মুক্তধারা

ত্রাণ চোর ও খলিফা জীবনাচরণ

আতাউল হাকিম আরিফঃ ভাবলাম অনেক রাত হলো এবার ঘুমিয়ে পড়ি, লাইটের সুইচ অফ করে যথারীতি শুয়ে পড়লাম-ঘুম যেনো দু-চোখ থেকে কোথাও পালিয়ে গেলো,অনেকক্ষণ ধরে এদিক ঔদিক ছটপট করতে করতে শিয়রে থাকা মোবাইলের ঘড়ি দেখে নিলাম রাত ২.৩০মিঃ।কদিন আগেও এই সময়টায় গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতাম! ঘুম হবেই বা কি করে!বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের সাঁড়াশি আগ্রাসনে চারদিকে মৃত্যুর মিছিল,আতঙ্ক আর অস্থিরতা বাসা বেঁধে আছে,এমনিতেই আজ সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন প্রিয় মানুষের মৃত্যু সংবাদে মনটা বেশ বিষন্ন হয়ে আছে! না আজ আর কোনোভাবেই ঘুম আসছেনা।মনে হচ্ছিলো বেশ ঘামাচ্ছিলাম-তাই উঠেই একগ্লাস পানি খেয়ে নিলাম,পুনরায় না শুয়ে বারান্দায় বসলাম,চাঁদটাও আজ অন্যরকম বিষন্ন।

লেখকঃ আতাউল হাকিম আরিফ

নৈশব্দকে এতটা বোধহীন আগে কখনোই উপলব্ধি করিনি। এভাবেই রাতটা পার হয়ে গেছে,ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম!ঘুম থেকে উঠে আবারও দুঃসংবাদ- এক নিকট আত্মীয় ষ্ট্রোক করে মারা গেলেন! অথচ দেশশুদ্ধ রটে গেলো করোনায় মৃত্যু হয়েছে, পাড়া প্রতিবেশীরাও কেউ দেখতে আসলোনা, প্রশাসন নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে রেজাল্ট না আসা পর্যন্ত আশেপাশে কিছু বাড়ীঘর সহ লকডাউন। পাবলিক পরিবহনও বন্ধ…কষ্টটা বাড়তেই থাকলো! হাতে থাকা টাকাপয়সাও পুরিয়ে গেছে প্রায়,তিনদফা সাধারণ ছুটি ঘোষণা-বলা চলে অলিখিত লকডাউন,হতাশা বেড়েই চলেছে!বাসায় বসে বসে বোর হচ্ছি, আলো বাতাসহীন জীবন!এতদিন আড্ডাবাজির যে জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম, সেই সুযোগটাও নেই। টিভি অন করলাম, ভয়াবহ কিছু সংবাদ একযোগে প্রচারিতঃ বিশ্বব্যাপী করোনায় মৃতের সংখ্য লক্ষাধিক ছাড়িয়েছে/ মাটি খুঁড়ে নেতার বাসা থেকে ত্রাণের চাউল উদ্ধার/ জামালপুরে একঝাঁক ভুখা জনগোষ্ঠী ট্রাক থেকে ত্রাণ কেঁড়ে নেয় /বিশ্বব্যাংকের আগাম হুশিয়ারি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে ৩ শতাংশ…. মনটা ভীষণভাবে খিঁচিয়ে গেলো এবং ঘেন্না ধরে গেলো জীবনের প্রতি, টিভিটা অফ করে কিছুক্ষণ পাঁয়চারি করলাম এদিক ওদিক! মনে হচ্ছিলো মানসিক ট্রমার মধ্যেই দিয়েই যাচ্ছি। কিছুতেই মনকে আর শান্তনা দিতে পাচ্ছিলাম না! কতদিন, আর কতদিন এইভাবেই চলতে থাকবে! তবে কি নিকট বর্তমানে দেশ দুর্ভিক্ষের সম্মুখিন হতে যাচ্ছি? মনটা ভীষণ খারাপ হলে চিন্তাকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে মাঝেমধ্যে বইয়ের শরন্নাপন্ন হই।হাতে পেলাম ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের জীবনাচরণ, পড়ার এক পর্যায়ে নিন্মক্ত অংশটিতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো। আহা!আমাদের সব নেতারাও যদি এমনটি ভাবতে পারতো! “তিনি হযরত ওমর (রা.) সুখে ও দুঃখে রাত্রির অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন প্রজাদের অবস্থা নিজ চোখে দেখার জন্য। একবার রাত্রিকালে নিজের গোলাম আসলামকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মদীনার উপকণ্ঠে একটি তাঁবুর কাছে কয়েকটি শিশুর ক্রন্দন শুনতে পেয়ে তাঁবুর কাছে গেলেন এবং তাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে জনৈক স্ত্রীলোক তাদের অভাবের কথা জানিয়ে খলিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো।তখন ওমর (রা.) বললেন, খলিফাকে তোমাদের অভাবের কথা কিভাবে জানবে? স্ত্রীলোকটি তখন বললো, ‘এ কেমন কথা! তিনি আমাদের খলিফা অথচ আমাদের খবর জানবেন না।’ তা শুনে শিশুদের কান্নার কারণ এবং পাশেই আগুনের ওপর রাখা হাঁড়িতে কি রান্না হচ্ছে জিজ্ঞাসা করাতে স্ত্রীলোকটি জবাব দিল, ‘বাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদছে এবং তাদের সান্ত্বনার জন্য হাঁড়িতে পানি গরম করা হচ্ছে।’ একথা শোনামাত্রই খলিফা দ্রুতগতিতে মদীনায় ফিরে বায়তুল মাল থেকে কিছু আটা, চর্বি ও অন্যান্য সামগ্রী একটি বস্তায় পুরে নিজের কাঁধে বহন করে দ্রুত গতিতে তাঁবুর কাছে ছুটে এলেন। গোলাম আসলাম বস্তাটি নিজ কাঁধে নিতে চাইলে ওমর (রা.) বললেন, ‘আখেরাতে আমার হিসাব আমাকেই দিতে হবে। তাই বস্তাটা আমিই বহন করি।’ তাঁবুর কাছে গিয়ে স্বহস্তে আগুন জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করে শিশুদের খাওয়ালেন। অবশিষ্ট খাদ্য স্ত্রীলোকটির হাতে তুলে দিলেন। শিশুরা খাওয়া সেরে খুশিতে খেলতে লাগলো। স্ত্রীলোকটি এই ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে বললো, ‘হযরত ওমরের পরিবর্তে তুমিই খলিফা হওয়ার অধিক উপযুক্ত,আল্লাহর দরবারে আমাদের ও খলিফার বিচার হবে।’ হযরত ওমর (রা.) সান্ত্বনা দিয়ে স্ত্রীলোকটিকে বললেন, ‘তুমি যখন খলিফার দরবারে যাবে তখন আমাকেও সেখানে পাবে।’ এই বলে খানিক দূরে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান করে গোলাম আসলামকে বললেন, ‘‘আমি শিশুগুলোকে ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদতে দেখেছি, এখন হাঁসতে দেখার জন্য কিছুক্ষণ বসলাম।”