অনুরণন

অথবা আমি ভীতু হয়ে গেছি | সুস্মিতা’র রোজনামচা

সুস্মিতা জাফরঃ জীবনের ১৭ টা বছর এক নাগাড়ে ঢাকায় ছিলাম, কখনো আব্বু-আম্মুকে ছেড়ে একটা দিনও বাইরে কোথাও থাকিনি আমরা তিন ভাই-বোন। সেই আমাকে যখন মেডিকেলে পড়ার জন্য ফরিদপুরে যেতে হয়েছিল, জীবনে প্রথমবারের মত পরিবার ছেড়ে দূরে এক মফস্বল শহরে পাড়ি জমাতে হয়েছিল, তখনকার অনুভূতি টা শুধু আমি না,,,, হোস্টেলবাসী সবাই ই জানার কথা। কিন্তু পড়া শেষে সাড়ে ছয় বছর পর যেদিন ঢাকা ফিরে এলাম, আজ আমি ঠিক সেই সময়টাতেই আমার অনুভূতি টা একটু জানাচ্ছি। জানিনা, এমন অদ্ভুত অনুভূতি আর কারো হয়েছে কিনা,,,,,,

২০০৮ সালের ১৯ জানুয়ারি আমি ঢাকা ছেড়ে ফরিদপুরে যাই,,,, সেই যে যাই, এমন না যে আর আসিনি, এসেছিলাম অনেকবারই, মাত্র ১-২ দিনের জন্য,,, কিন্তু সেই যে ফরিদপুর গিয়েছিলাম, তারপর আমি ফিরেছিলাম আবার ৬.৫ বছর পর। সময়টা অনেকের কাছে খুব অল্প, অথবা আমার বেঁচে থাকার বয়স অনুযায়ী মাত্র ৪ ভাগের ১ ভাগ,,,, কিন্তু সত্যি বলতে, ওই ৬.৫ বছর সময়টা ছিল আমার জন্য অনেক বড় একটা সময়। ওই সময়টুকু সারাক্ষণ আমি ভাবতাম না যে আমি কবে ঢাকা যাব (১-২ দিনের জন্য), আমি ভাবতাম, আমি কবে ঢাকা ফিরব??

আমি প্রতিটা মুহূর্তে মনে করতাম, কবে আমি আবার ঢাকা ফিরব,,,, কবে আমি আবার সোনালি ভলভো বাসের সিঁড়িতে অথবা লাল দোতলা বাসের খোলা দরজায় ঝুলতে ঝুলতে প্রেসক্লাব-মিরপুর যাব! কবে আমি একদিন কোচিং এর বন্ধু গ্রুপের সাথে চন্দ্রিমা উদ্যান ঘুরব, আর একদিন স্কুল বন্ধু গ্রুপের সাথে কারো বাসায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিব। আমি খালি চিন্তা করতাম, ওরা সবাই ঢাকা আছে, কত না মজা করতেসে। আমি ভাবতাম, ওরা সবাই বুঝি ঠিক সেই আগের মতই আছে,চাইলেই কিংবা ডাকলেই তারা ছুটে আসবে আমার সাথে ঘুরে,বেড়াতে,গল্প করতে,,,,,ভাবতাম, আমার ছোট ভাই আর কাজিনগুলার বয়স বুঝি ৬.৫ বছর পরেও ঠিক একই রকম ১১ কিংবা ১২ তে এসে আটকে আছে! আমি মনে করতাম, মিরপুর অরিজিনাল ১০ টা সেই আগের মতই একটি মাত্র ফাস্ট ফুডের দোকান– yummy নিয়েই নীরব নিথর শান্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে! আমি চিন্তা করতাম, ২০১৪ সালে এসেও বুঝি সি এনজি ওয়ালারা মিরপুর-বেইলী রোড মিটারে ৬০ টাকার জায়গায় মাত্র ৭০ টাকা দাবী করে।

