মুক্তধারা

আমার বাবা একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ

সুস্মিতা জাফরঃ সবসময়ই মনে হয় আমার বাবা একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ…… যার বেশির ভাগ স্বপ্ন তার বড় সন্তান– তার বড় মেয়েকে ঘিরে… । আম্মুকে দিনের অনেকটা সময় কাটাতে হত দেড় বছরের ছোট বোন শতরুপা কে নিয়ে, আর তাই আমি বড় হতে লাগলাম আমার আব্বুর শক্ত হাতটা ধরে। খুব ছোটবেলায়, তখন ধামরাই এর কলোনীতে থাকতাম, মাত্র আড়াই কি তিন বছর বয়স আমার, প্রতিদিন সকালের শুরুটা হইত আব্বুর সাথে মাঠে খেলা করে কিংবা বাইকে আব্বুর সামনে বসে পুরো কলোনীটা চক্কর মেরে। ধামরাইয়ে কিছুদিন পর পরই মেলা বসতো অথবা থিয়েটার এ নাটক, জাদু, গানের আসর—- কিছু বুঝতাম কিনা জানি না, পরে আব্বুর কাছে শুনছি আমাকে যেভাবে বসায় রাখা হত ঠিক এক মনে বসে অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করতাম … আমার শুধু মনে আছে সব কিছুতে, সব অনুষ্ঠানেই আব্বুর সঙ্গী হওয়া ছিল আমার সব চেয়ে বড় শখ! সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলে আব্বুর কোলে উঠে মাঠে চলে যেতাম, হলুদ ল্যাম্প পোস্টের আলোয় হাজারো ঝিঁ ঝিঁ পোকার উড়াউড়ি কিংবা থপ থপ শব্দে আব্বুর পা এর নিচ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া ভীতু ব্যাঙ গুলোকে অবাক চোখে তাকায় তাকায় দেখতাম! রাতের অন্ধকারে আম্মু যখন বোনকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান গাইতো, আমি তখন বারান্দায় বসে আব্বুর কোলে লুঙ্গিকে দোলনা বানায় নিশ্চিন্তে ঝুলতে ঝুলতে আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার দিকে তাকায় থাকতাম আর মুগ্ধ হয়ে আব্বুর হেড়ে গলায় গান শুনতাম— ‘আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে”! শীতের ভোরে আব্বুর কাঁধে চরে চার বছর বয়সে প্রথম যেদিন ধানমন্ডি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হলাম, ক্লাস ওয়ানে প্রথম যেদিন ভিকারুন নিসায় পা রাখলাম, যেদিন প্রথম গান শেখার জন্য লাল-সবুজ পোশাক পরে ‘শিশু একাডেমি’ তে এলাম, প্রথম যেদিন বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গেলাম কিংবা যেদিন মেডিকেল এডমিশন টেস্ট দিতে কলা ভবনে গেলাম— প্রতিটা দিনই শুরু হইছিল আব্বুর হাত ধরে! পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েই দেখতে পাইতাম সবার সামনে অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে এক বুক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গেটের কাছে দাঁড়ায় আছে আব্বু!

এখনও অনেকদিন পরে যখন ঢাকা যাই, তখন বাস থামার বেশ আগে জানালা দিয়েই দেখতে পাই পরম আগ্রহে আব্বু বাসের ঠিক সামনের দরজার কাছে দাঁড়ায় আছে– একেক সময় বাস একেক জায়গায় থামে, অথচ কীভাবে কীভাবে যেন প্রতিবারই আমি পৌঁছানোর আগেই নির্দিষ্ট বাসটার সামনে আব্বুর স্বপ্নালু হাসি মুখটা দেখতে পাই!