অনুরণন

পরিণতি

দিবাস্বপ্ন:সিগারেটের লম্বা টান দিয়ে অশুদ্ধ ধোঁয়া বিশুদ্ধ বাতাসে বিসর্জন দিচ্ছি। এতো সুন্দর শহরের বাতাসকে কুলসিত করতে দারুন লাগছে। কলেজ জীবন থেকেই বহু কিছু কুলসিত করে অভ্যেস। নতুন নতুন সুন্দরী ফুল আমার পছন্দ। আর এতো প্রকৃতি মাত্র। এতো আর বাসায় এসে ঠোঁট নাড়িয়ে ঝামেলা করতে আসবে না। হাত নেড়ে অভিশাপ দিবে না। তবে হা। প্রকৃতি বিরূপ হলে তার ফল সবাইকে ভোগ করতে হয়। আর অপরাধী আমি একা নই। কোটি কোটি মানুষ সিগারেট খায়। এটা ছোট অপরাধ।

জানালার কাচ ভেদ করে বিশাল সমুদ্রের ঘোলা জলরাশির শান্ত ঢেউ পূর্বের অনেক কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ঠিক পেছনে নগ্ন দেহী অপ্সরী। নাম জানা নেই। প্রয়োজনও নেই জানার। তবে আজকে অদ্ভুত ব্যপার হলো নামটা জানার খুব ইচ্ছা হচ্ছে।
বিলাসবহুল হোটেলের কামরায় পঞ্চাশোর্ধ একজন উচ্চবিত্ত ব্যক্তি নিজের থেকে প্রায় অর্ধ বয়সী হাই পেইড সুন্দরী নিয়ে রাত্রি যাপন করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। নতুনও নয়।

মেয়েটার শরীরে দামী পারফিউমের আড়ালে লুকিয়ে আছে পুরোনো একজনের সৌরভ। এমন একটা সুগন্ধ যার ছোঁয়া নাকে এসে লাগতেই আরো একবার উদ্দাম খেলায় মেতে উঠার ইচ্ছা জাগে। ঠিক যেন কলকাতার সেই বিখ্যাত নায়িকা যাকে একবার দেখলেই ছোট বয়সেই অজানা অনুভূতির সৃষ্টি হতো। এই মেয়েটাও সেই রকম। দুজন ভিন্ন মানুষের মেল বন্ধন এই মেয়ের মাঝে।

আর একবার ঘুমন্ত মেয়েটির শরীরের উপর থেকে চাদর সড়িয়ে পরখ করলাম। হা সত্যিই ঐ নায়িকার মত। সরু ফর্সা গ্রীবাদেশের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ শুকে ভাবছি, এইতো সেই পরিচিত মানুষটা। আবার কাম পরশে জাগিয়ে তোলার ইচ্ছা জাগলো। কিন্তু মেয়েটা যদি রেগে যায়? অথবা অন্য কোন ঝামেলা করে? ঘরের বউ তো নয়, টাকায় কেনা শরীরকে নিজের করে ভাবা যায় না। যাবার আগে মেয়েটি তার পরিচয় দিয়েছিল নীরা নামেই।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অদ্ভুতভাবে। আমার মুগ্ধতা তখনও ভাঙ্গেনি। মুখে মেয়েটি হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, শুভ সকাল। এমনভাবে বলল মনেই হলো না সে একজন কলগার্ল। সোজা বাংলায় পতিতা। মনে হলো সদ্য বিয়ে করা স্বামীর সাথে হানিমুনে আসা মেয়েটি। বিয়ের প্রথমদিকের শামীমার তরুনী মুখটি মনে পড়ে গেল। মোবাইল হাতে নিয়ে শুয়ে শুয়ে কি যেন করলো কিছুক্ষণ। তারপর শরীরের উপর থেকে চাদর সরিয়ে উঠে দাড়িয়ে ব্যাগ থেকে একটা সিগারেট ধরালো। অপূর্ব শরীরী ভাষা। নগ্নদেহে সিগারেট খাচ্ছে একটি মেয়ে। বাংলাদেশী কোন মেয়েকে কোনদিনই এমনভাবে দেখা হয়নি আমার।
প্রায় দুমাস পর বড় মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠানে আবার দেখা হলো নীরার সঙ্গে। এতো ভীড়ের মাঝে আমাকে খুঁজে পেতে তার বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না। প্রথমে ভাবলাম না চেনার ভান করবে। কিন্তু মেয়েটির সাহস দেখে অবাক হলাম। মুখে আবার সেই হাসি নিয়ে কাছে এসে বলল, আশ্চর্য আপনার সাথে আবার এখানে দেখা হবে ভাবিনি। মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয় বলাতেই হাসিতে পরিবেশ আরো গম গম করে তুললো চারদিক। তারপর মোবাইল নম্বর আদান প্রদান।

