অনুরণন

একটি নিখোঁজ সংবাদ

মাহ্ফুজা ইয়াসমিন নিপু: আমার নাম রিনি । একটু পরেই আমি মারা যাবো । আমার ধর্ষণ করা শরীরটা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে । কিছু দেখতে পাচ্ছিনা আমি । ধর্ষকগুলো কিসব বলছিল ।কিছু কথা শোনা যাচ্ছে শুধু । আমাকে কিভাবে মারা হবে তা নিয়ে তর্ক চলছে ।

মনে মনে শেষবারের মতো ভয় পেলাম । আগুনে পুড়িয়ে যেন না মারা হয় আমাকে ‌। গত বছর গরম পানি পরে পা পুড়ে গিয়েছিলো, ভীষণ যন্ত্রণা হয়েছে । পুরো শরীরে আগুন দিলে কত কষ্ট করে মরতে হবে ! এর চেয়ে মাথায় বারি দিয়ে মেরে ফেলুক আমায় । স্মৃতিগুলো যদি এই সুযোগে নষ্ট হয়ে যায় ভালোই হবে ।গলা টিপে মেরে ফেললেও চলবে ।এমনিতেও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে …

না…আমার ইচ্ছা পুরন হলোনা । ধর্ষকদের সিদ্ধান্ত ঠিক হয়েছে আগুনে পোড়াবে আমাকে ।কোন প্রমান রাখা যাবেনা নাকি ।পোড়ানো শেষ হলে ছাইগুলো নদীতে ভাসিয়ে দিবে । আমার দম বন্ধ হয়ে গেছে ততক্ষনে ।ওরা গায়ে কেরোসিন ঢাললো , আগুন ধরিয়ে দিল । আমার কোন অনুভূতি নেই । তবে কি ওরা আমার মৃত শরীরে আগুন দিল ?

কিছুই বুঝতে পারছিনা । সবকিছু হালকা লাগছে ।মৃত্যুর পর আমি এখনও পৃথিবীতে আছি । সবকিছু দেখতে পারছি ।ওরা আমার পোড়া শরীরের ছাইগুলো বস্তা বন্দী করছে । কোন প্রমান রাখেনি ওরা ।তবে কি আমি একাই এই মৃত্যুর প্রমান … ??? কাল ঘটা করে পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ হবো আমি ?

আমার ঘরে আছে অসুস্থ মা আর ছোট একটা ভাই । পড়াশোনায় ভালো ছিলাম ।দেখতে সুন্দরী । বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে আমার একটা চাকরী হয় ।সবে দুইমাস হয়েছে চাকরীর । মা আর ভাই এর মাথার উপর আমি ছাতা । প্রথম বেতন পেয়ে যখন বাসায় এতো এতো জিনিস কিনে নিয়ে গেলাম, সেদিনের কথা মৃত্যুর পরও ভোলা সম্ভব হচ্ছে না ।

মা,ভাই আর আমি তিনজন মিলে জড়িয়ে ধরে কান্না করেছিলাম ,অনেক দিনের জমানো সুখের কান্না । আর হিমেলকে একটা ঘড়ি কিনে দিয়েছিলাম । হিমেল আমার ভালোবাসা । ও আমায় পাগলের মতো ভালোবাসে । আমার মৃত্যুর খবর ওর সইবে না ।

সবাই হয়তো জানবে আমি নিখোঁজ । মৃত্যুর পর কষ্ট অনুভব হয় না মনে হয় । চোখে পানি আসছে নাতো !!

আজ আমি অফিস করে বাসায় ফিরতে ফিরতে একটু রাত করেছি । ৮ টা বাজে … ।বাসে আমি একা মেয়ে ছিলাম । আজ মানুষজন কম ছিল । বাইরে ঝুম বৃষ্টি … ।চোখটা হটাৎ লেগে আসছিল । কিছু বোঝার আগেই দেখলাম ৭/৮ জন পুরুষ আমায় জাপরে ধরছে । শরীর ছিড়ে খেতে খেতে অট্টহাসি দিচ্ছে । বাস থেকে নামিয়ে কোথায় একটা ঝুপড়ি মতন ঘরে নিয়ে গেল আমায় ।আমি চিৎকার করতে চেষ্টা করলাম ,পারলাম না। আমার মুখ চেপে ধরে রাখা হয়েছে । ততক্ষণে শরীরের সব মাংস খেয়ে নিল নরপশু গুলো ।

আমি রিনি…আমি এখন মৃত … ।
আমি এখনও ভেবেই চলেছি … দোষটা কি আমারই ছিল ??? রাত করে বাসে উঠে বাসায় ফেরা ???

এ সমাজে পুরুষের দোষ কম । হয়তো কেউ আমার মৃত্যুর খবর জানলেও বলবে ,”চাকরি করে এতো রাতে একা বাসে করে ফেরার দরকারটা কি ছিল শুনি??? মরবে না তো কি করবে ??? ”

হে পৃথিবী … তুমি আমাকে নিখোঁজ রেখো …