হুতুমপেঁচা বলছি

প্রাণী হতে পারে, কিন্তু তারাও মা, তাদেরও বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা আছে, বাচ্চাদের বিচ্ছেদ তাদেরও কাঁদায়!

ডিশটিং মৌরীঃ আমার পুচকুর পাঁচটা বাচ্চার যখন আড়াই মাস, তখন আমি সিধান্ত নিলাম পুচকুকে স্পে করাতে হবে। নয়তো যদি আবার মা হয়ে যায়! একজন ভালো ভেটের সাথে পরামর্শ করে দিনক্ষণ ঠিক করা হলো। বাসাতেই অপারেশন করা হবে। অপারেশনের সময় কি জটিলতা হয়েছিল সে না হয় আরেকদিন লিখবো। বাবুদেরকে আলাদা রেখে অন্য একটা রুমে পুচকুর অপারেশন হলো এবং যথাসময়ে ভেট তাকে রুম থেকে বের করলো। জানালো যে, যেহেতু এন্যাস্থেশিয়া দেয়া হয়েছে, আজকে সারারাত পুচকু ঘোরের মধ্যে থাকবে, বেশী নাড়াচাড়া করবে না, বমি করবে, যদি জেগে উঠে কিছু চায় তাহলে যেন সলিড খাওয়া না দেওয়া হয় আর বাচ্চাদের কাছ থেকে অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে। বাচ্চারা খুব বুঝতে পারছিলো যে, কিছু একটা হয়েছে, ওরা আম্মাদের রুমে ছিল, খুব একটা ঘোরাফেরা করছিল না। পুচকুকে আমরা সেন্সলেস অবস্থাতেই আমার রুমে শুইয়ে দিয়ে বাইরে এসে ভেটের সাথে কথা বলছিলাম, উনি আমাদের সব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। এমন সময় দেখি, পুচকু আমার রুম থেকে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে বের হয়ে বাইরের বাথরুমের পাপোশে (যেটা তার খুব প্রিয় জায়গা ছিল বিশ্রামের) এসে উপুর হয়ে শুয়ে পড়লো। আমরা আবার তাকে ধরাধরি করে আমার রুমে নিয়ে গেলাম। এরপর ভেট চলে যাওয়ার পর দেখি আবারো একই অবস্থা! পুচকু আবারো বাইরে পাপোশের উপর! আবার ওকে রুমে নিয়ে গেলাম! এবার ওকে ঝুড়িতে শুইয়ে দিলাম, সাথে ঝুড়ির মুখটা বন্ধ করে দিলাম। পুচকু তারপর কিছুক্ষণ একটু অচেতন থাকলো। বাচ্চাদের আমি তখন রুমে আনার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কেউই রুমে থাকতে পারে নাই। কোনো এক অজানা ভয়ে তারা খালি রুম থেকে পালাতো! আমরা যখন খেতে বসবো, তখন দেখি পুচকু ঝুড়ির মুখ নিজে খুলে বের হয়ে খাবার রুমে ওর একটা বিশেষ স্থান আছে, সেখানে এসে শুয়ে আছে! তখন তাকে আমি আবার ঝুড়িতে পুরে ফেললাম। সরানোর পরে অবশ্য দেখেছি যে, সে ওইখানে হিসি করে দিয়েছিল। ওই অবস্থাতেও তার মাথায় এটা কাজ করেছে যে, ঝুড়িতে হিসি করা যাবে না! বুদ্ধি রে বাবা!! কিন্তু ওর তো মাত্র একটা অপারেশন হয়েছে, স্টিচ পড়েছে, ওর নাড়াচাড়া করা বারণ, কিন্তু ওকে যে মানানোই যাচ্ছে না! একি মুশকিল!! এতো যা কিছু করছে, সে কিন্তু অর্ধেক সেন্সে আছে, হাঁটতে পারছে না, ছ্যাঁচড়ায়ে চলছে! তাও শুধু বের হয়ে যাচ্ছে!

