অনুরণন

বন্ধন | ডিভোর্সি মেয়ে

আফরিন পারভেজঃ আরো কয়েকটা কালো ক্লিপ দরকার!!! উপরের ড্রয়ারে থাকতে পারে!! দেখিতো!! ঘাটতে ঘাটতে বাদামী রঙের হ্যান্ড ব্যান্ডটা বের হয়ে গেল।এক ঝটকা দিয়ে অনেকগুলো কথা মনে পড়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠলো খন্ড খন্ড কিছু দৃশ্য – ধানমন্ডি দশের এ, কালো একটা বাইক, ফুচকার দোকান, একজোড়া হাস্যজ্জ্বল জুটি, একটা যেন কণ্ঠস্বরও শুনতে পেলাম, নিজের খিলখিল হাসি, কারো মায়াধরা কন্ঠে একটা ডাক, “বাবুটা!”

লেখকঃ আফরিন পারভেজ

অনেক সাহসী ছিল সে, যেন লাগামছাড়া ঘোড়া। কারোই পরোয়া করতো না, প্রচন্ড একগুয়ে আর জেদি স্বভাবের। তার সাহস আর জেদের কারনেই ভালবাসতে বাধ্য হয়েছিলাম। সব সময় বলত, “তোমার মত কয়টা মেয়ে হয়!! এত সাহসী!! এত রেস্পন্সাইবেল!! আবার একটা মায়াবতীও। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম সেদিন থেকে ভাবতাম যে এই মেয়েকেই বিয়ে করবো।” খুব ভালো লাগতো নিজের প্রশংসা শুনতে, একটা অভ্যাস এর মত হয়ে গিয়েছিল তার প্রশংসা শোনা। যেই আমি আমার সময়ের ভাগ পরিবারের বাইরে কাউকে দেয়ার আগে ১০০ বার চিন্তা করতাম সেই আমি আমার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান তার কথা ভেবেই কাটাতাম।
নেশা!!! নেশা!! প্রশংসা গুলো যেন ড্রাগস এর মতো!!!
এতই সাহসী মানুষ ছিল সে, কিন্তু কেন জানি শেষ পর্যন্ত তার সাহস টুকু আমার মত মেয়ের সাহসের পাল্লায় কম হয়ে গেল। যে বাইক রেসে বেপরোয়া চালিয়ে রেস জিতে যেত, সে ই কেন জানি জীবনের রেসে আমার পাশে, আমার সাথে দাঁড়াতে পারল না।
কারণ?!
কারণ আমার সাহসী তকমাটা তখন থেকে যখন স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাকে ডিভোর্স দিয়েছিলাম, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আবার। নিজেকে নতুন করে তৈরি করেছিলাম। ডিভোর্সি মেয়ে আসলেই তো সাহসী!! কিন্তু সেই সাহসী মেয়ের পাশে জীবনসঙ্গী হিসাবে দাঁড়াবার সাহস হয়তো অনেকেরই মানুষের হয় না। হুহ!! হয়তো তারও হয়নি!! পরিবার সমাজের সামনে হয়ত তাী জোর একটু কমই হয়ে গিয়েছিল!!
তার হাতেরই ব্যান্ডটা, একদিন দুষ্টুমি করে আমার হাতে পরিয়ে দিয়েছিল। তারপর হয়তো ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম খুলে, ফেরত দেয়া হয়নি। ফেলে দিবো নাকি?? না থাক!! মাঝে মাঝে হুট করে চোখের সামনে আসলে কিছু কথা মনে পড়বে আর নিজেকে আরও দৃঢ় করতে পারব।
ক্ষণস্থায়ী মানুষেরাই তো জীবনের স্থায়ী অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়।
“মা, আমার স্কুলের দেরী হয়ে যাচ্ছে তো!!!”
অহির কন্ঠস্বরে চমক ভাঙলো। অহি!! আমার মেয়ে!!
ক্লিপগুলো হাতে নিয়ে ড্রয়ারটা ধাক্কা দিয়ে চলে আসলাম। অহিকে স্কুলে দিয়ে বাস ধরতে হবে। বিকালে অহির গানের স্কুল, মেয়েটা এত গান পাগলা!!!
আবার নিত্য দিনের কাজে ডুবে গেলাম।
সব ভালোবাসা হেরে গেলেও মায়ের ভালোবাসা হারতে পারে না, একটা অবশ্যই জীবন যুদ্ধে জিতিয়ে দেয়।