অনুরণন

কি তোমার পরিচয়

শাহ্ সাজ্জাদঃ রমজান মাসে বেলা দুইটা থেকে ইফতারীর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত লম্বা সময়। অফিস থেকে বাসায় ফিরে, আঁধ ঘন্টার মধ্যে আমার এক কলিগ – সেলিমের বাসার উদ্দেশ্যে উত্তরায় রওনা হই। নিলিমাা আমার স্ত্রী ইফতারীর আয়োজনে ব্যস্ত, আর আমার ৬ বৎসরের কন্যা সুষমা কোন এক প্রতিবেশীর বাসায় – হয়ত ? বউ বলতে পারে। যদিও আশে পাশে আমার মেয়ের বয়সি তার কোন বন্ধু বান্ধবী নাই, তবুও প্রতিবেশীরা তাকে ডেকে নিয়ে যায়। আমার মেয়ে অনেক কথা বলে। হয়ত এইটাই একটা কারন, যার কারনে প্রতিবেশীরা তাকে খুব পছন্দ করে। আমার মেয়ের খোশগল্পে অনেক কিছু ভুলে থাকা যায়। আমি আর আমার স্ত্রী বাসায় খুব কম কথা বলি। হয়ত এই শূন্যস্থাণ পূরন করার দ্বায়িত্ব নিয়েছে সুষমা। আর এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাসা থেকে বের হবার পথে বউ পাঁকা পেঁপে আনতে বলল।
পেপে না বাসায় ছিল ? প্রশ্নটা অবশ্য মনে মনে করেছিলাম, কারন জানি আমি যখন অবসর মূহুর্তে কোথাও বের হই তখন দিয়াশলাই থেকে শুরু করে ছোট খাট নিত্য প্রয়োজনীয় কোন না কোন সংসারের সদাই (বাজার) আমার স্ত্রী আগাম আনিয়ে রাখে। আমাদের গুছানো সংসার।

সেলিম বাসায় ছিল না অগত্যা ভাবির সাথে দুই একটা কথা বলে বের হয়ে আসি। মলিন মুখে বাসে করে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ করেই মেয়েটাকে চোখে পড়লো। চাকরিজীবিদের ট্রেড মার্ক যেমন হট পট, ডায়রী, ফাইল পত্র ইত্যাদি সাথে আরও দুই জন, যারা স্বভাবগতভাবে একটু দৃষ্টি আকর্ষনী আচরনে হৈ হল্লা করে এয়ারর্পোট বাস স্টপেজ থেকে উঠে বাস ড্রাইভারের আড়াআড়ি বসলো। মেয়েটির চেহারা আমার দৃষ্টি আকর্ষন করলো, কিন্ত দৃষ্টি বিনিময় হল না।
মেয়েটিকে দেখে “গোবরে পদ্ম ফুল” উক্তিটা মাথায় আসলো, কিন্তু ঠিক হলো না। কারন তার সাথের সঙ্গীরাও পদ্ম ফুল। আবার তাদের মধ্যে সে কোথাও একটু আলাদা। কেন জানি মনে হল এই সুশ্রী মেয়েটি হয়ত কঠিন কোন বাস্তব মোকাবেলা করছে। ভাল করে লক্ষ্য করতে শুরু করলাম। বাস ড্রাইভারের আড়াআড়ি বসে থাকায় আমি শুধু মেয়েটির মুখপার্শ্ব দেখতে পারছি। ভ্রু বেশ টানা টানা, সব মেয়েরা যদি এরকম ভ্রু নিয়ে জন্ম নিত তাহলে হয়ত ’ভ্রু-প্ল¬াক” শব্দটিই সৃষ্টি হত না। চোখের পাপড়ি ঘন ও প্রসার। সরু নাক ও কিঞ্চিত মোটা ঠোট মিলে তার মুখের এক অপূর্ব সমন্বয়। আচ্ছা, মহিলাটা যখন হাঁসে তখন কি তার চেহারার বিকৃতি ঘটে ? – এমনটাও হয়।

