অনুরণন

অপারগতা

সিদরাত মুনতাহাঃ

ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে ভাবীকে বললাম ভাবী ভাত দাও, ভাবী বলল,হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে আসো দিচ্ছি, হাতমুখ ধোয়ার আগে ইরার রুমে গেলাম,দেখলাম ঘুমাচ্ছে,চোখ ফোলা মনে হচ্ছে,মনে হয় অনেক কান্নাকাটি করেছে,কিজন্য কে জানে!মেয়েটার মাঝেমাঝেই মন খারাপ হয়,সাধারণত বয়ঃসন্ধিতে মেয়েদের এসব মন খারাপ টারাপ হওয়া ব্যাপার থাকে!৬ বছরের পুচকে মেয়ের কেন এত মন খারাপ হয় কে জানে!আচ্ছা ওর কি বাবার অভাব বোধ হয়?ক্যান হবে আমি কি ওকে ছোটবেলা থেকে কম আদর ভালোবাসা দিয়েছি? এসব ভাবতে ভাবতে ভাবীর ডাক পড়ল,খাবার দিয়েছি টেবিলে খেতে আসো, চটজলদি হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে বসে গেলাম,দেখলাম আজ খাবার টেবিলে বেশ আয়োজন,কই মাছের ঝোল,ঘন করে ডাল,টাকি মাছের ভর্তা,কুমড়ো ফুলের ভাজি, সবই আমার প্রিয় খাবার,কিন্তু কেন জানি আজ এসব কিছুই খেতে ইচ্ছে করছেনা,ভাবীকে বললাম ভাবী ডিম ভেজে দাও,ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাবো,ভাবী খানিকটা অবাক হয়ে বলল,এতকিছু করলাম তুমি শুধু ডিম দিয়ে ভাত খাবে? আমি বললাম হ্যা ভাবী,আজ কিছুই খেতে ইচ্ছা করছেনা, ভাবী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল,হয়তো ভাবছে এই কই মাছ নিয়ে আমার আর ভাইয়ার ঝগড়াঝাটির কথা!ভাইয়া মারা গেছে আজ দুবছর,বাসায় এখন আমি ভাবী আর ইরা থাকি,ভাইয়ার মৃত্যু এর পর ভাবী চাইলেই বিয়ে করতে পারত করেন নি,১০ বছরের সংসার ছিল ভাইয়া ভাবীর,১০ বছরেও ভাবীর কোল ভরেনি বলে কম কথা শুনতে হয়নি ভাবীকে,অপয়া,অলুক্ষনে কত কিছু!আমি সবসময় ভাবীর পাশে ছিলাম,সমস্যাটা আসলে ভাবীর না ছিল ভাইয়ার,যেটা শুধুমাত্র আমি ই জানতাম,ভাবীর নিষেধের জন্য কাউকে বলতে পারতাম না,ভাবীর ধারনা ছিল এই কথা জানলে তার স্বামীর অসম্মান হবে,পাগলের মত ভালোবাসত ভাবী ভাইয়াকে,ভাইয়া মারা যাওয়ার পর ভাবী সিদ্ধান্ত নিল সে একাই থাকবে,এই বাড়িতেই থাকবে যে বাড়িভর্তি ভাইয়ার স্মৃতি,ভাবীর মা বাবা চেষ্টা করেছিলেন ভাবীর বিয়ে দিতে ভাবী রাজি হন নি,এখানেই থেকে গেছেন, ভাবী ডিম ভেজে নিয়ে আসল, আমি সব ফেলে ডিম ভাজি আর ডাল দিয়ে বুভুক্ষের মত ভাত খেলাম,অসাধারণ লাগছে,ভাবীর হাতের রান্না অসাধারণ সত্যি ই অসাধারণ,সামান্য ডিম ভাজা তাও এত ভালো হয়েছে,ভাবীকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি খেয়েছ?আর ইরা খেয়েছে?ভাবী বলল আমি খেয়েছি,ইরা খায়নি,কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে গেছে,আমি জিজ্ঞেস করলাম কাদছিল কেন,?