অসংখ্য লেখকের প্রবন্ধ,গল্প, কবিতা, উপন্যাসের অজস্র সমাহার।অর্নব রাহি হাতের নাগালে পাওয়া এইসব লেখকের অনেকগুলো বই পড়েছেন।স্বভাবতই চিন্তাচেতনা ও মননে সহকর্মীদের চাইতে পুরোপুরি ভিন্ন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতেও নিয়োজিত ছিল।কিন্তু একাডেমিক শিক্ষায় তাঁর উদাসীনতা ছিলো লক্ষনীয়,ক্যারিয়ার গঠনেও খুব একটা মনোযোগী হয়নি কখনোই।অর্নব রাহির জীবনের আরেকটি অধ্যায় ছিলো-প্রেম।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই মৃত্তিকা নাম্নী একটির মেয়ের সাথে পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটে কোনো এক সাহিত্য আড্ডায়। মৃত্তিকা ছিলো সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী।যতটুকু মনে পড়ে উত্তর আধুনিক তত্ত্ব নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থেকেই পারস্পরিক কাছে আসা, ক্রমেই গভীর অনুরাগ এবং প্রেম।সেই থেকেই মৃত্তিকার ভাবনায় শুধুই অর্নব,অর্নব-ই তার ধ্যানমগ্নতা!অন্যদিকে অর্নব ছাত্র রাজনীতি,সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সাংবাদিকতায় ব্যস্ত সময় পাড় করছে পাশাপাশি প্রেমিকাকেও যতটুকু সম্ভব সময় দিচ্ছে।মৃত্তিকা দেখতে সুন্দরী,চিমচাম শারীরিক গঠন,মুখে সার্বক্ষণিক হাসি লেগেই থাকতো।মাঝেমধ্যে রেগেমেগে যেতেও তার জুড়ি নেই।অর্নবের নানাবিধ ব্যস্ততায় ছিলো এই রাগের মূল উৎস।মৃত্তিকা চাইতো অর্নব শুধু পড়ালেখা,প্রেম আর কবিতা এই নিয়ে ব্যস্ত থাকুক এর বেশী কিছু নয়।অর্নব তা মানতে পারেনা, ছাত্ররাজনীতির নেশা তাঁর অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি উচ্ছেদ ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত।

চবির ক্যাম্পাস সেসময়টাতে ছিলো বেশ উত্তপ্ত, দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ছিলো খুবই সোচ্চার। মৃত্তিকার ভয় ছিলো অর্নবের না জানি কিছু হয়ে যায়!মাঝেমধ্যে মৃত্তিকা অর্নবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো,অর্নব তাঁকে অভয় দিতো,লক্ষীটি প্লিজ কেঁদোনা,আমার কিচ্ছু হবেনা,আমি শুধুমাত্র তোমাকে পাওয়ার জন্য যথেষ্ঠ সতর্ক থাকি,মৃত্তিকাও অভিমানের সুরে বলে উঠে তাহলে সেদিন কেন লাঠি মিছিলের অগ্রভাগে ছিলে!আর বলছো সতর্ক আছি,অর্নব বুঝতে পারি মৃত্তিকা তার গতিবিধির উপর বেশ লক্ষ্য রেখে চলেছে।কিছুক্ষণ পর মৃত্তিকা কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বলে গত সপ্তাহে ছোট কাগজে প্রকাশিত তোমার কবিতাটি খুব ভালোলেগেছে।অর্নবও প্রতিত্তোরে বলে তোমার টাও মন্দ হয়নি, একইসাথে জিজ্ঞেস করলো সম্প্রতি কি পড়ছো?মৃত্তিকা- এইতো দুদিন আগে আবুল বাশারের ফুলবউ শেষ করলাম এখন পড়ছি কমল কুমার মজুমদারের গল্প সমগ্র,অর্নব মৃত্তিকার বউ সংগ্রহের প্রশংসা করলো সেইসাথে “ফুলবউ” র সাহসী উপস্থাপন এবং প্রেমের জটিল,দুর্বোধ্য মনস্তত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনার পাশাপাশি কমল কুমার মজুমদার বাংলা সাহিত্যের নিঃসন্দেহে অন্যতম শক্তিশালী গল্পকার বলে অভিমত ব্যক্ত করে।কমল কুমার মজুমদারের “বিভাস”প্রসঙ্গেও কিছুটা আলোচনা এগিয়ে যায়।এইভাবেই তাঁদের আলোচনায় সাহিত্য,সংস্কৃতি বিষয়ক কথাবার্তা সবসময় প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

অর্নব রাজনীতির প্রসঙ্গে সাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও মৃত্তিকা তা মোটেও গ্রাহ্যে করেনা।সমানে খুনসুটি,মান-অভিমানও চলতে থাকে।হঠাৎ-ই একদিন মৃত্তিকার একটি চিঠি পেয়ে অর্নবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, মৃত্তিকা জানাই পারিবারিক ভাবে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছে,ছেলে উচ্চ শিক্ষিত এবং জাপানে সেটেল্ড।মৃত্তিকা জানাই অর্নব যদি তাঁকে বিয়ে না করে তাহলে সে সুইসাইড করবে।অর্নব একেতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তার উপর বেকার,তারপক্ষে এই মুহুর্তে বিয়ে করা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।কিন্তু এটাও সত্য যে সেও মৃত্তিকাকে ছাড়া নিজেকে কিছুতেই কল্পনা করতে পারেনা,মৃত্তিকাকে পাগলের মতো ভালবাসে সে।সময়ক্ষেপণ না করে অর্নব মৃত্তিকাকে জানাই সে তাঁকে বিয়ে করবে এবং তা আগামীকাল-ই।তবে শর্ত দেয় বিয়ের বিষয়টা তাঁর পরিবারকে জানিয়ে আপাতত পারিবারিক বিয়ের আয়োজন ভেঙে দিবে।পরে নিজেকে তৈরি করে তারা সংসার করবে।মৃত্তিকা তাতেই রাজি হয়,পারিবারিকভাবে অনেক ঝড় তাঁর উপর বয়ে যায়।অর্নবের জন্য সবকিছুই মুখ বুজে সহ্য করে।
আজ বেশ কয়েক বছর হলো তারা সংসার করছে, একটি সন্তানও আছে, অর্নব রাজনীতির নষ্ট স্রোতে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারায় অনেকটায় কোনঠাসা,ক্যারিয়ারটাও খুব একটা ঘুচিয়ে নিতে পারেনি,মৃত্তিকার উৎসাহে সাহিত্য চর্চাটা কিছুটা চালিয়ে যাচ্ছে,তাঁর বেশ কটি কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে।মৃত্তিকা সংসার এবং চাকুরী দুটোই সামলাচ্ছে সমান দক্ষতায়।