অনুরণন

একটি মেয়ের পোশাক

কলেজ থেকে বান্ধুবীরা সব পিকনিকে যাবে অবশ্য প্রিয় ফ্রেন্ডরা যাচ্ছে না তবুও মানহা ঠিক করল সে পিকনিকে যাবে এই প্রথম সে বাইরের পিকনিকে যাচ্ছে তাই মনটা তার ভীষণ আনন্দ সে কোন ড্রেস পরবে কিভাবে সাজবে অনেক মজা করবে সব ভেবে রাখল।

পিকনিকের দিন বাসা থেকে বের হবে অমনি বাবা রাগারাগি শুরু করে দিলেন মা বললেন আজ কেন বোরকা পরোনি যাও বোরকা পরে যাও।
মানহা খুব বিরক্ত হয়ে বোরকা পরে বেরিয়ে পরলো তারপর পিকনিকে গিয়ে বোরকা ব্যাগে রেখে সবার সাথে আনন্দ করলো ।মনে মনে ভাবলো শখের বশে বোরকা নিয়েছি ক্লাস সিক্সে । বোরকা পরলে যে বোরকা ছাড়া বাইরে যাওয়া যাবে না এটাতো তাকে বলা হয় নি। এছাড়াও ঈদের দিন সাজুগুজু করে ঘুরতে বের হলে তাকে তো বোরকা নিয়ে কোন কথা বলা হয় নি । আবার ছোটবেলা থেকে পর্দায় চলাফেরা করে এমনটা তাকে অভ্যস্তও করা হয় নি।
পিকনিকের দিন একটু হলেও মানহার মন খারাপ হয়েছিলো শুধু শুধু রাগারাগি করছিলো এতে মানহার কি দোষ।

মানহা এখন তালিম যাওয়া শুরু করেছে হাদিস কোরআন এসব নিয়ে আলোচনা শুনতে ওর মনটা আনন্দে ভরে যায় মনে এক অন্যরকম শান্তি বিরাজ করে তাই সে পর্দার ব্যাপারে অনেক সিরিয়াস হচ্ছিলো। ভাবছিলো সে আর মুখটা পরপুরুষকে দেখাবে না। পর্দায় হাদিসের নিয়ম অনুযায়ী সে সব মেনে চলবে। সে পর্দা এভাবে শুরুও করে দিয়েছিলো।

কিন্তু ক্লাসে জানতে পারলো মুখে নেকাব পরে ক্লাস করলে স্যার বকবে। স্যারের যুক্তি ওনারা পিতামাতার সমতুল্য তাই মুখে নেকাব পরা আমাদের নাকি বেয়াদবি। তাই সে নেকাব ছাড়া ক্লাস করলো।

কলেজে পরিবেশ অনুযায়ী কখনও মুখে নেকাব লাগিয়ে রাখতো কখনও খুলে রাখতো। চাইলেও সব সময় নেকাব লাগিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে মানহার বড্ড বিরক্ত লাগে। পরে শুধু বাইরে নেকাব পরতো আর বাসা ক্লাসে কলেজে নেকাব ছাড়া থাকতো।

কিছুদিন পর শুরু হল পরীক্ষার হলে বোরকা পরায় বেশ কড়াকড়ি নকলের সন্দেহ। ভেবেচিন্তে পরীক্ষার দিন করে বোরকা পরতো না।
এবার হল আরেক জ্বালা ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে মানহাকে বলা হল মাথায় কাপড় না দিতে হাটুর সমান চুল যেনো বুঝতে পারে এমনভাবে মাথা বাঁধতে। হঠাৎ করে অন্যদের সামনে মাথার কাপড় খুলতে মানহার অস্বস্তি হচ্ছিলো কারণ ওর মাথায় কাপড় দেয়া অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু কি আর করার বাসার আদেশ শুনতেই হবে।

নিজের মত করে পর্দা করতে চাইলেও সে যেনো কিছুতেই তা পেরে উঠছে না।

চাকুরীর সন্ধানে নতুন জায়গায় এল নতুন পরিবেশ নতুন শহর। মানহা বুঝতে পারছে না যা তার সাথে কখনও হয়নি তা এখানে হচ্ছে কেন? রিকশা ভাড়া করতে গিয়ে মনে হচ্ছে রিকশাওয়ালা ভাব জমিয়ে ফেলতে চায়। অস্বস্তি হয়ে সামনে চলতে গিয়ে দেখে ইচ্ছে করেই কেউ না কেউ তাকে ধাক্কা দিচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না মানহা ভাবছে এমনতো তার সাথে কখনও হয়নি। আশেপাশে খেয়াল করে মনে হলো নেকাব প্রবলেম হচ্ছে কিনা। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেকাব ছাড়া বাইরে বোরকা পরা শুরু করলো।