ভাবী বলল,জানিনাগো,তোমার মেয়ের মতিগতি আমি কিছুই বুঝিনা! ভাবী এ কথা বললেও ভাবী ইরাকে প্রচন্ড ভালোবাসে আমি জানি,ইরা ভাবীকে মাম্মি ডাকে আর আমাকে মা,,ইরার যখন বয়স ১ আমি ইরাকে নিয়ে চলে আসি ভাইয়ার বাসায়,আমার স্পষ্ট মনে আছে,আমি বান্ধবীর বাড়ি ঘুরতে গিয়েছিলাম,সেদিন রাতে বান্ধবীর ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিল,আমি ইরাকে নিয়ে গিয়েছিলাম,ইরা খুব খুশি ছিল,তখন তো ছোট ছিল বুঝত কম,তারপরেও চারপাশের হুইহুল্লোর আর বাসাভর্তি বেলুন আর এতগুলা বাচ্চা দেখে খুশিতে হাততালি দিচ্ছিল,ইরার বাবাকেও বলেছিলাম আসতে সে বলল,তার অফিসে অনেক চাপ,সে খুব ক্লান্ত তার একটু রেস্ট দরকার আমি আর জোর করিনি,ভাবছিলাম রেস্ট নিক,গত ২ মাস ধরে মানুষটার উপর দিয়ে আসলেই চাপ যাচ্ছে বাড়ি ফেরে রাত করে,আমি ইরার বাবার খাবার রেডি করে দিয়ে চলে গেলাম,যাওয়ার পর বান্ধবী জোরাজুরি শুরু করল আজ থাকতেই হবে, ইরার খুশি দেখে আমিও না করতে পারলাম না,ইরার বাবাকে জানিয়ে দিলাম আজ আসব না,সে স্বাভাবিক ভাবেই নিল,বলল আচ্ছা থাকো,এনজয় করো,আমি এখনি ঘুমিয়ে যাব ক্লান্ত লাগছে ফোন বন্ধ থাকতে পারে,আমি বললাম আচ্ছা, কিন্তু সেদিন আর থাকা হয়নি,থেকে গেলেই হয়তোবা ভালো হতো,ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখা লাগত না,১১ টার দিকে হঠাত বার বার মনে হতে লাগল ইরার বাবার কোন অসুখ করেনি তো,তখনি চলে গেলাম,ভাবছিলাম ঘুমাচ্ছে তাই আর কলবেল দিলাম না,বাসার এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে রুমে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলাম,একটা অপরিচিত মেয়ের সাথে অর্ধনগ্ন গায়ে অন্তরঙ হয়ে শুয়ে আছে ইরার বাবা,বিনা বাক্যব্যয়ে ২ ঘন্টার মধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে রাত ১ টার সময় ভাইয়ার বাসায় রওনা হলাম,ইরার বাবাকে আমাকে একটাবারের জন্য ও আটকাল না,কিছু বলল ও না যেন সে এটাই চাইছিল,,আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল গত দুইমাস যাবত রাত করে বাড়ি ফেরা,আমার প্রতি অনাগ্রহ, অতিরিক্ত ফোনের প্রতি মনোযোগী থাকার রহস্য সব পরিষ্কার হয়ে গেল,অথচ আমি ভাবতাম লোকটা সত্যি ই কাজের চাপে আছে, এত রাতে ব্যাগ জিনিস সহ ভাইয়া আমাকে দেখে খানিকটা ভড়কে গেল,ইরা আমার কোলে অনবরত কাদছে,আমি এক বিন্দু কাদছিনা আমার চোখমুখ শক্ত হয়ে আছে,ভাইয়া আমাকে দেখে কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তারপর বলল আয় ভেতর আয়,ভেতরে গেলাম,ইরা অনবরত কাদছে,ইরার কান্না বিরক্ত লাগছে,ভাবী ইরাকে ভেতরে নিয়ে গেল,কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগল,সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারলাম না,সব স্মৃতি চোখে ভাসতে লাগল,কলেজ থেকেই মানুষটা আমার পেছন পেছন ঘুরঘুর করত! হাজারবার রিজেক্ট হওয়ার পর কত কাঠখড় পেরিয়ে সে আমার মন জয় করল,৫ বছর প্রেমের পর মহাধুমধামে বিয়ে,বিয়ের বছরই ইরার আগমন তবুও আমরা সুখী ছিলাম যথেষ্ট সুখী ছিলাম,হঠাত সে ব্যস্ততার ছুতোয় বদলে যেতে লাগল,আর আজ বদলানোর কারণ জেনে চলে এলাম!
