মুক্তধারা

আমার ড্রেস, আমার শাড়ি আমার রুচি কে প্রচার করে- কাকলী | ই-কমার্স এবং বাংলাদেশ

কাকলী তালুকদার , নরসিংদীর রায়পুরা থানার এক বনেদী তালুকদার পরিবারে যার জন্ম।বর্তমানে মোহাম্মপদপুরে থাকা কাকলী নরসিংদীর নারায়ণপুর সরাফতউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি এবং লালমাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এইচ.এস.সি পাশ করে , ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (বি.বি.এ)তে ফাইন্যান্স এ গ্রাজুয়েশন কম্পলিট করেন ।
ছাত্রী জীবনে স্কুলের কৃতি ছাত্রী হিসেবে দুইবার থানা পর্যায়ে সম্মাননা পেয়েছেন এবং থানা পর্যায়ে রচনা প্রতিযোগিতা সেকেন্ড হয়েছিলেন। কলেজের অপরাজিতা গ্রীন ক্লাবের ডিবেটিং মেম্বার ছিলেন।ওখানেও অর্জনে আছে কিছু পুরস্কার।
কাকলীর বাবা মা ভাইদের স্বপ্ন  ছিল কাকলী বড় হয়ে ডক্টর হবে। কিন্তু কাকলীর ইচ্ছে ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হবে।নিজের জন্য  ডিজাইন করেন অনেক ড্রেস এবং শাড়ি যে গুলো প্রশংসা পেয়েছে সর্বত্র।কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন, কাকলী ক্যারিয়ার গড়লেন শিক্ষকতায়।
কাকলী জানানঃ ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমার ক্যারিয়ার লাইফ ছিল আমার জন্য সোনালী সময়।আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু ইংলিশ  সাবজেক্ট নিয়ে হলেও পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এবং ই-কমার্স এই দুইটি সাব্জেক্ট হয় আমর দীর্ঘ দিনের সংগী।
তিনি আরো বলেনঃ বর্তমানে আমি অনলাইন বিজনেস এর সাথে যুক্ত।কাজ করছি বাংলাদেশের ঐতিহ্য জামদানী শাড়ি এবং মণিপুরী শাড়ী নিয়ে। আমি শাড়ি পড়তে পছন্দ করি বরাবরই। আর জামদানীর প্রতি ভালবাসা ছোটবেলা থেকে।
বনেদি পরিবারের বড় বউ হিসেবে  কাকলী’র মা জামদানী শাড়ি উপহার হিসেবে যেমন পেতেন,তেমনি কিনতেন বিভিন্ন উপলক্ষে। তাই উনার জামদানী কালেকশন ছিল চোখে পড়ার মতো। এইজন্য ছেলেবেলা হতে শাড়ি বলতে কাকলী জামদানীই বুঝতেন।মা এর সাথে ২০১২ সাল থেকে জামদানী পল্লীতে কাকলীর বিচরন।প্রথম প্রথম শুধু শাড়ি কিনতে যেতেন।তারপর তাঁতীদের কালার ফুল সুতা নিয়ে কাজ এসবের আকর্ষণে  ছুটে যেতেন।কিন্তু কখনো ভাবেন নাই এই জামদানীকে বিজনেস হিসেবে নিবেন ।বিয়ের পর সংসার,বাচ্চা,এই সব ঝামেলায় যখন জব ছেড়ে দিলেন এবং  এম.বি.এ টাও মাঝপথে থামিয়ে দিলেন  তখন  পোস্ট পারটার্ম ডিপ্রেশন থেকে বের হয়ে আসার জন্য কাকলীর মা,ভাই,কাজিন রা প্রথমে আবার জব এ জয়েন করার জন্য উৎসাহ দিলেন । কিন্তু কাকলীর  ১.৫ বছরের বাচ্চাকে কার কাছে রেখে অফিস করবে এই সলিউশান দিতে পারেনি কেউ।
