মুক্তধারা

বাঙ্গালীর রোজা(র্দু)ভাবনা

ডিশটিং মৌরীঃপ্রথম রোজার দিন আমার এক সহকর্মী, ফারিয়া (কাল্পনিক নাম) এসে বললো সে এবার কোনো রোজা রাখবে না। খুব ভালো কথা। এদিকে আমার আরেক পুরুষ সহকর্মী আছে, মামুন যে কিনা সবসময় খোঁজ নিয়ে বেড়ায় কে রোজা রাখলো, কে রাখলো না। এখন, মামুন যখন জানতে পারলো যে ফারিয়া রোজা রাখছে না, ব্যাপারটা সে কোনোমতেই হজম করতে পারলো না। প্রথমে মামুন ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক বোঝালেন। নাহ্, ধোপে টিকলো না। তারপর বলতে লাগলেন, “তাহলে অন্তত নেইল পলিশ লাগায়েন না, সবাই মনে করবে রোজা আছেন”। কাহিনী যদি এখানেই শেষ হতো, তাহলে আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম ব্যাপারটাকে। পরেরদিন মামুন সক্কালবেলা অফিসে এসে ফারিয়াকে ফোন দিয়ে বললেন, “ফারিয়া, গতকাল রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি আমি আপনাকে বলছি আপনি যেন রোজা রাখেন। এইজন্য আজ এসেই ফোন দিলাম এটা বলার জন্য। আগড়ম বাগড়ম আগড়ম বাগড়ম”।

আমরা বাঙ্গালীরা কখনো শিখলাম না যে আমাদের সীমা কতদূর। আমাদের স্থান কোথায়। কোনটা নিয়ে আমাদের মন্তব্য করার অধিকার আছে, কোনটা নিয়ে আমাদের চর্চা করা শোভা পায়, কি পায় না। প্রথমত, আমরা রোজা রাখি আমাদের সৃষ্টিকর্তার জন্য যার হিসাব শুধু সেঁই রাখেন, যার হিসাব আমরা তাঁকেই সরাসরি দেই। পুরো ব্যাপারটা হলো আমার আর আমার সৃষ্টিকর্তার মধ্যকার বিষয়। এখানে অন্য কোনো তৃতীয়ব্যক্তির নাক গোলানোর অধিকার, এক্তিয়ার কোনোটাই নেই। নারীপুরুষনির্বিশেষে, কাউকেই আমার এটা জিজ্ঞেস করার কোনো অধিকার নেই যে সে রোজদার কি না। এটা আমার জানার বিষয় নয়। সেখানে আমরা প্রতিনিয়ত একজন আরেকজনকে খুচিঁয়ে জিজ্ঞেস করি, “রোজা আছেন?” কেন রে ভাই, আমি রোজা আছি কি না, এটা জেনে তোমার কি লাভ, তুমি কি আমার সওয়াবের ভাগ চাও, নাকি চাইলেও তুমি পাবা?!

দ্বিতীয়ত, আমার পুরুষ সহকর্মী অনুরোধ করলেন ফারিয়া যেন নেইল পলিশ না দেয়, নাহলে সবাই যে জেনে যাবে! তো! জানলে! কি হবে! তোমার তাতে কি! যারঁ জন্য রাখা সেইঁ যেখানে জানেন, তাহলে অন্যের কাছে মিথ্যা অভিনয় করে কি পূণ্য হবে! যাঁকে ভয় পেয়ে আমার রাখার কথা ছিলো, তাঁকে ভয় না পেয়ে আমি তাঁর নগণ্য বান্দাকে ভয় পেয়ে সেই বান্দার কাছে অভিনয় করছি! সেই বান্দার ভ্রূক্ষেপকে বেশি মূল্য দিচ্ছি! সেই বান্দার মতামতকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি! বলার আগে কেউ এটা চিন্তা করে না, এই মিথ্যাচার করে আমি কাঁর উপরে কাকে স্থান দিচ্ছি!

