মুক্তধারা

ইয়াজু’জ –মাজু’জ জাতি এবং যুলকারনায়েন (আঃ)

পবিত্র কোরআন শুধুমাত্র ধর্মীয় উপদেশে পরিপুর্ন একটি খটমটে গ্রন্থ নয় এতে প্রচুর প্রাচীন ঘটনাবলি বর্নিত আছে। আয়াতের মতই এই সকল ঘটনাবলিতে রয়েছে অনেক অনর্নিহিত বর্ননা এবং শিক্ষা, সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ্য আছে পবিত্র কোরআন শরিফে।

কেয়ামতের পুর্বে’র কিছু ঘটনার মধ্য আছে ঈসা (আঃ) আগমন, ইয়াজু’জ –মাজু’জ ,দাজ্জাল এবং ইমাম মেহেদির আগমন। আজকে আমরা ইয়াজু’জ –মাজু’জ সম্পর্কে জানবো।

ইয়াজু’জ –মাজু’জ আমাদের মতই একটি জাতি ,মানুষ এবং আমাদের মতই মানুষ। এরা পৃথিবীতে আছে এবং আদম (আঃ) এর বংশধর। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’লা হযরত আদম (আঃ) কে বলবেনঃ

“ তোমার বংশধর দের মধ্যে থেকে জাহান্নামিদের আলাদা করে দাও”।

হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ আল্লাহ্‌, আমি তো জানি না তারা কারা?

আল্লাহ্‌ বলবেনঃ “প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে নয়শত নিরানব্বই জন হচ্ছে জাহান্নামী”।

এই কথা শুনে সাহাবিরা মন খারাপ করে ফেলেন এবং দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন, তারা জিজ্ঞাসা করলেন –“ ইয়া রাসুলাল্লাহ কি নিশ্চয়তা সেই একজন আমারা হব?”

মহানবী উত্তর দিলেনঃ ইয়াজু’জ-মাজু’জ জাতি থেকে হবে নয়শত নিরানব্বই জন এবং বাকিদের মধ্যে একজন।

ধারনা করা হয় যে ইয়াজু’জ –মাজু’জ নুহ (আঃ) এর তৃতীয় সন্তান ইয়াফিজের বংশধর। এরা সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চিত, দয়া মায়াহীন জাতি এদের মধ্যে কোন ভালবাসা নেই , এরা প্রাচীন এবং দুর্নীতিপুর্ন জাতি, এদের কোন ন্যায়নীতি নেই, এরা ব্যাভিচারে লিপ্ত, এরা বর্তমান পৃথিবী থেকে একদম বিচ্ছিন, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তি সম্পর্কে এদের কোন ধারনা নেই। এরা মূলত যোদ্ধা জাতি, এদের কাছে কোন আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নেই, এদের একটাই ক্ষমতা এরা আক্রমণ করে একসাথে স্রোতের মত , পঙ্গপালের মত এবং সংখ্যায় এরা অগণিত। হত্যা –ডাকাতি, দুর্নিতি, অরাজকতা, ধর্ষন যা ইচ্ছা তাই করবে এরা। এদের মুল লক্ষ্য একটাই তা হল পৃথিবীকে দখল করে নেওয়া। এরা যখন বের হবে এদের সামনে দাঁড়ানোর কোন শক্তিই থাকবে না , পুরো পৃথিবী ছিন্ন ভিন্ন করে দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বের হবে এই দুই জাতি। মাত্র দুইবার মানুষ স্রোতের মত পৃথিবীতে বের হবে-

১) যখন ইয়াজু’জ –মাজু’জ বের হবে

২) যখন ইসরাফিল (আঃ) শিঙ্গায় ফু দিবেন।

ইয়াজু’জ- মাজু’জ এর সময়কাল মুসা (আঃ) এর সময়ের আশেপাশে। সেই সময় একজন প্রচণ্ড ক্ষমতাধর রাজা ও নবী ছিলেন “ যুলকারনায়েন (আঃ)। তিনি তার সময় পুরো পৃথিবী শাসন করেছেন। যুলকারনায়েন”-মানে দুই শিং, তার মুকুটে দুইটি শিং ছিল। কেও কেও বলেন ইরান আগে দুইটি দেশে বিভক্ত ছিল আর ইনি হচ্ছেন সে রাজা যিনি ইরানকে এক করেন এবং পার্সি সাম্রাজ্যকে বিস্তারিত করেন। আবার কোন কোন মুফাসসির বলেন তিনি পৃথিবী পূর্ব থেকে পশ্চিম শাসন করেছিলেন তাই তার নাম হয়েছে যুলকারনায়েন। কেও কেও বলেন যুলকারনায়েন হচ্ছেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট কারণ ইতিহাসে আর কোন রাজা পাওয়া যায় না যে কিনা সম্পুর্ন পৃথিবী শাসন করেছেন। যুলকারনায়েন (আঃ) অনেক ন্যায়পরায়ণ রাজা ছিলেন তিনি একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে একজন। যুলকারনায়েন (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা আল কাহাফের ৮৩ এবং ৮৪ নম্বর আয়াতে বর্নিত আছেঃ “তারা আপনাকে যুলকারনায়েন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে , বলুন আমি তোমাদের কাছে তার কিছু অবস্থা বর্ননা করবো, আমি তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ে কার্যত দান করেছিলাম”।

