অনুরণন

মাতৃত্ব

কাকলী তালুকদারঃ শান যখন আমার পেটে তখন পুরো প্রেগ্ন্যাসিতে আমি একা ছিলাম।অল এলোন।পার্মানেন্ট কোনো হ্যাল্পিং হ্যান্ড ছিলোনা।সকালে রাসেল অফিস গেলে একটা ছুটা বুয়া এসে ঘর মুছে,থালাবাটি ধুয়ে এবং কাপড় ধুয়ে চলে যেতো ১০ টার মধ্যে। এরপর পুরোদিন আমি একা।রাসেলের ফ্যামিলিতে রাসেল বড় ছেলে তাই অতি আদরে মানুষ।খুব আরামপ্রিয়। জীবনে কোনোদিন বাজারে যেতে হয়নি,সাংসারিক কাজকর্ম, দায়িত্ব নিতে হয়নি।সে এসবে অভ্যস্ত না।তাই স্বভাবতই বিয়ের পরও এসব দায়িত্ব তার নিতে হয়নি।আমার কাধে চলে এসেছে অটোমেটিকেলি। বাজার  করা,নিজেদের কাপড় চোপড় কেনা,আত্নীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ মেইনটেইন, গিফট কেনা,প্রয়োজনে সিকিউরিটি গার্ড থেকে ইলেক্ট্রেশিয়ান সবার সাথে কন্ট্রাক্ট করে বাসার টুকটাক সমস্যার সমাধান সব আমাকে হ্যান্ডেল করতে হতো।রাসেল প্রচন্ড কেয়ারিং একটা হাসবেন্ড। সাংসারিক দায়িত্ব ইগ্নোর করলেও আমার প্রতি দায়িত্বে তার কোনোদিন অবহেলা ছিলোনা; এখনো নাই আলহামদুলিল্লাহ।
আমার ডিউ ডেট ছিলো ২২ই ডিসেম্বর,২০১৭।
ভেবেছিলাম ১৫ তারিখে সামনের মাসের বাজার করে রেখে দিবো,মাছ,মাংশ ফ্রীজাপ করবো  ১.৫ মাসের জন্য। ঘরের শুকনা বাজার,ড্রাই ফুড,মসলা পাতি সব কিনে গুছিয়ে রাখবো।কারন বেবি আসলে আমি বের হতে পারবোনা অনেক দিন।বাজার করা তখন কষ্টকর হবে।তাই এডভান্স সব কিছু গুছিয়ে আমি হস্পিটালে যেতে চেয়েছিলাম।৯ই ডিসেম্বর বেবির সব কাথা কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে হস্পিটাল ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম।১০ই ডিসেম্বর সকাল থেকে শরীর টা খারাপ লাগছিলো। রাসেল অফিস থেকে ফোন দিয়ে জানালো বাসায় সন্ধ্যায় গেস্টস আসতেছেন। বাজারে গেলাম।
বাজার করতে যেতে হবে কিন্তু ইচ্ছে করছিলোনা নড়াচড়া করি।তাও গেলাম।ভাবলাম এসেছি যখন তখন সামনের মাসের বাজারটা করে ফেলি।সেদিন সারাটা দুপুর চলে গেলো আমার বাজারে।বাসায় এসে এগুলো কুটা-ধোয়া করে গুছিয়ে রাখা,সাথে গেস্টস এর জন্য রান্না এসব করতে করতে সন্ধ্যা।যখন গেস্টস আসলো টেবিলে খাবার দিয়ে আমি আর দাড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না।গিয়ে শুয়ে পরছিলাম।ঘুম ভাংগলো রাত ৩ টায়।প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে।প্রথম ভেবেছি বেশি পরিশ্রমের জন্য এমন হচ্ছে।কিন্তু যতো সময় যেতে লাগলো ততো ব্যাথা বাড়তে লাগলো।আমি উঠে হাটাহাটি করলাম,পানি খেলাম।কিন্তু খারাপ লাগা বাড়ছেই। বুঝতে পারছিলাম এটা আমার লেবার পেইন।রাসেল কে বলিনি।কারণ সে খুবই সেনসেটিভ  টাইপ মানুষ। বল্লে এতো রাতে অস্থির হয়ে যাবে।আবেগে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেও অবাক হবোনা।হস্পিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোকজন জড়ো করে ফেলতে পারে।তাই আমাকে জিজ্ঞেস করাতে বল্লাম এমনি খারাপ লাগছে।
সকালে গেস্টসদের নাস্তা দিলাম ব্যাথায় দাতে দাত চেপে।গেস্টস বিদায় হলে রাসেলকে খুব স্বাভাবিক ভাবে বল্লাম আজকে হস্পিটালে যাওয়া লাগতে পারে।রাসেল মনে করেছে চেক আপ এ যেতে হবে।তাই আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বল্লো তুমি হস্পিটালে চলে যেও আমি অফিস থেকে ওখানে আসবো।সে চলে গেলে বুয়া আসলো।এবং ভদ্রমহিলা দরজা খুলার পরই আমাকে দেখে প্রথম কথা বল্লো আপনার পেইন উঠেছে? ওই মূহুর্তে ওই একটা কথায় মনে হলো আমার আবেগের বাধ ভেংগে গেলো।আমি কেদে ফেল্লাম।উনি আমার ফেস দেখে বুঝে গিয়েছিলেন।
