মুক্তধারা

একবিন্দু চোখের জল

মনিকা রোয়াজা: লেখক/কবিদের লেখায় নারীদের স্থান থাকে শীর্ষে, নারীরা হয় সবল, পরিশ্রমী, মর্যাদার আসনে আসীন । কিন্তু বাস্তবে তাঁদের ঠাঁই হয় প্রতিকূল পরিবেশে । অবশ্যই ব্যতিক্রম কিছু পরিবারও রয়েছে, সেই ব্যতিক্রমধর্মী পরিবারটিকে আমি সম্মান জানাচ্ছি । তবে এই পরিবারটি সমাজের কাছে হেনস্থার শিকার হচ্ছে না তো? কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও দেশের এমনকি বিশ্বের অধিকাংশ নারীর ‘চিত্র’, ‘কাঠামো’ এক হয়ে থাকে । অধিকাংশই কোন না কোন পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে । কেউ মানসিক, কেউ শারিরীক, কেউ বা যৌন সহিংসতার শিকার । তেমনি আমার পরিচিত মানসিক সহিংসতার শিকার মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী ইভা (ছদ্মনাম)। তাঁর এক মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছে । মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজনও খুব ভালো ।

মেয়েটি স্বামী সংসার নিয়ে সুখেই আছে । মেয়ে ও মেয়ের জামাই দুজনই চাকরিজীবী । মেয়েটি ও তার স্বামী মেয়েটির বাবা-মাকে প্রতি মাসে মাসে হাত খরচসহ অন্যান্য খরচ বাবদ কিছু টাকা পাঠায় । বেঁকে বসে মেয়ের বাবা । প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা পেতে চান তিনি । কারন হচ্ছে ইভা তাঁকে ছেলে দিতে পারেনি । অবশ্যই ইভার দুটি ছেলে হয়েছিলো, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা দুটি ছেলেকে ভালোবেসে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে তাদের মুক্তি দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন ।

ইভার স্বামীর ভাষায় “ ইভা ইচ্ছা করেই তাঁর ছেলে দুটিকে মেরে ফেলেছেন । ইভা চাইতো না তাঁর স্বামীর বংশধর পৃথিবীতে বেঁচে থাকুক । ইভা ইচ্ছা করেই তাঁর স্বামীকে নিজের হাতের মুঠোয় করে রাখার জন্যই তা করেছে ” । পাঠকগণ চিন্তা করে দেখুন কোন মা কী তাঁর বুকের দুধের ছেলেকে মেরে ফেলতে পারে ??? আমাদের সমাজে এখনও এধরনের জঘন্য মনমানসিকতার লোক রয়েছে । যাই হোক, ইভার রাজ্যে আসি আবার । যত বয়স যাচ্ছে ইভার মানসিক অত্যাচার ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে । ইভার স্বামী সব সময় ইভাকে কথা শোনাতো এইভাবে , “ছেলে দুটিকে তুমি মেরে না ফেললে আজ ওরাও তোমার মেয়ের মতো চাকরি করতো, আমাকে মাসে মাসে অনেক টাকা দিতো । এলাকার বাবুকে (ছদ্মনাম) দেখো, প্রতি মাসে তার বাবা-মাকে অনেক টাকা পাঠাচ্ছে ! ” এবার আসি ক্ষুদ্র একটি পরিসর আদিবাসী (শব্দটি যেহেতু বাঙ্গালি নৃগোষ্ঠী ছাড়া অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়) সমাজে ।

কলেজ পেরিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য নিজের জেলার সীমানা পেরিয়ে ঢাকায় পা দিই আমি । এর আগে দুয়েকবার ব্যক্তিগত কাজের জন্য অল্প সময়ের জন্য ঢাকায় এসেছিলাম । আমাদের দেশের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর ধারণা যে, আদিবাসী সমাজে নারী-পরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই । এ সমাজে সবাই সমান, সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলে কাজ করে । আমি অবাক হয়েছিলাম । আদিবাসী নারী-পুরুষরা কিভাবে নিজেদের বিশ্বের কাছে প্রকাশ করছে । আমাদের সমাজকে কেন ব্যতিক্রম করে উপস্থাপন করছে ? আদিবাসীদের মতো বাঙ্গালি নৃগোষ্ঠীর মধ্যেও ব্যতিক্রম রয়েছে বা থাকতে পারে ।

যাই হোক, নারী নারীই, সে বাঙ্গালি হোক, ত্রিপুরা হোক, চাকমা, মারমা হোক । আমি যেহেতু নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, তাই সবকিছুকেই আমি নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেই বিচার করি । আমার কাছে নয় ত্রিপুরা, বাঙ্গালি, নয় চাকমা, মারমা নারী, আমার কাছে নারী নারীই । আদিবাসী সমাজের নারী-পুরুষ সবাই একসাথে ফসলের মাঠে, জুম পাহাড়ে কাজ করে বা করছে, কিন্তু নারীরা কী সহিংসতার বাইরে ??? মোটেই না ।‌। খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা তৈরি করে দুপুরের খাবারটাও রান্না করে রেখে কাজে যেতে হয় আদিবাসী খেটে-খাওয়া পরিবারের নারীদের । তারা জুম চাষের সাথে জড়িত, সেই সব পরিবারের নারীদের সন্ধ্যায় জুম পাহাড়ে থেকে ফিরে আবার রান্নায় বসতে হয় পরিবারের সদস্যদের রাতের খাবারের জন্য, তাকে রান্না না করলে যে সদস্যদের খাবার জুটবে না !! অথচ কাজ থেকে ফিরে পুরুষরা তার বন্ধুদের সাথে এলাকার দোকানপাটে গল্প করবে না হয় ঘরে টিভি থাকলে টিভি দেখতে বসে । কোথায় আদিবাসী নারীর ব্যতিক্রমধর্মীতা ??? তাদের দু্ঃখ-কষ্টের খবর রাখে কেউ?? প্রতিনিয়ত স্বামীর হ্যাঁ’র সাথে হ্যা্ঁ, না’র সাথে না তার মিলিয়ে চলতে হয় । নিরবে, আড়ালে কেবল একবিন্দু চোখের জলই তাদের সুখ-দুঃখের সাথী ।