যুলকারনায়েন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং কট্টর রাজা ছিলেন, আল্লাহ্‌ তার সময় যে রকম আইন দিয়েছিলেন তার সময় তিনি তা কঠোর ভাবে প্রণয়ন করতেন। তার নিয়ম ছিল এটাই- যে ভাল কাজ করবে আমি তাকে বিশাল পুরস্কার দিবো আর যে খারাপ কাজ করবে আমি তাকে শাস্তি দিবো, আমি তো দিবই এই পৃথিবীতে আর শেষ বিচারে আল্লাহ্‌ তো আছেনই। এইভাবে তিনি পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতেন এবং তিনি তার বাহিনী নিয়ে পৃথিবীর বুকে চড়ে বেড়াতেন ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি পুর্ব দিকে যেতে যেতে পাকিস্থানের দিকে আসলেন এক জায়গায় এসে দেখলেন পানিতে সুর্য অস্ত যাচ্ছে এবং এরপর আর যাওয়ার কোন রাস্তা ছিল না। এই ঘটনাগুলোর বর্ননা দেওয়া হয়েছে সুরা কাহাফের ৮৫ থেকে ৮৮ নম্বর আয়াতে। তিনি আরো পুর্বে যাত্রা শুরু করলেন এবং সেখানে তিনি এমন একটি জনপদ আবিষ্কার করলেন যারা অত্যন্ত প্রাচীন। এতই প্রাচীন যে তাদের ঘরগুলোর উপরে কোন ছাদ পর্যন্ত নেই। তিনি সেই জনপদ কে দখল করলেন এবং আল্লাহ্‌র ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তিনি আবার যাত্রা শুরু করলেন এবং দুইটি বিশাল পাহাড়ের নিকট আসলেন। সুরা কাহাফের ৯২ থেকে ৯৪ তম আয়াতে বর্ননা করা হয়েছে ইয়াজু’জ এবং মাজু’জ জাতির কথা। যুলকারনায়েন (আঃ) পাহাড়ের পাশে একটি জাতি পেলেন যারা প্রায় অশিক্ষিত এবং কথাও বলতে জানেন না, অত্যন্ত প্রাচীন সভ্যতাহীন এক জাতি। তারা ইশারায় যুলকারনায়েন (আঃ) কে বললেন যে ইয়াজু’জ এবং মাজু’জ আমাদেরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তারা অত্যন্ত দুর্নিতি এবং মারামারিতে আসক্ত একটি জাতি। আমরা যদি তোমাকে আমাদের সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দেই তুমি কি তাদের এবং আমাদের মাঝে একটি বিশাল দেয়াল তৈরি করে দিতে পারো? যুলকারনায়েন (আঃ) উত্তর দিলেনঃ তোমাদের টাকার আমার কোন দরকার নাই আল্লাহ্‌ আমাকে যা দিয়েছেন তা পর্যাপ্ত যদি তোমরা তোমাদের জনবল দিয়ে আমাদের সাহায্য করো আমি তোমাদের এবং তাদের মধ্যে একটি নিশ্ছিদ্র প্রাচীর তৈরি করে দিবো। সেই জাতির আবেদনে যুলকারনেয়ন (আঃ) বললেন আমাকে লোহা এনে দাও। হাজার হাজার লোহা আনা হল তিনি সেই দুই পাহাড়ের মাঝে লোহাগুলো রাখলেন, লোহা দিয়ে প্রথমে একটি ফাঁপা দেওয়াল বানালেন এরপর বললেন এবার চুল্লিতে আগুন দাও। দুইটি পর্বতের মধ্যে লোহার দেয়াল সেখানে এমন আগুন দেয়া হল যে লোহা গলে গেল, এবার যুলকারনায়েন (আঃ) বললেন এবার তামা নিয়ে এসো , সুরা কাহাফের ৯৬ তম আয়াতে এর বর্ননা আছে। যুলকারনায়েন গলিত  তামা ঢেলে দিলেন গলিত লোহার সাথে তৈরি হল একটি নিশ্ছিদ্র দেয়াল। কাজ শেষ হবার পর যুলকারনায়েন (আঃ) বললেন এই প্রাচীর ইয়াজু’জ- মাজু’জ ভেদ করতে পারবে না এইটা আমাদের প্রভুর কাছ থেকে একটি দয়া , তিনি তোমাদের রক্ষা করেছেন ইয়াজু’জ –মাজু’জের হাত থেকে , এই প্রাচীরটি শক্তিশালী কোন সন্দেহ নেই কিন্তু একদিন আমার প্রভুর কথা সত্য হবে , সেদিন তিনি এই প্রাচীরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন। এই ঘটনার বর্ননা দেওয়া হয়েছে সুরা কাহাফের ৯৫ থেকে ৯৯ তম আয়াতে। এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে ইয়াজু’জ-মাজু’জ জাতি দুই পাহাড়ের মাঝেই আটকে আছে।

বর্ননা অনুযায়ী- প্রতিদিন ইয়াজু’জ –মাজু’জ জাতিরা এই প্রাচীর ভেঙ্গে বের হবার চেষ্টা করে একদিন তাদের এই প্রাচীর ভেঙ্গে তারা বের হতে পারবে। যখন তারা বের হবে তখন পৃথিবীতে ঈসা (আঃ) জীবিত থাকবেন, আল্লাহ্‌ ঈসা (আঃ) কে নির্দেশ দিবেনঃ “আমার একটি সৃষ্টি বের হয়ে আসছে কেও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না, কেও তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না, আপনি সকল বিশ্বাসী মানুষদের নিয়ে ফিলিস্তিনের আত’তুর নামক স্থানে যান”।

ঈসা (আঃ) বিশ্বাসীদের নিয়ে ফিলিস্তিনি তে চলে আসবেন। ইয়াজু’জ-মাজু’জ রা যাত্রা শুরু করবে তারা ফিলিস্তিনি এসে “তিবারিয়াস” নামক হ্রদ থেকে পানি খাওয়া শুরু করবে , তারা সংখ্যায় এত হবে যে একদম শেষের দিকে যারা থাকবে তারা এসে দেখবে কোন পানি নাই , তারা পৃথিবীর সব কিছু খেয়ে ফেলবে, খাবারের এমন অভাব হবে যে একটুকরা গোস্ত এক ব্যাগ স্বর্ন মুদ্রার থেকে দামি হবে। ঈসা (আঃ) এবং মুসলিমরা আল্লাহর কাছে দয়া করবে ইয়াজু’জ-মাজু’জ এর হাত থেকে বাচার জন্য। আল্লাহ্‌ তখন একপ্রকার কীট পাঠাবেন যেগুলো ইয়াজু’জ-মাজু’জদের আক্রমণ করবে এবং একরকম মহামারি শুরু হবে এবং সব ইয়াজু’জ-মা’জুজ মারা যাবে, পুরো পৃথিবী ভরে যাবে পচা গলা লাশ দিয়ে। পৃথিবীতে এমন কোন জায়গা থাকবে না যেখানে কোন গলা লাশ বা পচা লাশ পাওয়া যাবে না। ঈসা (আঃ) আবার দোয়া করবেন , আল্লাহ্‌ এবার পাখি পাঠাবেন, বিশাল বড় বড় পাখি যাদের ঘাড় হবে উটের মত, তারা লাশগুলো নিয়ে পানিতে ফেলে দিবে, আল্লাহ্‌ এবার বৃষ্টি পাঠাবেন , বৃষ্টি দিয়ে ধুয়ে দিবেন সমগ্র পৃথিবী। ইয়াজু’জ – মাজু’জ পৃথিবীতে বেশিদিন থাকবেনা হয়ত দিন বা মাসের মত থাকবে কিন্তু তারা যাকেই সামনে পাবে তাকেই হত্যা করবে।এরপর তারা আকাশের দিকে তীর ছুড়বে এবং তীরগুলো রক্তাত হয়ে ফেরত আসবে এবং এবার তারা দাবি করবে আমরা আকাশের লোকদেরকেও মেরে ফেলেছি, আমরা এখন সমগ্র পৃথিবীর রাজা।

পবিত্র কোরআন শরিফে ইয়াজু’জ এবং মাজু’জ জাতির বর্ননা আছে বলেই আমাদের উচিত এর উপরে বিশ্বাস আনা , আমরা যখন ঘুমাচ্ছি তকন প্রাচীন একদল মানুষ দেয়ালে শাবল ঠুকছে, মশালের আলোতে তাদের ঘামে ভেজা শরীর চকচক করছে, বের হতে হবে এটাই তাদের একমাত্র চিন্তা।