অনুরণন

মানব শিশু

দিলু ভাই দাঁড়িয়ে আছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। হাতে একটা বস্তা! বস্তায় শিশু! মানব শিশু!! তার কাঁধে একটা গুরুদায়িত্ব। বস্তাটা আজ রাতেই নদীতে ফেলে দিতে হবে। প্রবল ঝড়ে শীতলক্ষ্যার কালো কুচকুচে পানি ফুঁসে উঠেছে! নদী প্রবল স্রোতে একাকার। দিলু ভাই দেখলেন, এই স্রোতের মাঝে বস্তাটা ফেলে দিলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। দিলু ভাই বাচ্চার বাবাকে জানেন। দিলু ভাই বস্তাটা ফেলতে পারলেন না। শিশুটাকে বাড়ীতে নিয়ে আসলেন। সেই শিশু এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে!

গল্পটা এমন হতে পারতো কিন্তু হয় নি! দিলু ভাই সেদিন বাচ্চাটাকে
বস্তাবন্দী করে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। তার কোমল হাতের আঙুল, চোখ, নাক হয়তো মাছে ঠুকরে ছিঁড়ে খেয়েছিলো কিম্বা বিষাক্ত পানিতে পঁচেগলে গিয়েছিল!!

২.
টং দোকানে বসে চা খাচ্ছি। এক বন্ধু হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বলতেছে, ‘ওর সাথে আজ ভীষণ ঝগড়া হইছে।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি নিয়ে ঝগড়া হলো?’ ‘ছেলের নাম ঠিক করা নিয়ে! ও বলতেছে ছেলের নাম হবে “শৈশব”. আচ্ছা কোন ছেলের নাম ‘শৈশব’ হয় বল?’ জিজ্ঞেস করলাম ‘তোরা বিয়ে করলি কবে? আর ছেলেই বা হলো কবে?’ বন্ধু এবার লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করতেছে। আবার বললাম, ‘বিয়ের আগেই কি তাহলে বাবা হচ্ছিস?’ বন্ধু এবার চেতে উঠলো। বলল, ‘কি যা তা বলছিস!’ সেই ‘যা তা’ আমার বন্ধু ঠিকই করেছিলো। একদিন এসেছিলো এবোরশনের জন্য ভালো হসপিটালের খোঁজ খবর নিতে। প্যারাডক্স কাহাকে বলে!!

৩.
প্রেম করেছেন কিন্তু কল্পনায় ছেলেমেয়ের নাম রাখেন নি এমন প্রেমিক যুগল খুঁজে পাওয়া দূস্কর। কল্পনার সেই স্বর্গচ্যুতি ঘটতে খুব একটা সময় লাগে না। স্বর্গচ্যুতি ঘটে যখন কল্পনা পৃথিবীতে নেমে আসে। কল্পনার সেই ছেলেমেয়ে ঠেকাতে একজন আইপিল, এমকন খেতে ব্যস্ত আর একজন খাওয়ানোতে! আর যখন পিল বা এবোরশনে কাজ হয় না, পৃথিবীতে এসেই পড়ে তখন তাদের অবস্থান হয় ডাস্টবিন কিংবা খরস্রোতা নদীতে!

৪.
প্রায়শঃই নবজাতকের লাশ উদ্ধারের খবর শুনি। এসব খবর শুনে সদ্য যুবক হওয়া আমার মধ্যে পিতৃসত্ত্বা জেগে ওঠে। এসব নবজাতকেরও হয়তো খুব সুন্দর সুন্দর নাম রাখা হয়েছিল। একটু বড় হতেই তারা বাবার কনিষ্ঠা আঙ্গুলটি ধরে ধরে হাঁটা শিখতো।কাদামাটি মুখে দিলে দূর থেকে মা বলতো, ‘ছিঃ বাবা! গালে দেয় না!’ দুর্বোধ্য শব্দে বাবাকে ডাকতো। কিন্তু হায়! বৈধ আর অবৈধ এর তফাৎ বোঝার আগেই জীবন ঝরে গেলো!!

যদি স্বর্গ থেকে কোনদিন সে চিৎকার করে জানতে চায় তার মৃত্যুর কারণ কি ছিলো, কি জবাব দিবে হে পৃথিবী?! আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়। জানতে ইচ্ছে হয়, যদি পরজন্মে দুধ দাত বের করে নিষ্পাপ হাসি হেসে অযুত পাপী বাবা-মাকে খুঁজে তখন তোমরা কোথায় মুখ লুকাবে!?! কি বলবে তাদের? তোমাদের কাছে যদি কখনও তারা প্রশ্ন করে তাহলে দুফোঁটা চোখের জল ফেলে বলে দিও, ‘এই পৃথিবী সবই সয় শুধু হতভাগ্যদের ছাড়া!’ এই পৃথিবীতে তাদের কেউ কোথাও নেই। নশ্বর পৃথিবীর ঈশ্বরও তাদের সাথে নেই! কেউ নেই তাদের!!

তালহা মাহমুদ অভীক
তেরো ই জৈষ্ঠ্য চৌদ্দশো ছাব্বিশ