এরপর কাকলীর এই কাছের মানুষ গুলো  বিজনেস করার জন্য পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কি নিয়ে কাজ করবো তা ছিল কাকলীর জন্য  চ্যালেঞ্জিং। কেউ পরামর্শ দিল কসমেটিক্স আবার কেউ দিল ইন্ডিয়ান প্রডাক্ট। কিন্তু কাকলীর মন পড়ে ছিল শাড়িতে।
কাকলী বলেনঃ আমি শাড়ি কিনতে গেলে অনেকেই আমাকে দিয়ে শাড়ি আনাতো। ভাবলাম এটাকে তো বিজনেস হিসেবে নিতে পারি। তাই আল্লাহর নাম নিয়ে শাড়ি নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম।আসলে আমার পরিবার আমাকে বড় সাপোর্ট দিয়েছে।ফিন্যান্সিয়ালি, ম্যান্টালি এবং কাজিনরা তো আমার সাথে এতো দূরে শাড়ি কালেকশন এর সঙীও ছিল কয়েকবার।সবার আগ্রহে একটা গ্রুপ এবং একটা পেজ অপেন করলাম আমার একটা ফ্রেন্ড এর সাথে পরামর্শ করে। আমার ওই ফ্রেন্ড এর কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। প্রতিটি স্টেপ এ আমাকে পরামর্শ দিয়েছে। পেজ টার দায়িত্ব দিলাম আমার আইটি কন্সাল্টেন্ট হাসব্যান্ড কে। উনি এই সময় আমাকে সাপোর্ট না করলে হয়তো আমার স্বপনের শুরুই হতো না।প্রথমে প্রি-অর্ডার এ শাড়ি আনতাম।পড়ে দেখি অনেকে অর্ডার করে আনার পর নেয়না।তাই নিজের মতো করে পছন্দ করে শাড়ি কালেক্ট করি আমার পেজ এর জন্য।
বিজনেস শুরুর  প্রতিবন্ধকতা জানতে চাইলে কাকলী বলেন আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে অনেক কথা শুনেছেন কাকলী , তাদের কেউ কাকলীর  মা কে প্রশ্ন বানে জর্জরিত করতেন যে মেয়ের জামাইর কি ইনকাম ভালো না যে মেয়ে কে বিজনেস শুরু করতে হলো। আবার কাছের মানুষদের অনেকে কটাক্ষ করতেন যে কাকলী চাকরি ছেড়ে বিজনেস শুরু করলেন এতোই খারাপ অবস্থা কিনা।
নিজের ব্যবসা সম্পর্কে কাকলী বলেনঃ আমার  পেজ এর নাম Kakoly’s Attire .এই নাম রাখার কারন আমার পেজ আমাকে রিপ্রেজেন্ট করে।আমার ড্রেস, আমার শাড়ি আমার রুচি কে প্রচার করে। সেজন্য আমার পেজ এর এই নাম। আর সেঞ্চুরি মেয়েদের স্বাধীনতার প্রতিক। মেয়েদের স্বাধীনতার প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করেছি।
আল্লাহর রহমতে যত দিন যাচ্ছে আমার বিজনেস টা স্টাব্লিশ হচ্ছে।প্রথম প্রথম হতাশা কাজ করতো।কিন্তু মাটি কামড়ে পড়ে ছিলাম।অনেকে তখন পরামর্শ দিতো রানিং প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করতে।জামদানী এক্সক্লুসিভ আইটেম।কিন্তু আমার মা এবং হাসবেন্ড সবসময় উৎসাহিত করেছে।আমি তার উপর ভরসা করে ধৈয্য ধরেছি।এখন আল্লাহ ভালো দিন দেখাচ্ছে।আমার কাস্টমার গুলো রিপিট হচ্ছে।প্রডাক্ট এর কোয়ালিটির সাথে আপোষ করিনা।তাই একবার যারা শাড়ি নেয় তারা আবারও আসে।এখন শাড়ি এনে পেজ এ আপ করার আগেই কিছু সেল হয়ে যায়।যারা ইনবক্সে নক দিয়ে রাখে।আলহামদুলিল্লাহ।