এইবার ওর ঝুড়ির উপর আম্মার পাটা চাপা দিলাম যাতে খুলতে না পারে। এরপর আমি ড্রয়িংরুমে বসে আছি, হঠাৎ দেখি পুচকু আবার ড্রয়িংরুমে! রুমে তখন ওর দুইটা বাচ্চা খাচ্ছিল। পুচকু একটু থেমে, হঠাৎ তেড়ে গেল তার বাচ্চাদের কাছে। আর বাচ্চাগুলা তো খাবার প্লেট উল্টে দৌড়! একটা আবার লেজ ফুলায় রাগে, ঘ্যাও ঘ্যাও করে থ্রেট দিচ্ছে। পুচকুকে ধরতে গেলাম, সে আবার তার আরেক বাচ্চার দিকে তেড়ে গেল! বাচ্চাদের মধ্যে কি একটা আতঙ্ক! সব দৌড়াচ্ছে, চিৎকার করছে, তারা পুচকুকে চিনে না! আর পুচকু তার বাচ্চাদের কাছে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে! তখন আমি পুচকুকে নিয়ে আমার রুমে ঢুকে পড়লাম, দরজা বন্ধ করে ওকে ঝুড়িতে ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর শুরু হলো আমার ২দিনের বিনিদ্র রজনী! পুচকু আর অর্ধেক সেন্সে নেই, পুরা সেন্সে চলে আসছে! সারাটা রাত আমি আক্ষরিক অর্থে তার সাথে যুদ্ধ করেছি, তাকে ঝুড়ি বন্দী করার জন্যে! পুচকু ঝুড়িতে থাকবে না আর আমি ওকে বের হতে দিবো না। আর জানি না, কোথা থেকে তার শরীরে এই শক্তি আসছে। সে ঝুড়ির মুখে এমন করে বাড়ি দিচ্ছিলো যে, আমার হাতই সরে যায় পারলে! রাতের এক পর্যায়ে আমি ঝুড়ির উপর আমার হারমোনিয়াম চেপে দিয়েছিলাম, মনে করেছিলাম, এইটা তুমি আর সরাতে পারবে না চাঁদু! কিসের কি! সে ধাক্কা দিয়ে হারমোনিয়াম সরায় দেয় পারলে! এ কি অসুরের শক্তি! আমি হারমোনিয়াম চেপে বসে আছি, সে এমন ধাক্কা দিছিলো যে, আমার হাতই সরে যায়!

একটা সময়ে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। আর কতো ঝুড়ির মুখ চেপে ধরে বসে থাকা যায়! পুচকু বের হয়ে শুরু হলো তার রুম থেকে বের হওয়ার প্রচেষ্টা! কিন্তু জানালা লক, দরজা লক! খুলবি কেমনে! তাতে তার কিসসু যায় আসে না! সারাটা রাত সে নিজে ঘুমায় নাই, আমাকেও ঘুমাতে দেয় নাই। একবার একটু চোখ লেগে এসেছিল, শয়তানটা বিছানায় উঠে হিসু করে দিয়েছে! ঠিক যেখানে আমি শুই, সেইখানে! সারা রাত, তার পরের দিন, তার পরের রাত, পুচকুর মাথায় খালি একটাই চিন্তা, বের হতে হবে এখান থেকে, বাচ্চাদের কাছে যেতে হবে। হ্যা, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, সে আসলে তার বাচ্চাদের কাছে যাবার জন্যে পাগল হয়ে গেছিল। যখন তাকে আর কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারি নাই, তখন ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম বাচ্চাদের কাছে। কিন্তু বাচ্চারা কেউ ওকে চিনছিল না। কারণ ওর শরীরের গন্ধ যে বদলে গেছে! ওর শরীরে আর আগের গন্ধ ছিল না, তাই বাচ্চাদের কাছে পুচকু অচেনা! বাচ্চারা ভয় পেত, দেখলে লেজ ফুলিয়ে ঘ্যাওঘ্যাও করতো, দৌড়ে পালাতো। কিন্তু তাও পুচকু যাবেই ওদের কাছে। আর কিছু না হোক, কাছাকাছি যেয়ে বসে থাকবে, কিচ্ছু সাড়াশব্দ করবে না, তাও কাছে থাকবে। তাও মা তার বাচ্চার কাছে যাবেই! যখন রাত হতো, বাচ্চাদেরকে আলাদা রুমে আটকে রাখতাম, কারণ রাত জেগে আবার কে পাহারা দিবে! সারা রাত পুচকু সেই দরজার সামনে যেয়ে বসে থাকতো, ম্যাওম্যাও করতো, আমি উঠে যেয়ে ওকে আবার আদর করতাম, ওকে নিয়ে আসতাম আমার রুমে। একটা সময় বাচ্চারা যখন ওকে মা হিসেবে চিনে নেয়, তখন রাতে ওরাও কষ্ট পেত। একটা তো মায়ের কাছে যাবে বলে আমার দরজার কি হাল করেছে, সে না হয় নাই বললাম! কিন্তু যে কটা দিন পুচকুর সেলাই মিশে নি, সে কটা দিন মা আর তার বাচ্চারা, দুইপক্ষই খুব ভুগেছে! তারা প্রাণী হতে পারে, কিন্তু তারাও মা, তাদেরও বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা আছে, বাচ্চাদের বিচ্ছেদ তাদেরও কাঁদায়!

বিঃদ্রঃ পুচকু কিন্তু এখন আবার তার বাচ্চাদের চিনে না, কিন্তু সে আরেক কাহিনী! সে আরেক দিন হবে না হয়।