মুক্তধারা

মরিচ বাতি

সুস্মিতা জাফরঃ ছোটবেলা থেকেই মরিচ বাতি খুব পছন্দ আমার। বিয়ে বাড়ি মানেই হল লাল-নীল, সবুজ-হলুদ মরিচ বাতির মেলা। আমার বয়স যখন ৫, ফকিরাপুলে আমাদের বিল্ডিং টা সাজানো হল এই রঙ বেরং এর জাদুর প্রদীপ গুলো দিয়ে। কার যে বিয়ে হচ্ছিল, ঠিক মনে নেই হয়তো কমলের ছোট খালামনির। কমলের ছোট খালামনি বলতে আমরা ছিলাম অজ্ঞান, তাই ই হবে হয়তো, ওটা ছিল ছোট খালামনির বিয়ে! কী যে আনন্দ তখন আমার মনে— আমাদের চিপা বারান্দাটায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসেই থাকতাম আর বসেই থাকতাম, হাত বাড়িয়ে লাল-নীল আলো গুলো ধরতে চাইতাম। এই তিড়িং বিড়িং করে সবুজ বাতি জ্বলছে তো ওই আবার লালটা জ্বলে উঠল! আচ্ছা বাতিগুলো জ্বলে আর নেভে কেন? কোত্থেকে সুইচের লাইন দেয়া হচ্ছে? কেই বা অমন মজা করে জ্বালায় আর নেভায়? আহা, আমি যদি ওরকম জ্বালাতে-নেভাতে পারতাম! এমন কত আজগুবি প্রশ্ন যে মাথায় ঘুরপাক খেত! এভাবেই কেটে গেল বিয়ের রাত টা। আর তারপর আমাদের সেই চিপা বারান্দাটা আবার যে কে সেই একদম সাধারণ একটা চিপা বারান্দা বনে গেল পরদিন সকালে।

এরও অনেক পর, আমাদের নিজের ৬ তলা বাড়িই একদিন সাজানো হল এরকম ঝিলমিল ঝিলমিল রঙিন বাতি দিয়ে। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। পাড়ার অতি উৎসাহী আন্টিরা দল বেধে আম্মুকে টি এন্ড টি ফোনে কল দিয়ে বলতে লাগল, কী ভাবী, এই বয়সেই বড় কন্যার বিবাহ সেরে ফেলছেন বুঝি! সেই কথা শুনে আমরা মা-মেয়ে হেসেই কুটি কুটি। কেননা, বিয়েটা আমার কিংবা আমার ছোট বোন কারুরই ছিল না৷ বিয়েটা ছিল ৬ তলার ভাড়াটিয়ার। তার ভারী শখ বিয়েতে সারা বাড়ি সাজাবে,,,, সত্যি বলতে ছোটবেলা থেকে আমারও এমন শখ কম ছিল না। ওই ফকিরাপুলের বাসার বারান্দায় দাড়িয়ে ৫ বছরের ছোট্ট কিন্তু পাকনা আমি ঠিকই মনে মনে ভাবতাম— ইশ, কবে যে বড় হব আর কবে যে বিয়ে করব,,,,,আর কবে যে আমার ঘরের বারান্দা খানাও এমন রঙ বেরং এর আলোর জৌলুসে উল্লসিত হয়ে উঠবে!!!

একটা সময় বড় হলাম, বিয়েও আয়োজন করে করা হল। ডেকোরেশান এর লোক ডেকে বসার ঘরে বসে আম্মুই প্ল্যান করছিল, তার বড় কন্যার বিবাহে বিল্ডিং এর কোন পাশে কোন রঙ এর মরিচ বাতি ঝোলানো হবে। উত্তর দিকে সবুজ, তাহলে পশ্চিমে কিন্তু সোনালি,,,, দক্ষিণে যদি রুপালী হয়, তাহলে পূর্বে কিন্তু গাড় নীল,,,,, এভাবেই বাড়ির প্রতিটা ইঞ্চি রঙিন আলোয় মুড়িয়ে দেয়ার ভাবনা চিন্তা হচ্ছিল খুব করে। কিন্তু বিয়ের ৪ দিন আগে এক আজব ফোন কলে সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। কয়েক রাত ধরে সাজানো আলোর মিছিল যেন কয়েক মুহূর্তের মাঝে নাকচ করে দেয়া হল! ২৫ বছর ধরে তিল তিল করে জমানো শখ– নিজের বিয়েতে নিজ বারান্দায় ঝিলমিল আলোর বন্যায় ভেসে যেতে চাওয়ার তরুণীর ইচ্ছে বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে গেল। যত যা ই হোক, অনেক প্ল্যান প্রোগ্রাম করে অবশেষে ঠিক হল, বাড়ি নয়, তবে বাড়ির ছাদ সাজানো হবে লাল-নীল মরিচ বাতির চাদরে— আর হলও তাই।

এখন তাই ছোটখাটো করে নিজের সেই ছোট্টবেলার জমিয়ে রাখা শখ পূরণ করি, মরিচ বাতির পরিবর্তে ফেইরী লাইট দিয়ে। এখন ইচ্ছে করলেই নিজের ঘর, নিজের চিপা অতি সাধারণ বারান্দা, নিজের সবুজ বাগানটাও সাজিয়ে নেয়া যায় এই ঝিলমিল আলোর কারসাজিতে।