একটা মেয়ে সব সহ্য করতে পারলেও নিজের স্বামীর সাথে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারেনা,আমি ১ মাসের ভেতরেই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিলাম আর সে বিনাবাক্যে সই করে দিল!আমি তাকে কিছুই বলিনি,কোন অভিযোগ করিনি,এক বিন্দু কান্নাও করিনি,শুধু বলেছিলাম তোমাকে আর কখনোই আমার চোখের সামনে দেখতে চাইনা আর ইরার ধারে কাছেও আসবেনা,তাতেও সে আপত্তি করেনি,সত্যি ই ইরা ৫ বছর ধরে তার বাবার মুখ দেখেনি,৬ মাস শক্ত হয়ে বসে রইলাম,,মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম,ঘুমাতে পারিনা,কাদতেও পারিনা,ইরার প্রতি মনোযোগ দিতে পারিনা,আমাদের মা বাবা নেই ভাইয়া ভাবীই সব,ভাইয়া বলল এভাবে বসে থাকিস না,পড়াশোনা করেছিস জবটব কিছু কর,যোগ্যতা ভালো থাকায় সহজেই চাকরিতে ঢুকে গেলাম,শুরু হলো নতুন জীবন,ইরা বড় হতে লাগল মা আর মামা মামীর আদরে,আমি কখনো ইরার মাথায় ঢুকাইনি বাবার ব্যাপারটা সে যত বড় হতে লাগল নিজে থেকেই একটু আধটু বুঝতে লাগল,৫ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি করালাম,ইরা যখন স্কুলে যেত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত ওর বন্ধুদের বাবাদের,আমি বুঝতাম ওর চাহনীতে ছিল হাহাকার,ইরার ৪ বছর বয়সে ভাইয়া মারা যায় রোড এক্সিডেন্ট এ,এটা ছিল ছোট্ট ইরার জীবনে একটা ধাক্কার মত,কারণ তার মামা ছিল তার বেষ্ট ফ্রেন্ড,তার মামার না থাকার ব্যাপারটা বুঝাতে একটু সময় লাগল,সবকিছু আগের মত চলতে থাকল,আমাদের মা বাবার রেখে যাওয়া কিছু ছিল না,ভাবী ছিলেন অল্পশিক্ষিতা,সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পড়ল আমার ঘাড়ে,চাকরী বদলালাম দ্রুত প্রমোশন হলো ব্যস্ততা বেড়ে গেল তার মধ্যেও যথাসম্ভব ইরার সাথে সময় কাটাই! এসব ভাবতে ভাবতে সাগরের ফোন! সাগর নামের মানুষটার সাথে পরিচয় অফিস বদলানোর পর থেকে,,আমার কলিগ সে,,বুঝিনা মানুষটাকে,প্রতিদিন বাড়ি ফেরার পর ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করবেই,পৌছেছি কিনা,প্রতিবেলায় অযথা মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করবে,খেয়েছি কিনা,মন ভালো আছে কিনা,অযথা খোজখবর নেবে,কি দরকার এসবের বিরক্ত লাগে আমার!অবশ্য মানুষটাকে আমার খারাপ মনে হয়না,কখনো খারাপ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে বলেও মনে পড়েনা,ফোন ধরে বললাম হ্যা বলুন পৌছেছেন? জ্বী পৌছেছি,পৌছাব না কেন? আপনি কি রেগে আছেন? জ্বি না,অনেক আনন্দে আছি, কিছু বলবেন? না,মানে কাল ইরাকে নিয়ে একটু বেরুতে পারি? কেন? আসলে অনেকদিন ইরাকে দেখিনা তাই,কাল বন্ধের দিন ও আছে, আচ্ছা দেখি, আমি না করতে পারলাম না,পারলাম না কারন ইরা সাগরকে খুবই পছন্দ করে,চশমা পড়া গোবেচারা চেহারার একটা মানুষ,চেহারায় বোকা বোকা ভাব প্রবল,তাকে পছন্দ করার কি আছে বুঝিনা!অবশ্য ইরা ছোট মানুষ এসব কি বুঝবে!