মুক্তধারা

বৈশাখী ভাবনা

আতাউল হাকিম আরিফ : পহেলা বৈশাখ বাঙালির অন্যতম প্রাণের উৎসব। বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাঙালির চিন্তা ও মননে অন্যরকম এক উচ্ছ্বার্স সঞ্চারিত হয়ে থাকে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।এই বৎসর করোনা মহামারীর প্রেক্ষিতে বৈশাখী উৎসব -১৪২৭ বড় কলরবে হচ্ছেনা-এটি মানুষ গ্রহণ করেছে,করতে হচ্ছে।এর আগে প্রতিবছর-ই বৈশাখী উৎসবের কলরব বৃদ্ধি পেয়েছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বৈশাখী মেলাও হতো ঢাক-ঢোল, স্বদেশী-বিজাতীয় মিশ্র সংস্কৃতির মিশ্রণে! এই প্রসঙ্গে বিগত বৎসরগুলোতে মূল সংস্কৃতি চর্চা এবং অপ সংসস্কৃতি চর্চার প্রেক্ষাপট আলোচনা করা যেতে পারে।সেজন্যই মূলত আমার এই লিখা। প্রথমেই আসা যাক পহেলা বৈশাখ কি, এর চেতনাগত বৈশিষ্ট্য কিরূপ সেই বিষয়ে।

লেখকঃ আতাউল হাকিম আরিফ

আমরা সকলেই জানি বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি, সভ্যতার ধারক,বাহক পহেলা বৈশাখ। বৈশাখী ও বৈশাখী মেলা হতো মূলত গ্রাম ও মফস্বল কেন্দ্রিক। শহরেও হতো অল্প কিছু এলাকায়। ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, লালন ফকির,আব্বাস উদ্দীন, শাহ আব্দুল করিম কিংবা জালাল শাহ’র হৃদয় গাঁথা গানগুলো গাইতো গায়েন দল।গ্রাম-গঞ্জের হাটে তরমুজ,বাঙ্গী, ঘটি,বাটি,লেইস ফিতার পসরা সাজাতো বিক্রেতারা।ছিলো বলি খেলা কিংবা নৌকাবাইচ এর আয়োজন।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো সেটি হলো হালখাতা। আমরা সকলেই জানি হালখাতা এবং ফসল উৎপাদনের হিসাবের জন্যই মূলত বাংলা সন প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর।এবং হিন্দু বাড়ীতে হতো বিশেষ পূজা অর্চনা।আটকড়োই,পাচন,খৈই,লাড্ডু,ছানা সন্দেশ কত কত আয়োজন ছিল ঘরে ঘরে প্রথমে হিন্দু সমাজে প্রাধান্য পেলেও পরবর্তীতে মুসলিম পরিবারগুলোতেও এই ধারার বিকাশ ঘটেছিলো।

কালের বিবর্তণে বিগত কয়েক বছর এই উৎসবটি যেনো কর্পোরেট কালচারে পরিনত হয়েছে।উচ্ছকিত বাদ্যের ঝনঝনানিতে শুরু হয় উৎসবে দেশীয় সংগীত, নৃত্য থাকলেও মৌলিক আবেদন কিংবা সুরের মূর্ছনা খুব একটাছিলনা। রাজনৈতিক নেতাদের সরব উপস্থিতি,
বক্তৃতায় স্টাণ্ডবাজি, ভূত,প্রেত ‘র মুখোশ সম্বলিত মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশের হিরিক।জানিনা এই উচ্ছকিত বাদ্যযন্ত্র,
মুখোশ সম্বলিত ভূত,প্রেত বেষ্টিত র‍্যালী (মঙ্গল শোভাযাত্রা) পান্তা ইলিশ বাঙালী সংস্কৃতির অন্তভূক্ত কোনকালেই ছিল কিনা! কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের প্রচার-প্রসরণে যে স্পন্সর দিচ্ছে বৈশাখী মেলা কিংবা উৎসবে তাতে সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা নয় বরং বাজার দখলই ছিল তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য।নতুন প্রজন্ম কি আদৌ শেঁকড় সন্ধানী নাকি কর্পোরেট হাউসের ইচ্ছাদাসী তা নিরিক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে বৈকি।আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমরা যদি ভুল চর্চা করি অন্যদেশের ( পশ্চিম বঙ্গ) বাঙ্গালী জাতিগোষ্ঠী এর মূলের দাবীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করবে।

কর্পোরেট সংস্কৃতির জোয়ারে কোথাও যেন একটা শূণ্যতা থেকে যায়! মাটিরটান, শেঁকড় না থেকে সবকিছু যদি যান্ত্রিক হয়ে যায় সেই আধুনিকতার যায়গাটাতে সকলে প্রাণ খুঁজে পায়না,কেউকেউ হয়তো পেয়ে থাকে!মাদুর বিছিয়ে কিংবা পিঁড়ি পেতে ভাত খাওয়া, পুকুরে গা ভিজিয়ে স্নান করা,গঞ্জের হাটে আড্ডা খুব বেশী উপভোগ্য।ডিজিটাল যুগের উপযোগিতা আছে তা অস্বীকার করছি না কিন্তু সত্যিই বলছি, প্রাণ নেই! যান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ভাবাবেগ হৃদয়ের স্পন্দন জাগাতে পারেনা!যেমনটি ফেইসবুক কিংবা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে যে প্রেম নিবেদন তা কখনো হাতের লেখা প্রেমপত্রের মতো মনের গভীরে শিহরণ জাগায় না। কৃত্রিম শেঁকড় সন্ধানী মনোবৃত্তি বর্তমানে খুব প্রসার লাভ করেছে যেমনটি পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়া! যদিও তা কখনো বাঙালী সংস্কৃতির অন্তভূক্ত ছিলনা। সকালে বেড টি কিংবা ব্রেকফাস্ট যদি অভ্যাসে পরিনত হয় পান্তা ভাতের প্রকৃত স্বাদ উপলব্দি করা কি আদৌ সম্ভব?

এই বৎসর বৈশ্বিক সংকটে আমাদের ঐতিহ্যের অনেক কিছু কাটছাঁট করতে হবে সত্য কিন্তু মৌলিকত্ব খুঁজে নেয়ার বা অনুসন্ধান করার সুযোগটুকু অন্তত গ্রহণ করতে পারি।