কিন্তু দীর্ঘ ৬.৫ বছর পর ঢাকা ফিরে আমি বুঝতে পারলাম, কেউই আর আগের মত নেই,,,,, বন্ধুরা সবাই অনেক আগেই পাশ করে চাকরিতে ঢুকে গেছে,,, কেউ দেখা করতে পারছে না চাকরির ব্যস্ততায়, কেউ সময় দিতে পারছে না সংসারের অজুহাতে। নিবিড় মিরপুর আর শান্ত নেই, শত শত ফাস্ট ফুড আর পোশাকের দোকান, মার্কেট, জাতীয় স্টেডিয়ামের ভীড়ে চারদিকে যেন ভয়ংকর অশান্ত অবস্থা বিরাজমান,,,,একদিন পকেটে ১০০ টাকা নিয়ে বের হয়ে দেখি সি এন জি ওয়ালাদের কেউই মিটারে যাচ্ছে না, মিরপুর-বেইলী রোডে এখন আর ভাড়া ৬০ টাকা নেই, ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৩০০! ভাবলাম, সেই প্রিয় চির চেনা সোনালি ভলভো বাসে করে যাই, বাস স্ট্যান্ডে টিকেট কাটতে গিয়ে শুনি,বহু আগেই সেই বাস সার্ভিস নাকি বন্ধ হয়ে গেছে! আহা, কত স্মৃতি ছিল সেই বাসগুলোতে আমার!

খুব অবাক হয়েছিলাম, যখন বাসার কোন এক অনুষ্ঠানে দেখলাম, আমার কাজিনদের নামে নাম কয়েকজন ১৭-১৮ বছরের কিশোর-কিশোরী দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে,,, অথচ আমার কাজিনরা তো ছিল শিশু!!,,,,, আমার ছোট্ট একমাত্র ভাইটাও বা অত লম্বা,ওরকম ব্যাটা ব্যাটা কন্ঠস্বরের হয়ে গেল কবে,,,, চিনতেই পারছিলাম না! তীব্র আতংক পেয়ে বসল আমাকে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি ঢাকা ফিরে আর ঢাকার রাস্তায় একা একা চলতে ফিরতে পারছিলাম না! যেই আমি হেঁটে হেঁটে বেইলী রোড থেকে শাহবাগ গিয়ে বাসে চড়ে বসতাম, চলন্ত বাসে লাফ দিয়ে উঠতাম কিংবা ঝাঁপ দিয়ে নামতাম,,,,, রাত-বিরাতে একা একা বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে বাসায় চলে আসতাম,,,, সেই আমি দেখি ৬.৫ বছর পরে ঢাকায় ফিরে আর বাসার সামনের চির চেনা রাস্তা এই পাড়ের পপুলার হতে ওই পাড়ের পপুলারই আর পার হতে পারছি না,,,, ধুকপুক করে উঠছে গাড়ি আর মানুষ দেখলেই! বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে রাত তো দূরের কথা ভর দুপুরেই রিকশা ঠিক করে দিতে বলে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করছি, বিরক্তির উদ্রেক করছি ওদের মনে!

আমি বুঝতে পারলাম, গত ৬.৫ বছরে শুধু সিএনজি ওয়ালা, আমার বন্ধুরা, আমার ছোট ভাই কিংবা কাজিনদের বয়স কিংবা ঢাকার রাস্তা ই শুধু বদলায়নি, ওদের সাথে সাথে আমিও বদলে গেছি,,,,আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেছি, অথবা আমি ভীতু হয়ে গেছি! আবার এমনও হতে পারে, হয়তো ওরা সবাই বদলে গেছে, সিএনজি ওয়ালা থেকে শুরু করে, কাজিন,বন্ধু,ভাই,রাস্তা,বাস— অথচ বদলাইনি শুধু আমি,,,, আমার মন! আমার মন, আমার চিন্তা, আমার ভাবনা — সেই একই, ২০০৮ এর জানুয়ারির ১৮ তারিখে আটকে আছে,,,,আমি ভেবেছিলাম, সবাই কিংবা সবকিছু সেই আগের মত,একইরকম আছে,,,, কিন্তু ৬.৫ বছর পর ফিরে আমি সবার এবং সবকিছুর সেই বদলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না,,,, আমি ভয় পাচ্ছিলাম,,,,আমি সেই পরিবর্তন কে, সেই বদলে যাওয়াকে ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম,,,,,,

আমার সেই ভয় আজও কাটেনি, আমি যখনই কোন স্বপ্ন দেখি, আমি দেখি সেই নীরব শান্ত মিরপুর, ১১ বছর বয়সের আমার নিষ্পাপ ছোট্ট ভাইটার চেহারা, অথবা আমার ১৫ বছরের কিশোরী বোন,,,, আমার স্কুল,স্কুলের বিশাল মাঠ,ভলভো বাস,,, এই এখন,,,, ১২ টা বছর পরে এসেও, আমি এখনো এগুলো চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই!