অনুরণন

ওনার ৮০ তম জন্মদিন,,,, ভাবা যায়? | সুস্মিতা’র রোজনামচা

সুস্মিতা জাফরঃ প্রতিরাতে আমি আব্বুর পাশে ঘুমাতে চাইতাম, কারণ আব্বু আমাকে ঘুম পাড়াত ‘মধুবালা আর মদন কুমার’ এর গল্প শোনাতে শোনাতে। একই গল্প আমি প্রতি রাতেই শুনতে চাইতাম। গল্প বলতে বলতে আব্বু ঘুমিয়ে গেলে চিমটি কেটে জাগিয়ে দিতাম, যেন গল্প শেষ না হলে ঘুমানো যাবে না,এমন!

প্রতিদিন প্রতি বেলা আমরা দুই বোন আম্মুর হাতে মাখানো ভাত খেতে চাইতাম। খুব ক্ষুধা পেলেও ভাব ধরতাম মোটেও খেতে চাচ্ছি না! গপাগপ খেয়ে নেয়ার মন চাইলেও ইচ্ছে করে এক লোকমা গিলতে মিনিট দশেক লাগাতাম। কারণ, আম্মু আমাদের খাওয়াত গল্প বলে বলে। আব্বু ওই এক ‘মদন কুমার’ এর গল্প শুনিয়ে পার পেলেও আম্মুকে বলতে হত— ‘কুজো বুড়ি’, ‘গোল রুটি’ কিংবা ‘টোনা-টুনি’ র পিঠে বানানো সহ রঙ বেরং এর নানান কেচ্ছা! খাওয়া শেষ তো, গল্পও শেষ, তাই টাল বাহানা করে খাওয়ার সময়টা extend করায় আমরা ছিলাম মত্ত!

এরপর স্কুলে ভর্তি হলাম। স্কুলে ভর্তি হতে হতে একদিন টের পেলাম, এসব গল্প কাহিনীর আসল উৎস বই। আর এমন বই প্রায়ই আমরা পাচ্ছি জন্মদিনের উপহার হিসেবে। উপহার দাতা ছিলেন — কচি মামা আর মামী। ওদিকে স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়ার মজা পেয়ে গেলাম— আরে, পড়তে পারা শিখলেই দেখি গল্পের বইও পড়া যায়! এ তো দেখি ভারী অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার! কিন্তু বানান করে পড়তে কষ্ট হত,তাই প্রতিদিন দুপুরে গোসল করে খেয়ে লক্ষী বেবীদের মত আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম— কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাস শেষে কখন সায়েম কাকা আসবে,,,, জন্মদিনে উপহার পাওয়া — ‘আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘বহুরূপী’ কিংবা ‘গুপী গাইন-বাঘা বাইন’ বইগুলো বার বার করে পড়ে শোনাবে!

একসময় এই গল্পের বই পড়ার জন্যই আমি খুব দ্রুত পড়তে শিখে গেলাম। খবরের কাগজ থেকে শুরু করে সদ্য কিনে আনা হুমায়ূন আহমেদ এর ‘মজার ভুত’— যাই পাই না কেন,গোগ্রাসে গিলে ফেলতে লাগলাম মাত্র ৫ বছর বয়স থেকেই! তখন থেকেই কল্পনা করতে শিখি। আমি প্রতি রোববার যখন সবাই ঘুমিয়ে যেত, আব্বুর ইংরেজী খবর দেখা শেষ হলে,,,, রাত সাড়ে দশটায় দেখতে বসতাম— ‘চারুপাঠ’ নামের এক প্রোগ্রাম। তাতে একজন মানুষ গোটা চার-পাঁচ বই উলটে পালটে লেখকের নামসহ বই এর কাহিনীর কিছু অংশ বলে যেতেন, তার মতামত ব্যক্ত করতেন।

আব্বু তখন খবরের কাগজ পড়তো, আর ৫-৬ বছর বয়সের ওই পন্ডিত ব্যক্তি আমি গভীর মনযোগে লোকটার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম, কাহিনী শেষ না করা আধো আধো গল্পের শুরু গুলো চমৎকৃত হয়ে শুনতাম! আহা, কী চকচকে মলাটের বইগুলো, ভেতরে কতই না মজার মজার গল্প ভর্তি! ভাইরে ভাই, জিহবায় যেন পানি এসে যেত, অমন দারুন দারুন বাধাই করা আয়তাকার বইগুলো দেখলে! সেই থেকে যে লোকটাকে আমি পছন্দ করতাম, এরপর থেকে লোকটা টেলিভিশন এ যা ই বলত, আমি শুধু অবাক হয়ে শুনতাম।

তারপর একদিন অনেক অনেক বড় হলাম,,,,, কারো জন্মদিন বা নানুকে দেখতে কচি মামা, রুচি খালামনি— যার বাসায়ই যাই না কেন, সব বাচ্চা হইচই করত, আর আমি তাদের বুক শেলফে আমার না পড়া বই খুজে এক কোণায় সটকে পড়তাম,,,, নিরিবিলি দেখে সেই বই পড়তে বসে যাইতাম। স্কুলে একদিন চলে এল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই। যে বইগুলো ১২ মাসের জন্য পড়তে দেয়া হত,আমি সেই বই ১২ দিনেই শেষ করে ফেলতাম, এর ওর কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়ে। অনেক অনেক বছর পর জানলাম,এই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত, ‘চারুপাঠ’ নামক অনুষ্ঠানের সেই উপস্থাপক!
আজ নাকি ওনার ৮০ তম জন্মদিন,,,, ভাবা যায়?

শুভ জন্মদিন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ! আপনি নিজেও হয়তো জানেন না, একটা ৫ বছরের মেয়ের মনে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আপনার কতটা অবদান আছে! যুগ যুগ এভাবে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাবেন,,,,সবসময় এই কামনা,,,,,,