ইচ্ছেঘুড়ি

হুতুমপেঁচার হাওড়বিলাস

ডিশটিং মৌরী ঃ অত্যুৎসাহী বাঙ্গালীর নতুন হাইপে গা ভাসিয়ে দিয়ে আমরা হুতুমপেঁচার কয়েকজন এই ইদের লম্বা ছুটিকে উসুল করতে বেড়িয়ে পড়লাম কিশোরগঞ্জ হাওড় ঘুরতে। যেহেতু কিশোরগঞ্জ আমার বাড়ি, তাই ইদপরবর্তী হাওড়গামী রাস্তার হালহকিকত সম্পর্কে একদম তাজা খবর পেতে বেগ পেতে হয় নি। সবকিছুকে মাথায় রেখে পেঁচারা ১৫তারিখ সক্কালবেলা রওয়ানা হয়ে গেলাম, গন্তব্য চামড়া বন্দর। চামড়া বন্দর দিয়ে যাওয়ার কারণ হলো, এই ঘাট এখনো তেমন পরিচিত নয় তাই এখানে মানবজ্যাম কম আর নিকলি বেড়িবাঁধ যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না কারণ ইদের বন্ধের শুরু থেকে সেখানে তিলধারণের জায়গা নেই।

আমাদের “ম্যাডভেঞ্চারের” শুভ উদ্বোধন হলো অটোর টায়ার পাংচারের মধ্য দিয়ে যা আমাদের আশা দিল যে, আমরা এই ভ্রমণ থেকে শূণ্য হস্তে ফিরবো না। চামড়া বন্দর পৌঁছে নাস্তা সেরে আমরা একটা বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকা (যাকে আমি এরপর থেকে ট্রলার বলবো, যার আপত্তি থাকবে সে মনে মনে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বলুক) ঠিক করে চাগিয়ে বসলাম। কিশোরগঞ্জ হাওড় অনেক বড় আর বিস্তৃত, এর এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরতে ২দিন লাগবে। নিকলিকে মাথায় রেখে আমরা বেছে নিলাম ইটনা, মিঠামইন হয়ে নিকলি যাওয়ার পথ। এখানে বলে রাখি, চামড়া বন্দর থেকে কিছু পথ সামনে গেলে আরেক প্রখ্যাত সড়ক, বালিখোলা বাঁধ দেখা যায়, যা কি না আমরা ট্রলারে বসেই উপভোগ করতে পেরেছি। হেঁ! হেঁ! হেঁ!

আনুমানিক ১০টার দিকে ট্রলার এবং নিজেদের ফুয়েল সাথে নিয়ে শুরু হলো আমাদের হাওড় পাড়ি। আমাদের যাত্রাপথে আমরা রোদ পেয়েছি, মেঘ পেয়েছি, বৃষ্টি পেয়েছি, আকাশের অনেক রং পেয়েছি, প্রকৃতির অনেক রূপ পেয়েছি। যাত্রার শুরুতে বেশ রোদ ছিল, পানিতে হালকা স্রোত ছিল। ধীরে ধীরে আকাশে মেঘ জমলো, বাড়তে লাগলো স্রোতের বেগ, উঠতে লাগলো বিশাল ঢেউ। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর আমাদের ট্রলারের এমন অবস্থা, মনে হয় যেন সেইন্ট মার্টিন পাড়ি দিচ্ছি! ট্রলার খালি এদিকে দুলে আর ওদিকে ওঠে! আমরা ইচ্ছা করেই বড় আর ওজনদার ট্রলার নিয়েছিলাম এসব পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে (সাথে গতরখানাও তো একটু এলাতে হবে, নাকি!), যার কারণে ডুবে যাওয়ার ভয় ছিল না, অন্তত আমার ছিল না তখন পর্যন্ত!

হাওড় যে কত সুন্দর হতে পারে, যদি ট্রলার নিয়ে সারাদিন ঘুরে না বেড়ানো হয় তবে বোঝা যাবে না। যতদূর দেখা যায় শুধু জল আর জল, সেই জলের বুক চিড়ে টুইং করে গজিয়ে উঠেছে একলা একটা (কোথাও দুটো পাশাপাশি) গাছ। মেঘের যে কত রূপ, তা ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব না, তাও আবার আমার মতো সাহিত্যে লাড্ডু-গুড্ডু পাওয়া স্টুডেন্টের পক্ষে! কোন জায়গায় ফানেলের মতো মেঘ নেমে এসেছে পানির বুকে, কোথাওবা দেখা যায় দূরে আকাশ কালো করে অল্প একটু জায়গায় বৃষ্টি ঝড়ছে। তারমাঝেই ছাতা মাথায় দিয়ে ছইবিহীন নৌকা করে যাত্রী পারাপার হচ্ছে, প্যাঁক প্যাঁক করে হাঁসেদের ঝাঁক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। দূর থেকে ইটভাটার চুল্লী দেখলে মালুম হয়, ওই দূরে পানির নিচে একটা ইটভাটা আছে! এমনকি, রাতারগুলের মতো বিশাল জায়গা জুড়ে জলাবনও দেখা যায়! হাওড়ে যেমন পেয়েছি সেইন্ট মার্টিন পাড়ি দেওয়ার উত্তেজনা, তেমনই পেয়েছি সুন্দরবনের স্বাদ! না, না, ব্যাঘ্রমামার গর্জনের কথা বলছি না, বলছি সুন্দরবনের মতো দুপাশে শান্ত-শিষ্ট সবুজের সমারহের মাঝ দিয়ে নৌকা নিয়ে পাড়ি দেওয়ার কথা।

হাওড় বলতে শান্ত-শিষ্ট লেজবিশিষ্ট জলাশয় মনে হলেও, এই হাওড়ে কিন্তু যথেষ্ট স্রোত আছে! বিশেষ করে, লাইফ-জ্যাকেট পড়া সাঁতারজ্ঞানবিহীন মানুষকে টেনে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে এই হাওড়ের! কিভাবে আমি জানলাম? আরে, আমিই তো সেই লাইফ-জ্যাকেট পড়া সাঁতারজ্ঞানবিহীন মানুষ!!!