সবকিছু গুছিয়ে বাসা লক করে হস্পিটালে গেলাম ১২ টার দিকে।মনে আছে রিকশা থেকে নেমে আমি ব্যাথার জন্য পা বাড়াতে পারছিলাম না।ওখানে ল্যাম্পপোস্ট এর খাম্বা ধরে দারিয়েছিলাম কিছুক্ষন।যাইহোক ডক্টর এর সিরিয়াল পেলাম ৩ টায়।ডক্টর চেক আপ করে বকা দিলেন এই অবস্থায় কেনো সিরিয়ালের জন্য ওয়েট করলাম।এতো সাহস কেনো আমার।কেনো ইমার্জেন্সি বলিনি। তক্ষুনি আমাকে এডমিট হতে বল্লেন।মিরপুর থেকে রাসেলের বন্ধুর ওয়াইফ,দিশা ভাবী এসেছিলেন( ভাবীর কাছে আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবো) তিনি এডমিট ফর্ম পুরন করে সিগনেচার করলেন।কিন্তু ফর্ম জমা দিতে গিয়ে দেখলাম যে এমাউন্ট এডভান্স করতে হবে সেটা আমার কাছে নাই।রাসেলকে ফোন দিলাম।সে টাকা নিয়ে আসতেছে।টাকা জমা দেয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিলো আমি সেন্সলেস হয়ে যাবো।যাইহোক সব ফর্মালিটিজ শেষ হতে হতে ৫ টা বাজলো।কেবিনে যাওয়ার পরই ট্রিটমেন্ট শুরু হলো।ডক্টর আবার দেখে বল্লো রাতেই হয়ে যাবে নরমালি।নরসিংদী থেকে আমার মামাতো বোন সুমী রউনা দিলো( আমি ওর কাছে চিরঋনী) এবং সে আমার একমাত্র আত্নীয় যে আমার পাশে ছিলো ওই সময়।
যতো রাত বাড়তে থাকলো ততো অসহ্য হতে থাকলো ব্যাথা।ডক্টর প্রতি ঘন্টায় চেক আপ করে আর বলে বেবি বের হওয়ার চেষ্টা করছে।এভাবে সারা রাত পার হয়ে গেলো।ভোর ৫ টায় লেবার রুমে নিলো। ৮ টার মধ্যে সব কমপ্লিট হয়ে যাবে বলে কিন্ত চোখের সামনে রাতের অন্ধকার কেটে ভোর হতে দেখলাম ওইদিন জীবনে প্রথমবার।লেবার রুম এর এক পাশে গ্লাস দেয়া তাই বাইরে সব দেখা যায়।একসময় ব্যাথায় হ্যালুসিনেশন শুরু হলো আমার।ডিসেম্বরের শীতে আমি দেখছি বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।গ্লাস বেয়ে পানি পড়তেছে,সকাল বেলা রংধুনু উঠছে আকাশে এসব।১০ টার দিকে ডক্টর ইমার্জেন্সি রাসেল কে ডেকে বল্লো বেবি সারা রাত ফাইট করছে কিন্তু মাথা পেলভিক এ আটকে গিয়েছে। এখন গ্র‍্যাডুয়ালি হার্টবিট ফল করছে এক্ষুনি ওটিতে নিতে হবে।সিজার হবে।
আমি রাজি না সিজারে তাই রাসেল আমাকে যেনো বুঝায়।আমার মাথায় ঘুরছিলো সিজার হলে আমি বেবিকে নিয়ে একা কিভাবে কি করবো? সংসারে কতো কাজ থাকে,সাথে বাচ্চার দেখাশুনা।এসব কিভাবে হবে।কিন্তু রাসেল বুঝালো আগে বাচ্চার লাইফ।যাইহোক, ১০ মিনিটে ওটি রেডি করে ১০ টায় ওটিতে ঢুকানো হলো আমাকে।১০.১০ এ শানের জন্ম হলো।ডক্টর শানকে কুলে নিয়ে প্রথম বল্লেন এই যে আপনার ফাইটার বেবি।ওইদিন পুরা হস্পিটালের স্টাফদের মুখে একটা কথাই ছিলো আপনার বেবি টা ফাইটার। এটা ফাইটার বেবি।
আজ আমাদের এই ফাইটার বেবিটার জন্মদিন। দোয়া করবেন যেনো ভালো মানুষ হয়।মানুষের মতো মানুষ হয়।কারো উপকার করতে না পারুক,কারো ক্ষতির যেনো কারন না হয়।
শুভ জন্মদিন বাবাই।আল্লাহ তোমার নেক হায়াত দান করুন।আমিন।
[ লেখাটি Women and e-Commerce (WE) গ্রুপে গত ১০ ডিসেম্বর পোস্ট করেন কাকলী তালুকদার, যেহেতু লেখাটি নারীদের জন্য অনুপ্রেরনামূলক এবং হুতুমপেঁচা নারীদের আত্মবিকাশের সারথি তাই লেখিকার অনুমতি নিয়েই লেখাটি প্রকাশ করা হল]