একদিন দুপুরে ফোন দিয়ে লাঞ্চ করতে বের হলাম। এভাবে বহুবার কোন রেস্টুরেন্ট অথবা কোন হোটেলের কামরায় নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ চলছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় অথবা বিদেশে কোন ট্যুরে নীরা আমার নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠলো। নতুন কোন মেয়ের প্রতি আমার আগ্রহ শূন্যে নেমে এলো। এক বন্ধু বলে বসেছিল, তুমি তো বন্ধু বুড়ো বয়সে মেয়ের বয়সী মধুমক্ষীর প্রেমে পড়েছো। এক জিনিস এতোবার নাড়া দিতে তোমাকে দেখি নাই। এবারতো আমাকেও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করলে।
কথাটা বন্ধু ভুল বলেনি। শামীমার আড়ালে অনেক কিছু করে যাচ্ছি কিন্তু কখনও এতোটা ভয় পাইনি। মেয়েটার সাথে দেখা করার সময় মনে অসম্ভব ভয় কাজ করে। ঠিক যেমন স্কুল জীবনে সেই মেয়েটির সাথে প্রেম করতাম। দেখা করার জন্য মন আনচান, আর দেখা করার সময় চারদিকে ভয়ের দৃষ্টির খোঁজ। শামীমা বা ছেলেমেয়েদের কাছে ধরা পড়লে কি কি জবাব দিব তা আগেই নীরাকে বলে সাজিয়ে রেখেছি। এখন সাজিয়ে রাখা কথাগুলোকে ওদের ঠকানোর অস্ত্র মনে হয়। এতো বিবেকবান পুরুষ আমি ছিলাম না। তবে কি নীরার প্রতি টান এর মূল কারন?

নীরাকে এখন দেহপরীসিনী হিসেবে ভাবতে ভালো লাগে না। ওর যা দরকার আমিই মেটানো শুরু করেছিলাম। যত লাগে ততোই। নীরার মা জানতেন মেয়ে চাকরি করে। আমি আমার প্রতিষ্ঠানে নীরাকে ইচ্ছে করেই নিলাম না। আমি চাইনি ওকে নিয়ে মানুষ রসাত্মক আলোচনা করুক। নীরার কাজ হচ্ছে শুধু আমাকে ভালোবাসা। কাজটা যেহেতু নীরা শখে করতো তাই আমার ভালোবাসাই পারতো ঐপথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। আমি সফলও ছিলাম।
দুজনের ভালোবাসা তখন তুঙ্গে। নীরা তার মাকে আমাদের অসম ভালোবাসার কথা জানাতেই মহিলা নাকি খুব চটেছিলেন। কিন্তু নীরা বরাবরই মায়ের অবাধ্য। আমার সাথে ঘনিষ্ঠতা চালিয়ে যাওয়া ওনার মোটেও পছন্দ হলো না। না হবারই কথা। স্কুল শিক্ষিকা বিধমা মা অনেক কষ্টে মানুষ করেছে নীরাকে। ওদিকে আমার অবস্থাও করুন। নীরাকে ছাড়া ভাবার অবকাশ নেই আমার।

কথাটা ছড়াতে খুব বেশি সময় নিলো না। প্রথমে অফিস তারপর বাসা। বুড়ো বয়সে রেহান চৌধুরী কচি মেয়ের সাথে পরকীয়া করছে। শামীমা জানতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। আমি সাফ জানিয়ে দিলাম, “তুমি আমার স্ত্রী থাকবে, আমার সন্তানদের মা তুমি। কিন্তু আমি নীরাকেও ছাড়বো না। আমি ওকে বিয়ে করবো। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়েছো? তোমরা বাঙালি মেয়েরা আমাদের মত পুরুষের কষ্ট কবে বুঝবে বলো তো? গায়ে দামী শাড়ি জড়িয়ে কাপড়ের নিচটা তো পরিবর্তন করতে পারবা না।” আমার কথাগুলো মোটেই সহ্য করার মতো ছিল না। শামীমাও মেনে নিতে পারছিল না। চরম অপমানে সে তার ভাইয়ের বাসায় চলে গেল। তার পিছু পিছু আমার সন্তানরাও। তাদের এতো প্রিয় বাবা আজ তাদের সমস্ত পৃথিবীটাই বিস্বাদময় করে ফেলেছে।