যে তার সাথে বন্ধুর মত মিশবে সে তাকেই পছন্দ করবে, একদিন ইরাকে অফিসে নিয়ে গিয়েছিলাম,ইরা বয়সের তুলনায় শান্তশিষ্ট, আর কেউ না কেন জানি সাগরের সাথে তার অনেক খাতির হয়ে গেল,মাঝেমধ্যেই সে সাগরের কথা বলে,মাঝেমধ্যে ঘুরতে যেতে যায় আজকালকার যে যুগ একা দিতে ভয় লাগে,যদিও সাগরকে আমার ভালোমানুষ ই মনে হয়,তবুও মানসিক শান্তির জন্য বাধ্য হয়ে আমিও যাই, আমি দেখি ইরা কতটা খুশি থাকে সাগরের কাছে,হঠাত মনে হয় মানুষটা বেইমানি না করলে এরকম আনন্দঘন সময় হয়তো ইরা প্রায়ই কাটাত! ১ টা বেজে গেছে এতকিছু ভাবতে ভাবতে,ঘুমের ওষুধ খেলাম দুটো,সেদিন পর থেকে আমার স্বাভাবিক ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে,ঘুম এখন ওষুধ নির্ভর, ওষুধ খেয়ে ইরার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম,প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লাম, সকাল বেলা সাগরের মেসেজ”আজ সকালেই বের হই?” একটা সুন্দর জায়গা আছে,যেতে একটু সময় লাগবে, আমি আপত্তি করলাম না,নিজের ও দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে,ইরাকে ঘুম থেকে তুলে বললাম মামনি আজকে আমরা দূরে কোথাও ঘুরতে যাব,ইরা লাফিয়ে উঠে বলল,সাগর যাবেতো? ইরা সাগরকে সাগর ডাকে,ব্যাপারটা আমার অদ্ভুত লাগে,আমি ওকে অনেকবার মানা করেছি নাম ধরে ডাকতে,কিন্তু ইরা বলে সাগর ই নাকি তাকে বলেছে নাম ধরে ডাকতে,আমি সাগরকে গিয়ে বলেছিও আপনি নাকি ইরাকে নাম ধরে ডাকতে বলেছেন? এটা কেমন কথা? সাগর বলল,হ্যা বলেছি,সমস্যা কি,আমার তাতে সমস্যা নেই তো,ভালোই লাগে আমার, এত বাচ্চা একটা মেয়ে আপনাকে নাম ধরে ডাকছে এটা আপনার ভালো লাগে? হ্যা,আপনি তো আর বাবা ডাকতে দেবেন না, আমি কড়া গলায় বলেছিলাম,কি বললেন?সাগর হেসে বলল সিরিয়াস হবেন না,রসিকতা করছিলাম, নাস্তাটাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম ইরাকে নিয়ে,দিনটা ভালোই কাটল,পথে যেতে যেতে ইরা আর সাগরের মজার মজার কথা শুনতে লাগলাম,ইরা আর সাগর অনেকগুলা ছবি তুলল,ইরা বলল মা তুমিও আসো,আমি অস্বস্তি বোধ করলেও ইরার জোরাজুরিতে তুললাম,ফেরার পথে ইরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল,আমরা ফিরছি ক্যাবে, সাগর বলল,বাসা থেকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে, আমি বললাম বেশ তো করে ফেলুন বিয়ে ,বিয়ের বয়স হলে বলবেনা বিয়ের কথা? কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাইনা, কেন? একজনকে ভালো লাগে, তাহলে তো আরো ভালো তার কথা বলে ফেলুন বাসায়, কিন্তু সে যে জানেনা আমার তাকে ভালো লাগে,, এটা কেমন কথা? সাগর আর কিছু বলল না আমরা যার যার বাড়ি ফিরে এলাম বাড়ি এসে ইরা আর সাগরের ছবি দেখতে লাগলাম,প্রত্যেকটা ছবিতে কি খুশি ইরা! একসময় তিনজনের ছবিটা সামনে আসল,ছবি দেখে চরম অস্বস্তি লাগছিল,মনে হচ্ছিল কোন পারিবারিক ছবি, সাগরকে ইরার বাবা মনে হচ্ছিল, আচ্ছা ইরা কি সাগরের মাঝে নিজের বাবাকে খোজে? যদি এমন হয় ব্যাপারটা মোটেই ভালো হবেনা,বুঝেছি এখন থেকে ইরাকে এত সাগরের সাথে বেরুতে দেওয়া যাবেনা,ছবিটা ডিলিট করে দিলাম, তারপর আমার নিত্যকার রুটিন অনুযায়ী ঘুমের ওওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম,ঘুমিয়ে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম, দেখলাম ইরাকে সাগর স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে,আমি সাগরকে বলছি চা টা খেয়ে যাও, স্বপ্নে সাগর আমার স্বামী,ছিছি, কি বাজে স্বপ্ন!