সেলুলয়েডের গল্প

ঋতুপর্ণ ঘোষ ভারতবর্ষের এল.জি.বি.টি কমিউনিটির একজন বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব ছিলেন

৩০শে মে, সাল ২০২০; গত সাত বছর আগে  ক্যান্সারজনিত কারনে মৃত্যুবরণ করেন কলকাতার একজন লেখক, চলচিত্র পাড়ার একজন গীতিকার, একজন অভিনেতা এবং পাশাপাশি একজন সৃজনশীল পরিচালক যার নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ।

ঋতুপর্ণ ঘোষ অর্থনীতিতে ডিগ্রি অর্জনের পরে তাঁর শিল্পী জীবনের ক্যারিয়ার শুরু করেন কলকাতার একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে নিযুক্ত হয়ে। ১৯৯২ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম চলচিত্র “হীরের আংটি”। দুই বছর পর মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় চলচিত্র “উনিশে এপ্রিল”, তিনি তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র- উনিশে এপ্রিলের জন্য ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন এবং সেই বছরে এই ফিল্ম দিয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের কাহিনীর জন্য “জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার” জিতে নেন। সমকালীন পরিচালক অপর্ণা সেন এবং গৌতম ঘোষের সাথে ১৯ টি জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করে ঋতুপর্ণ ঘোষ কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে নিতে সক্ষম হন।

তিনি ভীষনভাবে রবীন্দ্রভক্ত এবং সাথে সত্যজিত রায়ের অনুরাগী ছিলেন। মূলত তিনি সত্যজিৎ রায়ের লিখায় প্রভাবিত হয়ে পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যগত লেখার আগ্রহী পাঠক হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কাজ প্রায়শই তাঁর ফিল্মগুলোতে প্রকাশ এবং উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন রকমভাবে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী নিয়ে “জীবন স্মৃতি” নামের একটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি করেছিলেন। প্রায় দুই দশক ব্যাপী তাঁর ক্যারিয়ারে ঋতুপর্ণ ঘোষ ১২ টি জাতীয় পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন।

ঋতুপর্ণ ঘোষ ভারতবর্ষের এল.জি.বি.টি কমিউনিটির একজন বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পৃথিবীর প্রতেকটি মানুষের ভেতরে দুইটি সত্তা থাকে, একটি পুরুষ এবং অপরটি নারী সত্তা; সামাজিক, পারিবারিক এবং পরিবেশের চিরচায়িত প্রথা অনুযায়ী পুরুষ কেবল বাহ্যিকভাবে তার পুরুষালী সত্তাটির বিকাশ ঘটায় এবং প্রকাশ করে, আর তার ভেতরকার নারী সত্তাটি সে নিজের ভেতরে সুপ্ত বা গুপ্ত রাখে, কারণ পাছে আবার পুরুষটির সমাজ যাতে আবার তাকে বিতাড়িত বা নিন্দনীয় না করে দেয়। তদ্রুপভাবে নারীরাও এই গন্ডির ভেতরে তাদের জীবনকে অতিবাহিত করায় ব্যতিক্রম নয়। বস্তুত তিনি এই ভাবনার প্রতিফলন যেমনটা তাঁর নিজের বাস্তব জীবনে ব্যাক্ত করেছেন সাথে পাশাপাশি একইভাবে তাঁর পরিচালনা করা ফিল্মের মধ্যেও তাঁর এই ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে তা প্রতিফলিত করেছেন।

একটা সময়ের পর তিনি রুপান্তরকামী জীবনযাপন নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেন ও তিনি তাঁর নিজের সমকামী সত্তাটিকে জনসম্মুখে প্রকাশ্যে ব্যাক্ত করতে থাকেন। ঘাটবাঁধা পুরুষদের বাহ্যিক আচারিক ব্যবহার এবং বেশভূষা ত্যাগ করে তিনি ভিন্ন ধরনের পোশাক পরিচ্ছদে নিজেকে উপস্থাপন করতে থাকেন, যা ভারতীয় চলচিত্রের খুব কম আর্টিস্টই এখন পর্যন্ত তা এমন করে সরাসরিভাবে নিজেদের প্রকাশ করেছে। জীবিত অবস্থায় এই কারণে তিনি বিভিন্নভাবে বির্তকিত হয়েছেন এবং পাশাপাশি কখনও মিডিয়ায় হাসির পাত্র হয়েছেন, তবুও ঋতু তার শেষ ক্রিয়াকাল পর্যন্ত তাঁর এই অভিরুচিতে অনড় ছিলেন।

২০১৩ সালে মে মাসের ৩০ তারিখে কলকাতার নিজ বাড়িতে হার্ট এ্যাটাকের জন্য এই গুনী শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। দীলিপ এবং বিষ্ণু নামের তাঁর দুই বন্ধু প্রাথমিক অবস্থায় ঋতুপর্ণকে তাঁর বাড়িতে তাকে তাঁর বিছানায় অজ্ঞান অবস্থায় পায়। এরপর প্রতিবেশী নিরঞ্জনা সেন গুপ্ত ডাক্তার নিরুদ্ধয়কে খবর দেন এবং ডাক্তার ঋতুপর্ণ ঘোষকে মৃত বলে ঘোষনা করেন, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৪৯বছর।