মায়ের কষ্টে বেশি অনুভব করছিল হয়তো আমার মেয়েটা। ছেলে ছোট, অনেক কিছুই বুঝে না। মেয়েটা তো সবই বুঝে। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ব্যাচের একটি মেয়ে তার বাবার গার্লফ্রেন্ড। বন্ধুদের মাঝেও ছড়িয়ে গেল। লজ্জায় অপমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নীরার বাসার ঠিকানা নিয়ে সেই মত চলে গেল ওদের বাসায়। নীরার মাকে যাচ্ছেতাই বলে আসলো। ব্যাপারটা আমার মোটেও পছন্দ হলো না।

দুই তিনদিন পর অনাকাঙ্খিত বিচ্ছেদের চিঠিটা অফিসের ঠিকানায় এলো। আমি অবশ্যই চাইনি শামীমাকে ছেড়ে দিতে। কারন ও আমার স্ত্রী। আমার সন্তানদের মা। আমি শত মেয়ের স্বাদ নিলেও শমীমাকে বিয়ের আগে ছুয়েছি কিনা মনে পড়ে না। বিয়ের আগে হাত লাগানো মেয়ে বিয়ে করা যায় না। তবে নীরার ব্যাপার আলাদা। জীবনের বাকী দিনগুলোতে ওকে আমার পাশে চাই। ওর পেট থেকে তো আমার সন্তান কোনদিনই আসবে না। কারন ওর পেট থেকে ভালোকিছু আসবে বলে মনে হয় না আমার। পুরুষের বীর্য কুলসিত না, নারীর শরীরই কুলসিত হয়।

আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করলাম। আমার সন্তান এবং স্ত্রী কেউই আমাকে সুযোগ দিল না। ততোদিনে আমার বহু শয্যাসঙ্গীর অস্তিত্ব থাকার ব্যাপারটা জেনে গেল। পরিচিত বিশ্বাসী মানুষরাই হয়তো ব্যাপারটা ফাঁস করেছে। যাইহোক শামীমা যেহেতু নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তাহলে আমারও আর তার প্রয়োজন নেই। নীরাকে বিয়ের পরিকল্পনাটা দ্রুত করে নেয়া যাবে।

আমরা দুজন আনন্দিত ছিলাম। একসাথে থাকছি। শামীমা যাবার অল্পদিন পরেই নীরা বাসা থেকে রাগ করে বের হয়ে আমার কাছে চলে আসে। শামীমার দোষ দেয়া যায় না। নীরা আমার বাসায় থাকছে এটা মেনে নেয়া কোন মেয়ে মানুষের পক্ষে মানা সম্ভব না।
ডিভোর্সের খবর পেয়ে নীরার মার হয়তো মন গলেছিল। অথবা মেয়েকে অনেকদিন দূরে রেখে কষ্ট পাচ্ছিলেন। ডেকে পাঠালেন হবু মেয়ের জামাই আর মেয়েকে। সবকিছু উনি নিজেই ঠিক করে ফেলবেন বললেন। খুশি মনেই নীরাদের উত্তরার বাসায় গেলাম। নীরার মা কেমন, কিভাবে কথা বলবো ইত্যাদি সব বলে দিল নীরা। পিচ্চি মেয়ে তার বুড়ো প্রেমিককে ইমম্যাচুয়োর ভাবছে হয়তো।

এমন সময় নীরার মা সামনে এসে দাঁড়ালেন। নীরার মায়ের হাসিমুখ উবে গেল। বেশ জোরে ভেতর থেকে আমিও ধাক্কা খেলাম। মনে হচ্ছিল সহ্য করতে পারবো না। হার্ট আট্যাকারের সম্ভাবনা নাকি জানি না হালকা বুক ব্যথা শুরু হলো। এ যে মিনু! সেই নারায়নগঞ্জের মিনু! যাকে কোনভাবই বিছানায় নিতে পারছিলাম না। একদিন বন্ধু মোস্তফার সহায়তায় হুজুর বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। একমাস পর পালিয়ে মালয়েশিয়ায় একবছর ছিলাম। তারপরই দেশে ফিরে শামীমাকে বিয়ে করি। তাই কি প্রথমদিন আমি নীরার শরীরে মিনুরই অস্তিত্ব টের পেয়েছিলাম? হায় আল্লাহ! এ আমি কি করলাম! স্থির দৃষ্টিতে মিনু বললো, “নীরা এই তুমি কি করেছো? রেহান আহমেদ কি করলে এটা? নীরা আমাদের সন্তান! তুমি আমাকে আর আমাদের সন্তানকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলে?”