জামদানী যারা ব্যবহার করে অভ্যাস্ত তারা অন্য শাড়ি কম পড়ে। তাই এটার এক ধরনের কাস্টমার।আবার যারা মণিপুরীতে অভ্যস্ত তারা মণিপুরী কালেকশনে রাখতে চায়।আবার কেউ কেউ দুই ধরনের শাড়িই কালেকশনে রাখে।তবে আমার জামদানীর কাস্টমার বেশি।নেক্সট টাইম তাঁতের শাড়ি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা চলছে।শীঘ্রই আমার পেজ এ এড হবে তাঁতের শাড়ি ইনশাআল্লাহ।
কাকলী আরো বলেনঃ  দেশে মেয়েদের ব্যবসায়ী হওয়াটা বিরাট চ্যালেঞ্জিং। সমাজের মানুষ মেয়েদের ব্যাবসা করা টাকে ভালো চোখে দেখেনা।অনেক নেগেটিভ কমেন্ট করে।আবার যাদের নিয়ে কাজ করবেন তারাও মেয়ে বলে পাত্তা কম দেয়।ইজি গোয়িং মনে করে।ইজিলি ডিল করা যাবে,ঠকানো যাবে এমন চিন্তা করে কাজ শুরু করে।এসব ব্যাপারে শুরু থেকে কঠিন হতে হবে।আত্নবিশ্বাসী হতে হবে।আপনার আত্নবিশ্বাস এবং আত্নসম্মানবোধ আপনার প্রতিটি কাথা ও কাজে প্রতিফলিত হবে।তাই এই দুইটি ব্যাপারে সচেতনতা জরুরি।
পন্যের প্রচারণা ও জনপ্রিয়তা জন্য আমি বলবো আপনি আপনার পণ্যের পিকচার এবং কন্টেন্ট এ  ফোকাস করুন।কারন আমারা অনলাইনে মূলত পণ্য সেল করিনা; পিক সেল করি।আপনার পণ্যের পিক দেখে ভালো লাগলে কাস্টমার কিনতে আগ্রহী হবে।তবে অবশ্যই পিক এর সাথে পণ্যের সামঞ্জস্যতা থাকতে হবে।
আমার জামদানী নিয়ে অনেক স্বপ্ন। আমি আগে অনলাইনে পরিপূর্ণ স্টাব্লিশড হয়ে তারপর নিজের একটা শোরুম দেয়ার ইচ্ছে আছে।বাকিটা আল্লাহ ভরসা।
নতুনদের জন্য কাকলী বলেনঃ  যারা বিজনেস করতে চান তারা আগে আইডেন্টিফাই করুন কোন জিনিস নিয়ে কাজ করতে আপনি আগ্রহী। কোন জিনিস ভালবাসেন।যে জিনিসের প্রতি ভালবাসা আছে ওটা নিয়ে আগে পড়াশুনা করুন।জানুন।শিখুন।তারপর শুরু করুন।স্টার্টআপদের জন্য পাব্লিক রিলেশন একটা ইম্পর্ট্যান্ট বিষয়।যেখানে যাবেন আপনার পণ্য রিপ্রেজেন্ট করুন।মানুষের সাথে পণ্য নিয়ে কথা বলুন।তাদের আগ্রহ ক্রিয়েট করুন।তাদের আগ্রহী করলে তারা আপনার পণ্যের প্রচার করবে বিনামুল্যে।
কাকলীর আজকে সফলতার জন্য যাদের অবদান  তা হলো Women and e-commerce (WE) গ্রুপ। এবং গ্রুপের কর্ণধার রাজিব স্যারের প্রতি কাকলী বিনম্র শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানান ।
কাকলী আশাকরেন আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে,বিশেষ করে মেয়েদের ব্যবসায়ী হওয়ার বিষয়ে পজিটিভ পরিবর্তন আসবে এই ব্যাপারে এখনো আশাবাদী তিনি ।