অনুরণন

শখ | স্বপ্নের শহর

আজকেও ৭টা বেজে গেল বাস থেকে নামতে নামতে, নামার পর আরো ১০মিনিট হাঁটাপথ। আজকে না জানি কি কি কড়া কথা শুনান শাকিলের মা!!
কলিং বেল বাজানোর পর শাকিলদের কাজের মেয়ে দরজা খুললো
– শাকিল কই?
-বহেন স্যার। ছোট ভাই নাস্তা খায়, মাত্র আইলো, ডাইক্কা দিতাসি।
যাক বাবা!! শাকিল নাস্তা খাচ্ছে, তারমানে শাকিল নিজেও রাস্তায় জ্যামে পরেছিলো। এখন আর শাকিলের মা ক্যাট ক্যাট করবে না, নিজেদের বেলায় ষোলো আনা।
ড্রয়িংরুমে জিড়াতে জিড়াতে হঠাৎ ঘরের ডান কোনে চোখ পরলো, আজকে ওখানে একটা হারমোনিয়াম। আগে তো কখনো চোখে পরেনি!! নতুন মনে হচ্ছে!! কালো বোতামগুলো চকচক করছে!!!!….
পড়ানো শেষ করতে করতে আজ ৯টা বেজে যাবে, এই শাকিলটা এত্তো ঢিলা!!! ১০টা অংক শেষ করতে সাড়ে ৮টা বাজিয়ে দিল, এরপর খাতা দেখো!! ভুলগুলো আবার বুঝাও!!!…
-স্যার, আপনি কাল আসবেন?
-না, কালতো বৃহস্পতিবার। কাল আসবো না, একেবারে শুক্রবার সকালে আসবো।
-জি আচ্ছা স্যার।

…রাতের খাবার খাওয়ার পর আর চোখ দুটা খুলে রাখা যায় না কিছুতেই। নাহ ঘুমানো যাবে না, যাই এককাপ চা খেয়ে আসি, তারপর পড়তে বসবো। এইবারে ব্যাংকের পরীক্ষায় টিকতে হবে!!!

শুক্রবার সকালে পড়াতে যাওয়াটা অনেক আরামের। রাস্তায় হুড়োহুড়ি নাই, এক চান্সে বাস পাওয়া যায়, তাই পৌঁছে মাথা ঠান্ডা করে পড়ানো যায়।
আজকেও ড্রয়িংরুমের ডানকোনে হারমোনিয়ামটা পরে আছে। আজ কালো বোতামগুলোর ওপর আবছা ধূলো। আহা কেউ একটু মুছে রাখে না কেন!!!
শাকিলকে পড়াতে পড়াতে বার বার হারমোনিয়ামের ধূলোতে চোখ চলে যাচ্ছে। আহা!! একটু মুছে রাখে না কেন এরা!!! বুলুর যদি একটা হারমোনিয়াম থাকতো তাহলে কত যত্ন করে রাখতো। বুলু পাগলিটা একটা ঢাকনিও বানিয়েছিল, বলতো, ভাইজান তুমি যখন ঢাকায় চাকরী পাইবা, আমারে একটা,হারমোনিয়াম কিন্না দিবা কিন্তু!!! বেচারি!! আর হারমোনিয়াম!! এখনতো বরের ভয়ে একবার বাপের বাড়িও আসতে পারে না!!

– স্যার!!! স্যার!!!
শাকিলের ডাকে চমক ভাঙলো হুট করে।
-স্যার, কিছু হয়েছে?
-না, নাতো!! কেন বলো তো??
– আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে ডাকছি আর আপনি পাশে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন??
-আরেহ!! তেমন কিছু না!! অংকগুলো শেষ??…..

-কাল ভালোমতো পরীক্ষা দিয়ো, আর খাতা রিভিশন দিয়ে জমা দিয়ো।
-জি আচ্ছা স্যাী। আপনি আবার রবিবার আসবেন?
-হুম। আচ্ছা তোমাদের বাসায় হারমোনিয়াম কে বাজায়!!
-ওহ, ওইটা সুমাইয়ার জন্য কেনা হইসে।
-বাহ, সুমাইয়া তো অনেক ছোট, এখনই হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে!!! মাশাল্লাহ!!
-আরেহ না, স্যার। মাত্র তো ভ্যা ভ্যা করে সারগাম করে, পাপা তাতেই খুশি হয়ে হারমোনিয়াম কিনে এনেছে!!
-অও!! তা একটু মুছে রাখতে বলো কাউকে। আর আন্টিকে বলো একটা ঢাকনি বানিয়ে দিতে।
-ঢাকনি!!! হারমোনিয়ামের জন্য!!! ওটাও কেউ বানায়!! প্লাস্টিকের কাভারইতো কিনতে পাওয়া যায়!!!
-ওহ!! তাই!! আচ্ছা আজকে তাহলে যাই।

…পুরোটা রাস্তায় শুধু বুলুর বানানো হারমোনিয়ামের ঢাকনিটার কথা মনে পরলো, পাগলিটা!! কষ্ট করে ঢাকনি আগেভাগে বানিয়ে ছিলো!! অথচ এখন তো প্লাস্টিকের কাভারই পাওয়া যায়!!
বাস থেকে নেমে দেখি আম্মার দুইটা মিসকল।
-হ্যালো!! আম্মা!!
-কি রে বাজায়!! পড়াইয়া ফিরসোস!!!
-হো আম্মা!! আপনের শরীল ভালা…..

লাইটা কাটার পরপর মনে হলো ইসস, আম্মাকে বুলির হারমোনিয়ামের ঢাকনিটার কথা একটু যদি জিজ্ঞেস করতাম!!! হুহ!! থাক!! হয়তো রান্নাঘরের কোনো কোনায় পুরোনো ন্যাকড়ার সাথে পরে আছে!!!

এভাবেই বেঁচে থাকার দৌড়ঝাপে ছোট ছোট শখগুলো পুরোনো ন্যাকড়ার মতো গুরুত্বহীন হয়ে পরে….