এবার আসি সেই স্বপ্নেপ্রাপ্ত দৈবাদেশে। বেচারা মামুন ফারিয়ার ‘বে-দ্বীনি’ অবস্থায় এতোটাই কাতর যে, সে সাবকনশাস মনেও এটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যায় এবং স্বপ্নালোকে আদেশ পায় ফারিয়াকে পথে আনার, তাকে দ্বীনের বাণী শোনানোর। মামুন পরেরদিন বড়ো আশা নিয়ে ফারিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল ফারিয়া রোজা রেখেছে কি না। বেচারা মামুনের বড়ো আশা ছিল, এতো বিশাল তাৎপর্যপূর্ণ দৈববাণী শোনার পর ফারিয়া নিশ্চয় দ্বীনের পথে ফিরে আসবে! কিন্তু, হায় ফারিয়া! ধর্মে তার মতি ফিরলো না!

আর সবাই হয়তো রে রে করে কলরব তুলবে, একজন পুরুষ হয়ে সে কোন সাহসে একজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করে সে রোজা আছে কি না। কতো বড় অভব্য! আমি বলবো, একজন পুরুষের একজন মহিলাকে এটা জিজ্ঞেস করা অভব্যতা নয়। কোন ব্যক্তির অন্য কোন ব্যক্তিকে রোজাসংক্রান্ত প্রশ্ন করাটাই হলো অভব্যতা। এইসমস্ত কর্মকান্ডের উপযুক্ত নাম হলো, রোজা-shaming. শব্দটা হয়তো রাবা খানের মতো বাংলিশ হয়ে গেল কিন্তু এর চাইতে যথাযথ আর কিছু খুজেঁ পেলাম না। এইদেশের প্রতিটা মানুষ ছোটকাল থেকে পরিবারের কাছ থেকে ধর্মের কথা শুনে বড় হয়। হুজুরের কাছে জানতে পারে। স্কুলে আরো ১০ বছর ধর্ম জ্ঞান পায়। এহেন ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে গায়ে পড়ে এসে ধর্মশিক্ষা দিতে আসা মানে এতোদিনের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয়শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাকে রোজা-shamingকরা। তাকে বারবার খুচাঁনো, খুচিঁয়ে খুচিঁয়ে তার মধ্যে একধরণের মানসিক অস্বস্তি ও চাপ সৃষ্টি করে তাকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারলেই তবে ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। বাঙ্গালী পারছে না শুধু সেপটা উনেলাকে ঘন্টিসহ পিছনে লেলিয়ে দিতে ‘shame, shame’ বলার জন্য (গেম অব থ্রোনস রেফারেন্স)।

আগেকার দিনের মানুষরা বেশ ছিলো! নিরবে-নিভৃতে নিজনিজ ধর্মপালন করতো। সেসময়ের যতো মানুষের সাথে আজপর্যন্ত পরিচয় হয়েছে, তাদেরকে কখনো শুনি নি ধর্মপালনের ফিরিস্তি দিয়ে বেড়াতে। আর মানুষ এখন নিজের বাদ দিয়ে বাকি সবার আমলনামায় উকিঁঝুকিঁ মারতে ব্যস্ত। ধর্মপালন হয়ে গেছে অন্যের চোখে নিজেকে ধার্মিক প্রতিষ্ঠা করার রাস্তা। কারণ, তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রমাণ হবে সে সবার চাইতে কতো উচুঁতে বাস করে, একধরণের আত্মঅহমিকার চাদর দিয়ে নিজেকে সে জড়াতে পারবে। সৃষ্টিকর্তার কৃপা পাওয়ার ইচ্ছা এখন আর একমাত্র কারণ নয়। যা ছিলো সৃষ্টিকর্তা আর বান্দার মধ্যকার একান্ত ব্যাপার, তা এখন হয়ে গেছে অন্যসবার মাথাব্যথা।