ইচ্ছেঘুড়ি

ত্রিপুরা আড়ালে কেন? 

মনিকা রোয়াজা:  ‘ত্রিপুরা’ একটি জাতির নাম, এমনকি একটি প্রাচীন রাজ্যও বটে যার অস্তিত্ব এখনও টিকে আছে । প্রাচীন মহাভারত যুদ্ধে ত্রিপুরা রাজার অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে । তা হলে বোঝা যাচ্ছে ত্রিপুরাদের ইতিহাস কত পুরানো । স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল অনেক । বর্তমান বাংলাদেশের বিরাট অংশ তখন স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে ছিল । বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে তখন ত্রিপুরা মহারাজা মগ বংশকে পরাজিত করে তা দখল করেছিল ।

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরনে ত্রিপুরার সেনাপতি বীরেন্দ্র সিংহ গৌড় আক্রমণ করে জয়লাভ করে শ্রীহট্টসহ গৌড়রাজ্য ত্রিপুরা রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে লেখক সাজ্জাদ আলী তাঁর “ইতিহাস ও ঐতিহ্য : ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ” প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন । আজকে আমরা আমাদের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলাকে নিয়ে গর্ববোধ করি তাকেও রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যে । আমাদের বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সর্বপ্রথম “কবি’র” স্বীকৃতি বা মর্যাদা প্রদান করে ত্রিপুরা মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য । আরো আমাদের বিভিন্ন কবির বিলেতে পড়াশোনাসহ তাঁদের প্রবন্ধ, গ্রন্থ, লেখা প্রকাশনায় আর্থিক সহায়তাসহ নানা সহযোগিতা করেছিলেন ত্রিপুরা মহারাজাগন ।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অংশগ্রহন করে আত্মত্যাগ করেছে । মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খাগড়াছড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী সর্ব প্রথম ব্যক্তি ছিলেন একজন ত্রিপুরা যার নাম “সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরা, বীর মুক্তিযোদ্ধা । ১৯৭১ সালের ১২ই এপ্রিল রামগড় উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে পতাকা উত্তোলন করা হয় । বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিপুরা একটি । ত্রিপুরাদের আছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ইত্যাদি । বর্তমানে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় ত্রিপুরাদের বসবাস রয়েছে ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেশের একটি সীমারেখা তৈরি হয়ে একটি স্বাধীন দেশের মানচিত্র প্রাপ্ত হলো আমাদের । ত্রিপুরা রাজ্যের একটি অংশও এই মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত হলো । ত্রিপুরারা যে যেখানে ছিলো দেশকে, দেশের ভিটাকে ভালোবেসে সেখানেই থেকে গেলো । একারণেই নিজের দেশে থেকেও আজ অনেকেই প্রশ্ন তুলছে “ কারা এদেশের আদিবাসী” ? আমরা পড়াশোনা জানা উচ্চ শিক্ষিত মানুষ, ইতিহাস পড়েছি, ইতিহাস জানি । তারপরও “কারা আসল আদিবাসী” ইস্যুটি রাজনীতির পর্যায়ে নিয়ে গেছি । তাই হোক, বর্তমানে ত্রিপুরা জাতির মধ্যে অনেকেই দেশে বিদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত আছেন ।

অন্যান্যদের বাদ দিলাম, পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে আসীন ছিলেন নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, এমনকি বাংলাদেশের পুলিশের প্রধান হওয়ার কথা ছিল কিন্তু রাজনীতির কারণে হয়তোবা হতে পারেনি । আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য এবার আসি । ত্রিপুরাদের আছে ইতিহাস, রাজ্য শাসন ও বৃটিশদের কাছে মাথা নত না করার ইতিহাস, কবিদের স্বীকৃতি দেবার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের ইতিহাসসহ সবকিছুই আছে । এমনকি বর্তমানেও ত্রিপুরাদের রাজা আছে । বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছে ত্রিপুরার মতো অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সাথে । কমবেশি বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিপুরা স্টুডেন্টস পড়াশোনা করেছে ও করছে । তারপরও বাংলাদেশের মানুষ ত্রিপুরা নামটি জানা বিংবা শোনা থাকলেও না জানা বা না শোনার ভান করেছে, করে, এখনও করছে ।

“ত্রিপুরা” শব্দটি শুনলে না শুনার ভান করে বলে, “আপনারা কোথায় থাকেন? কোথা থেকে এসেছেন ? আপনারা কী চাকমা? আপনারা কী খান? ও ভার্সিটিতে আমার ওমুক নামে ত্রিপুরা বন্ধু ছিল, মনে পড়েছে । ইত্যাদি ইত্যাদি ।” অথচ এটা তারা জিজ্ঞেস করছে তাদেরও এক সময় সেই ত্রিপুরা বন্ধু ছিল কাছের বন্ধু । আমরা ভুলেই যাচ্ছি আমাদের প্রকৃত শিক্ষা । শিক্ষিত হয়েও আজ আমরা মূর্খই থেকে গেলাম । ত্রিপুরাদের সবকিছু থেকেও রয়ে গেলো আড়ালে । কেবল সংখ্যালঘুর কারণেই কী তা হচ্ছে । না । আমাদের প্রকৃত শিক্ষার অভাব । মানুষের পরিচয় ফুটে ওঠে সে প্রকৃত শিক্ষাটা গ্রহণ করেছে কিনা তার উপর ।