হুমম সত্যিই তো আজকে তেমন প্রবলেম হচ্ছে না। তাহলে নেকাবের কি দোষ? মানহা ভাবলো কি জানি কি নেকাব ছাড়া তো অস্বস্তি হচ্ছে না তাই এ নিয়ে মানহা আর মাথাব্যাথা করে নি।

কাজের প্রয়োজনে অনেক সময় বাসায় ফিরতে লেট হয় সন্ধ্যার পর হলে মানহার কাছে সব প্রবলেম মনে হচ্ছে। সে হাঁটছে বা রিকশায় তখন আশেপাশে যদি দশজন থাকে দশজনই তার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ ভাবে তাকায় ভাবখানা এমন সন্ধ্যার পর তার বাইরে থাকাটায় কিছু একটা হয়েছে। এ নিয়ে মানহা মাথাব্যাথা করে নি সে তার মতই চলছিলো।

চাকুরীর প্রয়োজনে ইন্টারভিউতে নাকি বোরকায় নেগেটিভ ইমেজ আছে তাই নাকি চাকুরী পাওয়া বড় মুশকিল হয়ে যাবে ( অবশ্য সব সময় নয় )। যাক বাবা পর্দায় পরিবেশ পাওয়া এত্ত ঝামেলা ওহহহ এত ঝামেলা হলে পর্দা করে শান্তি নেই। নিজের মত করে চলবো তার কোন উপায় নেই।

মানহা এবার বড্ড বিরক্ত। আবার বোরকা ছেড়ে সে ইন্টারভিউ দিতে গেলো। সেদিন তার কাছে আশেপাশের পরিবেশ অন্যদিনের তুলনায় বেশ স্বাভাবিক লাগলো তবে বোরকা ছেড়ে আসার জন্য মনটা খারাপ ছিলো। সবকিছু স্বাভাবিক লাগায় বেশ স্বস্তিবোধ হচ্ছিলো অনেক ভেবেচিন্তে সে বোরকা ছেড়ে দিলো। এবার তার কাছে আর কোন প্রবলেম লাগছে না । কিছু প্রবলেম থাকলেও তুলনামূলক ভাবে কম।

অনেক চেষ্টায় মানহার একটা চাকুরী হলো সেখানে রুলস আছে হিজাব পরে থাকতে হবে। মানহা ভেবে পাচ্ছিলো না ভাগ্য তার সাথে এমনটা কেনো করছে। চাকুরীর প্রয়োজনে অফিসে সে হিজাব পরেই থাকলো অবশ্য বাকি সময় হিজাব ছাড়াই পোশাক মেইটটেইন করলো।

এতে তার কিছু অভিজ্ঞতা যোগ হল কখনো পরিবেশ এমন হয় হিজাবের কারণে তাকে সন্মান দেয়া হচ্ছে আবার কখনো হিজাবের কারণে তাকে ক্ষ্যাত ভাবা হচ্ছে। কখনো অতিরিক্ত সাজুগুজু অবস্থায় সেদিন তার মনে হচ্ছে ইভটিজিং বেশি আবার কখনো অনেক বেশি আশেপাশে সাইল্যান্ট।

একেক বার একেক রকম আচরণের একটিই কারণ আশেপাশে একেক ধরনের মানুষ থাকে সেই মানুষগুলোর মাঝে কিছু মানুষ মানুষ আবার কিছু মানুষ অমানুষ।
এটা সত্যি ধর্মীয়ভাবে মুসলিম নারীদের পর্দা করা উচিত। এতে সমাধান পারফেক্ট। এরপরের বিষয়ে কোন কমেন্ট করার যোগ্যতা আমার নেই। আমি আমার জানাশোনায় কিছু গল্প বললাম আর কি।

ও হ্যাঁ মানহার আরও একটা গল্প বলা বাকি রয়ে গেছে। অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলো সেদিন প্রচন্ড গরম আবার লোকাল বাসে বুঝতেই পারছেন। গরমে মানহার খুব অসুস্থ লাগছিলো তাই সে হিজাব খুলে ব্যাগে রেখে বেশ আরামবোধ হচ্ছিলো।

একটু পরে খেয়াল করলো বাসের লোক সবাই তার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে বুঝতে পারলো না লোকাল বাসে গিজগিজ মানুষ গিজগিজ সাউন্ড সম্পূর্ণই সাইল্যান্ট!

মানহার যে অসুস্থবোধ করছিলো এটা বাইরে থেকে বোধহয় কেউ বুঝতে পারে নি । বাস থেকে নামতে সবাই এমনভাবে সাইড দিচ্ছিলো যেনো মানহা ভয়ংকর কিছু।

লিখেছেন: জিলফিকা জুঁই।