অনুরণন

নিষিদ্ধপল্লীতে সরস্বতী বন্দিতা

দেবী সরস্বতীকে বিদ্যার দেবী হিসাবে আমরা পুজা করি । কিন্তু নিষিদ্ধ পল্লীতেও দেবী সরস্বতীর বন্দনা করা হয় । কিন্তু সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র বিদ্যালাভের উদ্দেশ্যে সেই পুজা করা হয় তা কিন্তু নয় । এর পিছনেও প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের ইতিহাস বর্ণিত আছে । তবে সেই ইতিহাস জানার আগে দেখতে হবে । সরস্বতী শব্দের অর্থ কি ?

ঋক্‌মন্ত্র উচ্চারণ করে ঋষি গৃৎসমদ বলেছেন, ‘‌অম্বিতমে নদীতমে দেবিতমে সরস্বতি।’‌ একযোগে সরস্বতীকে মাতৃশ্রেষ্ঠা, শ্রেষ্ঠ নদী এবং শ্রেষ্ঠ দেবীরূপে উপস্থাপন।  প্রশ্ন জাগে, সরস্বতী কে?‌ বা সরস্বতী আসলে কী?‌ নদী!‌ হ্যাঁ, নদী তো বটেই। ব্যুৎপত্তিগত অর্থেই সরস্বতী নদী। সরস্‌ (‌জল)‌ +‌ মতুপ্‌ +‌ ঙীপ্‌ (‌অর্থাৎ স্ত্রীলিঙ্গবাচক ‘‌ঈ’‌ =‌ সরস্বতী। নদীদের মধ্যে তিনি শুদ্ধা, ‘‌নদীনাং শুচির্যতী’‌, আসমুদ্র তার ধারপথ, ‘‌গিরিভ্য আসমুদ্রাৎ’‌। বেদের যুগের লোকেরা তার উভয় তীরে বাস করেন, ‘‌অধিক্ষিয়ন্তি পূরবঃ’‌। তাঁরা জানেন সরস্বতীর গর্ভে আছে যাবতীয় রত্নসম্ভার, বরেণ্য সম্পদ। তাই তারা সরস্বতীর জলকে মাতৃস্তন্যের মতো পান করতে চেয়েছে। ‘‌যস্তে স্তনঃ.‌.‌.‌ সরস্বতী তমিহ ধাতবে কঃ॥‌’‌ আবার সেই সরস্বতীর বন্যার সময় দুকূল প্লাবিত করে তাদের যাতে উৎখাত না–‌করে, সে প্রার্থনা করতেও সেই মানুষগুলো ইতস্তত করেনি— ‘‌মা অপস্ফরীঃ পয়সামান আধক্‌’‌।

শব্দের বিশ্লেষণ করলে সরস্বতীর অর্থ এক আবার শাস্ত্রমতে আর এক । সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ – একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ + বতী = সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী। আবার সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। ঋগ্বেদে আছে ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী‘, সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। শুধু বৈদিক যুগেই নয়, পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, সেখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল। যে প্রসবণ থেকে এই নদীর উৎপত্তি তা ছিল প্লক্ষ্ণাবৃক্ষের নিকটে, তাই একে বলা হতো প্লক্ষ্ণাবতরণ। ঋগ্বেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, সরস্বতী নদীই ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়।

তবে প্রশ্ন হল কেন দেবী সরস্বতীকে নিষিদ্ধ পল্লীতে পুজা করা হয় ? “বঙ্গ দর্শন” পত্রিকায় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্রের “বাবু”  ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি–মার্চ মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত হয় । সেখানে  বাংলার নব্যবাবুদের নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গাত্মক দুটি লাইন ছিল –

‘‌যিনি রূপে কার্তিকেয়ের কনিষ্ঠ, গুণে নির্গুণ পদার্থ, কর্মে জড়ভরত এবং বাক্যে সরস্বতী তিনিই বাবু। যিনি উৎসবার্থ দুর্গাপূজা করিবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষ্মীপূজা করিবেন, উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতী পূজা করিবেন এবং পাঁঠার লোভে গঙ্গাপূজা করিবেন, তিনিই বাবু।’‌ লাইন দুটির আলঙ্কারিক অর্থ, সামাজিক ব্যঞ্জনা অনেক। সে সব সরিয়ে রেখে সাদা চোখে দেখলেও কিন্তু দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। এক, সরস্বতী বাগ্‌দেবী। দুই, তিনি মূলত পূজিতা হতেন পতিতাপল্লীতে। নিষিদ্ধপল্লীতে দেবী সরস্বতী!‌ অবাক করা মনে হলেও এটা সত্যি।

এবার আসা যাক হিন্দু শাস্ত্রে কি বলছে !  বাৎসায়ন লিখছেন, “কামদেবের পুজো করতে হলে চৌষট্টি কলা শিখতে হবে। আর সেই শিক্ষার শুরু সরস্বতী পুজোর দিন। চৌষট্টি কলার মধ্যে গীত, বাদ্য, নৃত্য, ছন্দোজ্ঞান যেমন আছে, তেমনই রয়েছে ছলিতকযোগ, দ্যূতক্রীড়া, আকর্ষক্রিয়া প্রভৃতিও। এক কথায় নাচ–গান–বাজনা থেকে ছলকলা, জুয়ো খেলা, কবিতা লেখা ও বোঝা, সব কিছুই চৌষট্টি কলার মধ্যে পড়ে। আর এসব কিছুরই অবিসংবাদী দেবী সরস্বতী। দেবীর শাস্ত্রসম্মত গায়ত্রী মন্ত্রেও তাই কামদেবের অনিবার্য উল্লেখ। বাগ্‌দেব্যৈ বিদ্মহে কামরাজায় ধীমহি, তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ॥‌

সুতরাং দেখা যাচ্ছে,  সরস্বতী পুজোর সঙ্গে চৌষট্টি কলা আয়ত্তের একটা সম্বন্ধ আছে। সেই সূত্রেই নিষিদ্ধপল্লীতে সরস্বতী বন্দিতা।