অনুরণন

ভ্রমণই যদি কারো উদ্দেশ্য হয় | সুস্মিতা’র রোজনামচা

সুস্মিতা জাফরঃ কয়েকদিন ধরেই আমার ফেসবুক টাইমলাইনের অনেক মেয়ের প্রোফাইলে একটা ছবি রীতিমত ভাইরাল,,,, একজন নারী, lawyer,,,, তিনি হিজাব এবং গাউন পরে ইউরোপ এর ২৫ টি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন, ৩৫+ শহরে, মাত্র ৩ বছরে (ছবিতে ওনার ক্যাপশন দেখে যা বুঝেছি)। এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেকেই আফসোস করছেন, আর যারা আফসোস করছেন, তাদের বেশিরভাগই ডাক্তার কিংবা MBBS পড়ছেন এবং তাদের বয়স এখনো ৩০ পেরোয়নি!!! এদের অনেকের মতে তারা পড়তে পড়তেই জীবন পাড়ি দিয়ে দিচ্ছেন, ভ্রমণ কবে করবেন, কীভাবে করবেন??

দিলীপ স্যারের অনেক মূল্যবান কথার মাঝে একটা কথা আমাকে সবসময় উদ্যমী হতে সাহায্য করে, সেটা হচ্ছে— ডাক্তারদের জীবনই শুরু হয় ত্রিশের পর, ষাট বছর বয়সে আসে তারুণ্য!! আমি জানিনা, আমার জীবন কতটা সময়ের জন্য,,,, তবে এটা জানি বেঁচে থাকলে একদিন না একদিন অধিকাংশ স্বপ্ন পূরণ হবেই। যিনি ৩ বছরে ২৫ দেশ ভ্রমণ করেছেন, নিশ্চয়ই তার অফিস এরকম যেখানে তিনি সময় বের করে নিতে পারছেন অল্প সময়ে অনেক দেশ ভ্রমণের, নিশ্চয়ই তার স্যালারি কিংবা ব্যাংক একাউন্ট এমন পর্যাপ্ত যে সেটাও তাকে অল্প সময়ে সুন্দর সুন্দর জায়গায় সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে ভ্রমণ করতে সাহায্য করেছে।

আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ তো দূরে থাক, দেশের ভিতর বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণ করার জন্যই ছুটি পাওয়া দুরূহ। তাও যারা ঘুরতে পছন্দ করেন, তারা কিন্তু সংসার, চাকরি সামলে ঠিকই ছুটি এবং অর্থ জমিয়ে রাখতে পারছেন ঘোরার জন্য! ভ্রমণই যদি কারো উদ্দেশ্য হয় তাহলে সেখানে গিয়ে গাউন আর হীল স্যান্ডেল পরে ছবি তুলতেই হবে এমন কোন কথা নেই, ঘোরার জন্য আরামদায়ক পোশাক এবং জুতাই আমার কাছে preferable। হ্যা তবে, কারো যদি এই শখ হয় যে সে অসাধারণ সুন্দর জায়গাগুলোতে যেয়ে সুন্দর পোশাক পরে ছবি তুলে সেই স্মৃতিগুলো ধারণ করে রাখবে—- তাহলে তা সে অবশ্যই করতে পারে, যার যার ব্যাক্তিগত পছন্দে আমি বা আমরা মতামত প্রদর্শন করতে পারি না।

আসলে ভ্রমণ দুই রকম— ১। ভ্রমণ উপযোগী পোশাক গায়ে চড়িয়ে ব্যাক প্যাক কাঁধে, কম সময়ে, কম খরচে, হই হই করে কোন এক জেলার সবকিছু ধুপ ধাপ ঘুরে ফেলা– দর্শনীয় স্থান থেকে শুরু করে জাদুঘর,চিড়িয়াখানা পর্যন্ত , সেই অঞ্চলের ভাল ভাল খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা, বিভিন্ন activities যেমনঃ স্কুবা ডাইভিং, স্নোরকেলিং, স্কেটিং,কায়াকিং এ অংশ নেয়া,,,,এক্ষেত্রে আগে থেকেই সবকিছুর একটা পরিকল্পনা করে রাখা হয়,,,, ২। বেশ কয়েকদিন সময় নিয়ে, বিলাসবহুল হোটেল এ বিশ্রাম, পাশাপাশি আশেপাশের মনোরম দৃশ্য অবগাহন করা, এক্ষেত্রে তেমন পরিকল্পনা কিছু করা হয় না, অবসর যাপনটাই মুখ্য। এখন আপনি কোন ধরণের ভ্রমণ করবেন সেটা একদমই আপনার নিজস্ব ব্যাপার, আপনি পছন্দ করেন অবসর যাপন, তাহলে আরেকজন ট্রাভেলারের ট্র‍্যাকিং,হাইকিং, প্যারাসাইক্লিং,প্যারাগ্লাইডিং দেখে আপনার আফসোস করা চলবেনা। আবার আপনার হাতে সময় নেই, খরচ করার মত অমন সামর্থ নেই, ইচ্ছে আছে অনেক জায়গার স্বাদ নেবেন অল্প খরচে,,,, তাহলে অবকাশ যাপনকারী ভ্রমণ পিপাসুদের দেখে আপনারো আফসোস করা শোভা পায় না।

আমি ছুটি সেভাবে ম্যানেজ করতে পারি না, বিলাসবহুল অবকাশ যাপনের মত অর্থ নেই, কাছাকাছি থাকলেও অন্য অনেক শখের পিছনে সেগুলো ব্যয় করে ফেলি। কিন্তু তাই বলে আমি ভ্রমণ থামিয়ে রাখিনি। সুযোগ পেলেই কোথাও না কোথাও যেতে চেষ্টা করি, দূরে না পারি, নিজ বাসস্থানের আশেপাশেই এটা ওটা দেখার চেষ্টা করি। কোন জায়গায় গেলে সেখানকার জাদুঘর, চিড়িয়াখানাও বাদ দেই না,,,, দেশের ৬৪ জেলার মাঝে মাত্র ২০ টিতে আমার পা পড়েছে,কোন জায়গায় যেয়ে কখনো মনে হয়নি ছবি তুলে রাখতেই হবে,দেখতে পারছি দুই চোখ ভরে সেটাই অনেক,অনেক ছবি হারিয়েও ফেলেছি,,,আমি জানি, এটা অন্যদের তুলনায় কিছুই না, কিন্তু নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী দেশের ভিতর যতটুকু ঘুরেছি তাতে আমি satisfied ….

আফসোস নয়, স্বপ্ন দেখুন,,,,, আফসোস পূরণ হবার নয়, শুধু বেড়েই যায়,,,, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হবার এবং হয়ও।