নির্বাচিত, হুতুমপেঁচা বলছি

মাদাম কুরীঃ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা বিজ্ঞানী

ডিশটিং মৌরীঃ মাদাম মেরী কুরী একমাত্র মহিলা বিজ্ঞানী যিনি বিজ্ঞান গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ দুইবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। এই প্রাতঃস্মরণীয় বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছিলো ১৮৬৭ সালের ৭ই নভেম্বর তারিখে পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে। তাঁর পিতা ছিলেন একজন শিক্ষক এবং মাতাও ছিলেন একটি মেয়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী ও পরিচালিকা। বাল্যকাল থেকেই মেরী ছিলেন খুব মেধাবী। ১৮৮৩ সালে মেরী স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন। এর মাত্র কিছুদিন আগেই যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে মেরীর মায়ের মৃত্যু হয়েছে, তাই বাবার মনে ভয় ছিলো, যদি মেরীও ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হলো গাঁয়ের বাড়িতে। সেখানে তাঁকে নাচগান শেখারও ব্যবস্থা করে দেয়া হলো। কিন্তু তাঁর মন পড়ে ছিলো গণিতের বইয়ের পাতায়। তাই তিনি আবার ওয়ারশ ফিরে এসে কলেজে ভর্তি হবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তখন তাঁর পিতার আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিলো না। অতপর মেরী আর তার বড় বোন, ব্রোনিয়া জীবন সম্পর্কে একটা পরিকল্পনা নিয়ে ফেললেন। মেরী প্রথমে চাকরী করে ব্রোনিয়ার পড়ার খরচ চালাবেন, তারপর ব্রোনিয়ার পড়া শেষ হলে তিনি চাকরী করে মেরীকে পড়াশোনার সুযোগ দিবেন।

এই চুক্তি অনুসারেই মেরী চাকরী নিলেন এক অভিজাত রাশিয়ান পরিবারে। সেখান থেকে ১৮৮৬ সালে তিনি চাকরী নিলেন আরেক বাড়িতে, যেখানে তিনি তিন বছর গভর্নেস হিসেবে ছিলেন। এখানেই গৃহকর্তার ছেলের সাথে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু ছেলের মা একজন গভর্নেসের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে রাজী ছিলেন না। এতে মেরী দারুন মানসিক আঘাত পান এবং এই সময়ের লেখা এক চিঠিতেই তিনি লিখেছিলেন, “এই ঘৃণিত পৃথিবী থেকে আমি বিদায় নিতে চাই, এতে ক্ষতি হবে খুব সামান্যই।”

 

ব্রোনিয়া ডাক্তারী পাশ করে আসলো মেরীর পালা। তিনি নিজের জমানো টাকা আর ব্রোনিয়ার আশ্বাসের উপর ভরসা করে ভর্তি হলেন প্যারিসের সারবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে। ১৮৯৩ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে প্রথম স্থান অধিকার করে Master of Science ডিগ্রী লাভ করেন এবং পরের বছর একই ডিগ্রীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ১৮৯৪ সালে তাঁর পরিচয় হয় পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়ন বিজ্ঞানের প্রতিভাবান ফরাসী বিজ্ঞানী, পিয়েরী কুরীর সাথে। এরপর থেকেই মেরী অধ্যাপক শুৎজেন বার্জারের গবেষণাগারে বিজ্ঞানী পিয়েরী কুরীর সাথে গবেষণা করার অনুমোদন লাভ করেন এবং এক বছরের মধ্যেই মেরী পিয়েরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

১৮৯৬ সালে বিজ্ঞানী হেনরী বিকোয়েরেল ইউরেনিয়াম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হলে এগিয়ে আসেন কুরী দম্পতি। মাদাম কুরীর ধারণা হলো অপরিশোধিত খনিজ পদার্থ ইউরেনিয়াম পিচব্লেন্ডের ভিতর নিশ্চয়ই অন্য কোনো পদার্থ আছে। অতঃপর তিনি লেগে গেলেন এই অপরিশোধিত খনিজ পদার্থ শোধনের কাজে। একটানা দীর্ঘ দুই বছর পরিশ্রমের পর তারা আবিষ্কার করলেন ‘বিসমার্থ’ যৌগিক উপাদান আর বিসমার্থকে আরো শোধন করতে গিয়েই তারা পেয়ে গেলেন তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু। ১৮৯৮ সালে কুরী দম্পতি ঘোষণা করলেন তাদের নতুন আবিষ্কৃত উপাদান, পোলোনিয়ামের কথা। অবশেষে আরো কিছুদিন পর পাওয়া গেলো আরো অত্যাশ্চর্য নতুন উপাদান, যার নাম তারা রাখলেন রেডিয়াম। এই অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারের জন্য ১৯০৩ সালে লন্ডনের রয়েল সোসাইটি কুরী দম্পতিকে ডেভীপদক দ্বারা ভূষিত করেন এবং একই বছর মাদাম কুরী বিজ্ঞানী হেনরী বিকোয়েরেলের সাথে একত্রে নোবেল পুরষ্কার পান।

 

১৯০৬ সালে স্বামী পিয়েরী কুরী এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, এই দুর্ঘটনায় মেরীর হৃদয় সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পরে। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণা অব্যাহত থাকে। ১৯১০ সালে একক প্রচেষ্টায় তিনি বিশুদ্ধ অবস্থায় রেডিয়ামকে পৃথক করারা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার জন্য তিনি এককভাবে দ্বিতীয়বারের জন্য নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। ১৯৩৪ সালের মে মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এর দুইমাস পরে জুলাই মাসে এই মহীয়সী বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। জানা যায় রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তাই তাঁর মৃত্যুর কারণ।