অনুরণন

চিঠি

৭ই আষাঢ়, ১৪২২

রত্না,

কেমন আছিস? আমি এখন একটু ভাল বোধ করছি। গত দুই মাস বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে, কোমরের ব্যাথাটা একটু বেড়ে গিয়েছিল। তাই লিখতে দেরী হয়ে গেল, রাগ করিস না।

জালাল কাকার কথা তোর মনে আছে? আমাকে যে স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করতো, সেই কাকা। গেল সপ্তায় জালাল কাকা চিঠি পাঠিয়েছেন, তাঁর মেঝো মেয়ের চাকরির ইন্টার্ভিউ আছে ঢাকাতে, ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে, আসছে মাসের ২৮ তারিখ। ঢাকায় তাদের পরিচিত কেউ নেই। মানুষ খুঁজে না পেয়ে তোকে লিখতে বসলাম।

জালাল কাকার চার মেয়ের মধ্যে এই মেয়েটার একটু ঝাঁজ আছে, বুঝলি। ওর নাম সোনালী। ছোট বেলায় বড় বোনের সাথে নাম মিলিয়ে রুমালি’র বোন রুপালী রেখেছিলেন দাদী। কী কাণ্ড, দ্যাখ! স্কুলে গিয়ে রেজিস্ট্রেশনে ওর নাম বদলিয়ে রাখলও সোনালী! বলে কিনা, ‘বাবা, দেখে নিও, আমি সোনা হবো, রুপা নয়’! তখন আমার মাধ্যমিক চলে, আমরা যখন আমাদের বাবা’র সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস পেতাম না তখন সোনালী জালাল কাকার মুখের উপর এমন একটা কাজ করে বসলো। জানিস, সেদিন আমি খুব কেঁদেছিলাম। ক্লাস সেভেনে উঠলে বাবা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, আমি দুইহাতে পা জড়িয়ে কেঁদেছিলাম আর বলেছিলাম, ‘বাবা, আমি মাধ্যমিক পাশ দিতে চাই’। মা সারারাত কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছিলেন কিন্তু বাবাকে রুখতে পারেননি, পরের মাসে আমার বিয়ে হয়ে গেল। রত্না একটু ভেবে দ্যাখ তো, বাবা নামের পুরুষটি যদি আমাদের না বুঝবেন তবে স্বামী হয়ে আসা পুরুষটি আমাদের কতটুকু বুঝবেন! কপাল গুনে একটা ভাল মানুষ পেয়েছিলাম, তাই মাধ্যমিক পর্যন্ত যেতে পেরেছি।

জালাল কাকার বড় মেয়ে রুমালির বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামে, তালুকদার বংশের আজিজ তালুকদারের মেঝ ছেলের সাথে। যৌতুক নাকি কী একটা বিরোধের কারনে মেয়েটার শরীরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল আজিজ তালুকদার। গ্রামে সালিশ বসেছিল, কাকা কাঁদতে কাঁদতে নিজের মেয়ের নিয়তিকে দোষ দিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। সেবারই মাঘ মাসে কাকীমার কাশিটা বেড়ে গিয়ে তিনিও ওপারে চলে গেলেন। কাকা আর বিয়ে করলেন না। সোনালী তখন মাত্র ৮ম এ উঠেছে, ছোট দুইটা বোনসহ গোটা দায়িত্ব তার উপরে। বাবা ও বোনদের প্রতি তার দায়িত্ব আর নিজের প্রতি সম্মানবোধ দেখে আমরা বোনেরাও কানাঘুষা করতাম।

সোনালীর ছোটটা (নাম যেন কী ঠিক মনে করতে পারছিনা ) তখন ৯ম এ উঠেছিল, গ্রামের নুরুল ঠিকাদারের ছেলে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ছেলেগুলো মেয়েটিকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সোনালী চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সবার কাছে মিনতি করেছিল কিন্তু কেউ কোন কথা বলেনি। আমরা যেখানে পুলিশের সিপাইদের দেখলে ভয়ে লুকিয়ে পড়তাম তখন সোনালী থানায় দারগাবাবুর সাথে দেখা করে ওর বোনকে উদ্ধার করেছিল! কী সাহস রে বাবা! সেই থেকে সোনালীকে গ্রামের সবাই ভয় পেত।

তোকে এত কথা কেন বললাম, জানিস? মেয়েটা অনেক সাহসী আর পরিশ্রমী। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে সে বিএ পাশ করেছে। ঢাকা শহর অনেক বড় আর মেয়েকে পাঠিয়ে ভরসা পাই এমন লোকও আমার নেই। আমাদের সইদের মধ্যে তুই যেমন মেধাবী তেমন জেদি ছিলি আর সেজন্যই তুই আজ এত বড় প্রফেসর হয়েছিস। আমি আমার মেয়েদের তোর খুব গল্প করি, জানিস। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার মেয়েরা যেন তোর মত হয় অথবা সোনালীর মত, কিন্তু আমার মত যেন না হয়। তাই তোর কাছে পাঠাতে চাই।

আমার ছোট মেয়েটা এবার ৮ম উঠলো, খুব জেদি মেয়ে। গেল বছরও ইংলিশ মিডিয়ামে ছিল, এবার ওর ইচ্ছায় বাংলাতে ভর্তি হয়েছে। ওদের বাবা ওদের সব কথা শোনে জানিস! মাঝে মাঝে আমার খুব হিংসে হয়, হা হা হা।

শুনলাম তোর বড় ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে, শুনে মনটা ভরে গেল। তুই ওত বড় প্রফেসর তোর ছেলেকে তো আরও বড় হতে হবে। দুলাভাইয়ের শরীরটা কেমন এখন?

ও হ্যাঁ, আর একটা কথা। পাশের বাসায় আর টেলিফোন দিস না, ওরা বাসা বদল করেছে। আমার ছেলেটা একটা চাকরি পেলেই আমরাও বাসায় একটা টেলিফোন নিবো। তুই আপাতত লিনুদের বাসায় ফোন দিস।

চিঠির উত্তর দিস, ভাল থাকিস।

ইতি,

তোর সই

হাসনা ।

লিখেছেনঃ মুনসাফা তৃপ্তি