কি লজ্জাএ কথা! ,সেদিন অফিসে গিয়ে সাগর কে দেখে ভীষন অস্বস্তি লাগল, অফিস বাসায় ফেরার পর সাগর এর মেসেজ,একটু বাসার নিচে আসবেন? আজব তো,বাসার নিচে কেন যাবো,বারান্দা দিয়ে তাকিয়ে দেখি সাগর বাসার নিচে হাটাহাটি করছে,মানুষ দেখলে অন্যকিছু ভাবতে পারে জলদি নিচে নেমে গেলাম, বললাম কি ব্যাপার হঠাত,কোন কাজ ছিল নাকি? সাগর কিছুটা ইতস্ততভাবে হাতে একটা প্যাকেট দিল,দেখে মনে হলো কোন শাড়ি, তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম,এটা কি? সে বলল,শাড়ি আপনার জন্য, আমি বললাম কেন,আমার জন্য শাড়ি কেন,আমার তো আজ জন্মদিন না, সাগর বলল প্লিজ না করবেন না,আমি অনেক ঘুরে ঘুরে পছন্দ করে কিনেছি আমি আর না করলাম না বাসায় এসে প্যাকেট খুলে দেখলাম অদ্ভুত সুন্দর একটা নীল শাড়ি,আর সাথে চিরকুট,তাতে লেখা কাল অফিস শেষে শাড়িটা পড়ে আমার সাথে কফিশপে বসবেন প্লিজ? ব্যাপারটা খুবই ছেলেমানুষী লাগল,ফোনে আবার মেসেজের শব্দ,মেসেজে উত্তরটা? উত্তর না দিয়েই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পর হঠাত মনে হলো যাই,কেন মনে হলো নিজেও জানিনা,নিজেই মেসেজ করলাম, কোন কফিশপ? সাগর ঠিকানা মেসেজ করে দিল, আমি নীল শাড়ি পড়লাম,চোখে কাজল দিলাম,হাত ভর্তি করে চুড়ি পড়লাম,হাল্কা গোলাপি রং এর লিপস্টিক পড়লাম,কেন এত সাজলাম নিজেও জানিনা,কেমন জানি লজ্জা লজ্জা লাগছিল, কফিশপে গেলাম,সাগরকে আজ বেশ ফিটফাট লাগছে,চেহারায় বোকা বোকা ভাব নেই আজ, আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টে, কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল, আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে, আমি কেমন জানি লজ্জা পেয়ে গেলাম,বললাম ধন্যবাদ, কিছুক্ষন নিস্তব্ধতা চলল, এরপর বলুন ডেকেছেন কিজন্য নীল শাড়িতে, সাগর বলল,আমি আসলে কথা কম বলি আর আমি এত ঘুরিয়ে কথা বলতে পারিনা, আপনাকে ঘুরিয়ে কথা বলতে বলেছে কে?আমার ও সরাসরি কথাই ভাল্লাগে, সাগর একটানে বলে গেল, আমি ইরার বাবা হতে চাই,আপনাকে সেদিন বলছিলাম না একজন কে পছন্দ সে জানেনা সে আপনিই,আমি বাসায় আপনার কথা বলেছি,সবাই খুব সুন্দরভাবে মেনে নিয়েছে,আপনার ছবি দেখিয়েছি,সবাই আপনাকে ভীষন পছন্দ করেছে,আপনি চাইলে আজ বাসায় নিয়ে যেতে পারি, সবাই অপেক্ষা করছে আপনার জন্য, আমার মনে হলো আমি ঘোরের মধ্যে আছি একটু পর ঘোর কাটল, প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললাম, আপনার মত অসভ্য,ছোটলোক আমি জীবনে দেখিনি আমার মেয়ের সাথে একটু ভালো সময় কাটিয়েছেন আমি আপনার সাথে ভালোভাবে কথা বলেছি এজন্য আমার মেয়ের বাবা হতে চলে আসলেন?বুঝেন বাবা হওয়ার অর্থ?বয়স কম,স্টাবলিশড মানুষ আপনি মেয়ের অভাব হবে আপনার?আবোলতাবোল কথা বলেন কেন?আর কোনদিন আপনাকে যেন আমি না দেখি, কোনদিন না!আমি কালই অফিস ছেড়ে দেব! কথাগুলো বলার পর দেখলাম সাগরের চোখে পানি ছলছল করছে,করুক আমার কি!আমি এক গ্লাস পানি খেয়ে চলে এলাম!একবার পেছনে তাকিয়ে দেখলাম ভরা কফিশপে বসে ছেলেটা কাদছে, কাদুক,আমার কি!যতসব আবেগী কথাবার্তা,দুইদিন পর ঠিকই মনে হবে ডিভোর্সি বাচ্চার মা কে বিয়ে করেছে আরো বেটার ডিসারভ করত, ব্লা ব্লা,আসছে,এই আবেগ কেটে যাবে,মানুষের ৮ বছরের ভালোবাসা ২ মাসে নষ্ট হয় আর এর কয়মাসের আবেগ!আমি চলে আসলাম বাসায়,হঠাত খেয়াল করলাম আমার চোখ দিয়েও পানি পড়ছে!কেন পড়ছে নিজেও জানিনা!