কে তুমি ? কি তোমার পরিচয় ? কল্পনা করতে শুরু করলাম, যে কল্পনা বিয়ের আগেও করতাম। আমার স্ত্রী বলে, কলেজ জীবনে আমার মলিন মুখ নাকি তাকে খুব বিচলিত করত। তার নাকি জানতে ইচ্ছা করত কি আমার পরিচয়? কেন আমি এত দুঃখী! আমাদের পরিচয় পর্বের পর নিলিমা যখন জানলো শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন ঝুটঝামেলা ছাড়া আমার জীবনে তেমন কোন কাল বৈশাখীর ঝড় উঠেনি, তখন সে নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করলো। নিলিমার জীবন আমার জীবনের প্রতিফলন মাত্র তবে এই সুবাদে আমাদের দেখা সাক্ষাত হতে থাকত। আবার এদিকে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে অলৌকিক আত্মিয়তা খুজে পাওয়া গেল যা সচরাচর মফস্বল শহরে বিদ্যমান। আমাদের দুই পরিবারের মা, বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবী নিলিমার সাথে আমার সম্পর্কে খুব সন্তুষ্ট। বন্ধুরা বলতে লাগল, ভাল একটা মেয়েকে আমি ভালবেসেছি। আমার অস্বীকৃতি, হাঁসি ঠাট্টার তলে চাপা পড়লো। আমি নাকি ছোটবেলা থেকে লাজুক প্রকৃতির। ভালবাসার শেষ অধ্যায় বৈবাহিক জীবনে এসে “ভালবাসা” কি তার (অভিসন্দর্ভ) বা অর্থ খুজে বের করার কোন প্রয়োজন বোধ করলাম না। মলিন মুখে সংসার করতে থাকলাম। নিলিমার মুখও এখন মলিন। আমরা সুখেই আছি।

জ্যাম হওয়াতে আশে পাশের যাত্রীর বিরক্তের ঝড় উঠল। মেয়েটির জগতে আমার উপস্থিতের কিছু একটা সংকেত থাকতে হয়। একবার ভাবলাম ট্রাফিক জ্যাম এর উপকারিতা (উৎকর্য) তুলে ধরি। ধরাকে সরা জ্ঞান করা যাকে বলে, কারন যেখানে এদেশের প্রেক্ষাপটে যদি চাকুরী নিশ্চিত করার জন্য নকল আর ঘুষ প্রায় বৈধ করন হতে যাচ্ছিল, আমিতো শুধু কাউকো কাছে পাওয়ার জন্য জ্যামকে স্বাগত জানাতে চাচ্ছি।
এদিকে নিজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য প্যান্টের পকেটে এ হাত দিয়ে সেলফোনটি বের করে সেলফোনের নাড়াচাড়া করতে থাকলাম। আর মন্ত্র পড়ে প্রহর গুনতে থাকলাম। এই মুহুর্তে যদি কেউ কল করত। সেলিমের কল আসার সম্ভাবনা শূন্য। অসীম ধৈর্য্যশীল সেলিম । আগামিকাল অফিসে দেখা হওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তার মনে কোন লেশ মাত্র চিন্তা ভাবনা আসবে না, মিসাল ঘুরে গেল – কোন ব্যাপার ? আমাদের যাওয়া আসা এখন সুবিদিত পর্যায়, হয়ত এটা একটা কারন । আচ্ছা টেলিপ্যাথী যদি বাস্তব হতো, তাহলে আমার সবচেয়ের অপছন্দের মানুষ যেমন আমার মামা শ্বশুরকে দিয়ে হলেও কল করানো যেত ।
আমার মামা শ্বশুর সমাজের যোগ্য উত্তরসূরী – ধনে মানে গুনে, কিন্ত সমস্যা হচ্ছে, আমাদের সংসারে তিনি রস খুজে পান না। প্রায়ই তিনি পরিজন সমাবেশ করেন, এবং আমার সাথে শালা দুলাভাইয়ের সর্ম্পকের ন্যায় হাঁসি ঠাট্টা করেন। মামা শ্বশুর দাওয়াত দিলে আমাদের বাসায় কিছুটা ঈদের আমেজ আসে। নিলিমা আতী¡য় স্বজনের সাথে দেখা সাক্ষাতের এই সুযোগ সহজে হাত ছাড়া করতে চায়না। এদিকে আবার আমাকে ছাড়া সে কোথাও যাবেও না। হয়ত এটাই একটা কারন আমিও কোন দিন নিলিমাকে এই ব্যাপারে কোন কটুক্তি করি নি।

আচ্ছা – প্রায় সময়ইতো বাস কন্ডাক্টার দুই তিনবার করে ভাড়া চেয়ে থাকে। এটা ওদের এক ধরনের সিস্টেম বা অভ্যাস, যাতে যে সব যাত্রী বাজেট রক্ষার্থে ভাড়া না দেওয়ার মতলব আটে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু জন দ্বিতীয়বার ভাড়া চাইলে, লজ্জায় বা বিবেকের তাড়নায় নানান অজুহাতে ভাড়া দিয়ে দেয়। এতে কন্ডাক্টারদের লস মিনিমাইজ হয় বা করতে পারে। আমরা যারা সচরাচর ভাড়া দিয়ে থাকি, মোটা মুটি ভাবে সয়ে নিয়েছি তবে কিছু চয়েসফুল বকাঝকা ষ্টক এ থাকে যেটা আবার তাদেরও সয়ে গেছে। এটা একটা দুষ্টচক্র’ যার সমাধান হয়ত টিকিট সিস্টেম এ ছিল। কেন এদের টিকিট সিসটেম নাই তা বলতে পারব না। আজকে যাত্রী সিমীত থাকাতে বাস কন্ডাক্টারকে সিস্টেম চালু করতে হয় নি । বকাঝকা করে মহিলাটির দৃষ্টি আমার দিকে ভেরানো যেত। সামনের অনেক সিট ফাঁকা পরে ছিল। উঠে গিয়ে সামনে বসবো ভাবতে ভাবতে মেয়েটি হঠাৎ পাশে ফিরে মিষ্টি হাসি দিয়ে তার কলিগদের উদ্দেশ্য কি যেন বলল। অপূর্ব !!! ক্ষনিকের জন্য চোখাচোখি হল – এই যোগসুত্র অবশ্যই উপরের কোন ইশারা।

মন প্রফুল¬ হয়ে উঠল। আমার মন বাসের জানালা দিয়ে গাড়ী-ঘোড়া দালান কোঠা ছাড়িয়ে কোন এক নদীতে গিয়ে থমকে দাড়ালো। আশ্চার্য্য ব্যপার আমার ভগ্নমনস্কতার জগতে আমি যে রকম নানান নদীর তীরে বসে নদী উপভোগ করতাম আজকে কেন জানি আমার এই জগৎ, আমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেল। আমি দেখলাম আমি নদীর উপরে পাখির ন্যায় ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর নদীর তীরে নিলিমা ও সুষমা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
ট্রাফিক জ্যাম ছাড়লো – বাস ও গাড়ীর পাল¬াপালি¬তে নদী থেকে আমি ফিরে আসি। মহাখালীতে বাস দাড়াতে মেয়েটি আর তার সংগীরা উঠে দাড়ালো। আমার গন্তব্যও মহাখালী, খুশি হয়ে নামলাম। আর খুশি হয়ে গেলাম যখন দেখলাম মেয়েটির সাথের কলিগ দুইজন আলাদা রাস্তা ধরল। আমিও পিছন পিছন হাটা শুরু করলাম। হঠাৎ হাতঘড়িতে সময় দেখে নিস্তেজ হয়ে গেলাম।
ঘুরে বাজারের দিকে রওয়ানা হই। পরিচিত দোকানদারকে একটা ভাল মিষ্টি পেঁপে দিতে বললাম । আর বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম পেপে মিষ্টি না হলে কিন্তু তোর ভাবী সব তরকারি পেঁপে দিয়ে পাকাবে । দোকানদার গদগদ হয়ে গেল আর বলল – স্যার আপনে ভাবিকে খুব ভালবাসেন, তাই না ? আমি নির্বিকার মত তার দিকে কিছুক্ষন চেয়ে রইলাম। অবশেষে আস্তে করে বললাম -গাধা, তোর ভাবি যদি আমাকে সেটা মনে না করায়ে দিত, তাহলে আজকে তোর এই পেপে বেচা হতো না …