অনুরণন

টিংকারবেল | সুস্মিতা’র রোজনামচা

সুস্মিতা জাফরঃ হাই, আমার নাম জানো তোমরা? কী বল, এখনও জানো না?? নাকি ভুলে গেছ? আরে, আমি হলাম টিংকার বেল। বাবা-মা’র একমাত্র আহ্লাদে বেবীটা। কোন ভাই-বোন না থাকায়, পুরো খাচায় কিন্তু আমারই রাজত্ব, বুঝলে? আম্মু বলেছে, আমার নাকি ঈদের পরেই গোটা কয়েক ভাই-বোন হবে, সেজন্য আম্মু সারাক্ষণই হাড়ির ভেতর বিশ্রাম নেয়। আমি বাইরে ডালে বসে আব্বুর সাথে খেলি। এই দোলনায় দুললাম তো, ওই খাবারের পাত্রে ঝাপ দিয়ে পড়লাম! ইশ, কী যে গরম পড়েছে না,,,, আমার অবশ্য সমস্যা নেই, নানা ভাই এর রেখে যাওয়া ঠান্ডা পানির পাত্রে ভরদুপুরে গা ডুবিয়ে গোসল করতে দারুন মজা!

খানিক্ষণ পর পরই আব্বু এসে জিজ্ঞেস করে, খুকুমনি, খাবার সময় হয়েছে, খেয়ে নাও। বয়স আমার দুই মাস৷ এই বয়সেও কাউকে বাবা মুখে তুলে খাইয়ে দেয়,বল? আমার আব্বু কিন্তু এখনও আমাকে সব খাবার চিবিয়ে চিবিয়ে গুড়ো করে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। সারাদিন টই টই করে পুরো খাচা ঘুরে বেড়াই, মাঝে জানালা দিয়ে আকাশ আর বারান্দা বাগানে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। একদিন ঘুরতে ঘুরতে দেখি খাচার ভেতরেই উড়তে শিখে গেলাম। নানা ভাই একটা বাড়তি খাবারের পাত্র রেখেছিলেন খাচায়। আমি করলাম কী, যেই না নানা ভাই আর নানুমনি অফিসে গিয়েছে, অমনি ওই লাল পাত্রটার সব খাবার নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দিয়ে, পাত্রটাকেই নিজের জন্য আরামদায়ক একটা খাট বানিয়ে দিব্যি এক ঘুম দিয়ে নিলাম। বানাবই না বা কেন,বল? দুই মাস বয়স আমার, প্রাইভেসি বলে কি কিছু নেই নাকি বলতো?? আলাদা ঘরের কি দরকার নেই আমার বল?? আমি নাকি সারা বিকেল এমন নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছি, যে নানুমনি কেদেই ফেলেছিল, এই ভেবে, আমি আবার মরে যাইনি তো???

নানা ভাইকে আমার খুব ভাল লাগে,,,, কী সুন্দর ভোরবেলা হতে না হতেই হেড়ে গলায় গান গাইতে গাইতে আমাদের খাবার দেয়, পানি দেয়, ঘর দোর পরিষ্কার করে দেয়। আমাকে একটুও বিরক্ত করে না। মাঝে মাঝে আবার দোতারা বাজিয়ে শোনায় আমাকে, আহা, আরামে চোখে ঘুম এসে যায়, জানো?? কিন্তু এই নানুমনিটাকে আমার একটুও ভাল লাগে না। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরেই আমাকে খাচা থেকে বের করে খেলতে নিয়ে যায় ঘরে, ঘুরতে নিয়ে যায় বাগানে,,,,কত বলি, আমাকে ধরো না, আমি খাচাতেই খেলতে চাই, দেব কিন্তু আংগুলে কামড়,,,ওম্মা, কামড় খেয়েও মিটিমিটি হাসে, কিছুতেই কথা শোনে না!

তো একদিন মাথায় খেলে গেল এক দুষ্টু বুদ্ধি। যেই না নানাভাই খাচার দরজা খুলেছে খাবার দিতে, অমনি আমি দরজা গলে দিলাম উড়াল। কিন্তু কী হতে যে কী হল, ওই সিলিং ফ্যানের থাপ্পড় খেয়ে যে কে সেই নানার ঘাড়েই এসে পড়লাম। যদিও তেমন ব্যথা পাইনি, তবুও ওই পাজি নানুমনিটা ছুটে এসে সে কী কান্না, আমাকে প্রাণ ভরে আদর করে যখন বুঝল তেমন লাগেনি আমার, তারপর দিল এত্তগুলা রাম ধমক! যাই হোক, তারপর থেকে আমি একদম গুড গার্ল হয়ে গিয়েছি। দরজার কাছে ভুলেও আসি না, নানুমনির কোলে লক্ষী মেয়ের মত বসে টেলিভিশন দেখি।

কিন্তু আজ আমার মনটা বেশ খারাপ। নানুমনি বলেছে, আজ থেকে আমি আর এই বাসায় থাকব না। আমি চলে যাচ্ছি, নতুন বাসায়, নতুন এক নানুর কাছে। খুব মিস করব নানা ভাই এর ভোরবেলায় গাওয়া গান, নানুমনির আদর আর ধমক। এতদিনে বুঝতে পেরেছি, ওরা আমাকে কত্ত ভালবাসত। নতুন ভাই-বোন আসবে, আমি বড় হয়ে গেছি, তাই আমাকে চলে যেতেই হবে। তোমরা আমার জন্য দোয়া কর যেন নতুন জায়গায় একদম দুষ্টুমি না করি ,,,,, টাটা।