এই পেঁচারা বড্ড ইয়ে! ঢাকা থেকেই লাইফ-জ্যাকেট নিয়ে গিয়েছে হাওড়ে হাঁস হয়ে ভাসার জন্যে। আমাকেও কি করে যেন এই দলে ভিড়িয়ে ফেললো! মাঝিকে আগেই বলা ছিল, তিনি সুবিধামতো একটা জায়গায় আমাদের নামিয়ে দিলেন। আমরাও লাইফ-জ্যাকেট পড়ে ধীরু-ধীরু পায়ে জলে নেমে কেলী করা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ কেলী করে আমার আর সেতু-পেঁচার সাহস বেড়ে গেল, দিলাম গা-টা একটু ভাসিয়ে। শরীর ভাসিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই মাথায় সাইরেন বেজে উঠলো, অ্যাবোর্ট মিশন, অ্যাবোর্ট মিশন!! কিন্তু আমি আর সেতু-পেঁচা ততক্ষণে হাত ধরাধরি করে সবাইকে টা-টা দিয়ে দূরে বাই-বাই হতে থাকলাম, ‘ইয়ানেকি’ স্রোত আমাদের টানতে থাকলো। তার মাঝে আমি চিৎ থেকে কাৎ হলাম (কানে ঢুকলো একদলা পানি), তারপর বহু হ্যাঁচড়-প্যাঁচড় করে কাৎ থেকে উপুর হলাম (তখন নাক আর মুখ দিয়ে জলপান করলাম)। আমার মাথায় তখন অনেক চিন্তা আনাগোনা করছে। প্রথমে ৫বছর বয়সে দুইবার পুকুরে ডোবার স্মৃতি মনে আসলো। তারপর মনে আসলো কিছুক্ষণ আগে দেখে আসা বিশাল বিশাল স্রোত, কোথাও অগভীর পানি, কোথাও তলাবিহীন পানি। নাক দিয়ে পানি খাচ্ছি আর এগুলো চিন্তা করছি, পানি খাচ্ছি আর চিন্তা করছি। আর পাশ দিয়ে সেতু-পেঁচা একটু পরপর হুঁউউট-হুঁউউট করছে, “আপু, প্যানিক করো না, প্যানিক করো না”।

Never in the history of not panicking has anyone ever not panicked after being told to not panic!

দূরথেকে বাকি পেঁচাদ্বয় খালি বলে যাচ্ছে, “তোমরা ডুববে না, তোমরা এদিকে আসার চেষ্টা করো”। ওরে, কেউ ওদের বল, লাইফ-জ্যাকেট পড়া সাঁতারজ্ঞানবিহীন মানুষকে এদিক-ওদিক যেতে বলা আর বৈঠাহীন নৌকাকে এদিক-ওদিক যেতে বলা যে একই কথা! ইতিমধ্যে, পারে মানুষ দাঁত কেলিয়ে আমাদের ‘কুম্ভকে মেলে মে’ হারিয়ে যাওয়ার লাইভ দৃশ্য দেখতে ভিড় করে ফেলেছে আর স্রোত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ পারে এসে একটা নৌকা ভিড়লো। অত:পর, সেই নৌকা নিয়ে কেলানো মানুষের মাঝে দুইজন সহৃদয়বান ব্যক্তি এসে আমাদের উদ্ধার করলেন। আহ! যেন প্রাণ আসলো ধরে! আসার সময় সেই জায়গার একটা পিকুও তুলে এনেছি যাতে সবাইকে দেখিয়ে বলতে পারি, “এই সেই তপোবন!”

সব ভালো তার শেষ ভালো যার। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু হলো আমাদের হাওড় পাড়ি এবং দেখতে দেখতে শেষও হয়ে আসলো (উহুঁ-উহুঁ-উহুঁ)। দীর্ঘ ৭-ঘন্টার এই জার্নি বাই ট্রলারটা ছিল এককথায় অসাধারণ, যাকে বলে অপূর্ব, খাসা, উত্তম, উৎকৃষ্ট একটা অনুভব (আগেই বলেছি সাহিত্যে লাড্ডু-গুড্ডু পাওয়া স্টুডেন্ট!)। আপনারাও সময় থাকতে থাকতে সাধন করে ফেলেন আর হাওড় ঘুরে আসেন। তবে আমার মতো পিনিকঅ্যান্ডপ্যানিকওয়ালা লোকেরা হাওড়ে নামিয়েন না, নামলেও পারের কাছাকাছি থেকেই কেলী করিয়েন আর এক্সপার্ট সাতাঁরুর সঙ্গছাড়া হাওড়ে নামার প্রয়াস করিয়েন না। হ্যাপী হাওড় ঘুরিং!