মুক্তধারা

যে মানুষটাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভুলভাবে জানা হয়েছে, ভুলভাবে মানা হয়েছে

যে মানুষটাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভুলভাবে জানা হয়েছে, ভুলভাবে মানা হয়েছে: আজকের গল্পটা সেই লোকটাকে নিয়ে। তিনি বাস করতেন প্রায় দুই হাজার বছর আগে। রোম সাম্রাজ্যের একজন নাগরিক ছিলেন । আগে বলে নেই বর্তমান পৃথিবীর প্রায় ২৪০ কোটি লোকের বিশ্বাস অনুসারে তিনি মৃত্যুর আগে কি ধরনের অত্যাচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেনঃ

প্রথমে তাকে চাবুক দিয়ে তীব্রভাবে প্রহার করা হয়েছিল[১]। আর চাবকানোর উপায়টা খুব ভয়ঙ্কর ছিল। চাবুকের জায়গায় জায়গায় অল্প ব্যবধানে কাটার মত একটা জিনিস থাকত, আর সেগুলোতে লোহার বল আর ভেড়ার তীক্ষ্ণ হাড় লাগানো থাকত[২]।
সৈন্যরা শরীরের পুরো শক্তি দিয়ে তার পিঠে এটা দিয়ে আঘাত করেছিল। প্রত্যেক আঘাতেই ভেড়ার হাড় গুলো মাংসের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছিল, আর শরীরের গভীরে তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে কঙ্কাল এর উপরের পেশীগুলো ছিড়ে গিয়েছিল, আর হাড়্গুলোতে ক্ষতের কারণে সারা শরীরে সাদা সাদা আঁশ বের হয়ে গিয়েছিল।
এই ধরনের চাবুকের চার-পাঁচটা আঘাতই যথেষ্ট কাউকে মারাত্নক আহত করতে। কিন্তু তৎকালীন আইন বলছে, লোকটা কম হলেও ৩৯টা চাবুকের আঘাত সহ্য করেছিল। তাই তার অবস্থা হয়ে গিয়েছিল খুবই গুরুতর।[৩]

অত্যাচারটা এখানে শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু কেবল তো শুরু হলো । লোকটার হাত এরপর প্রায় ষাট কেজি ওজনের কাঠের সাথে বেঁধে তাকে আসল জায়গায় তা নিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। গুরুতর আহত হবার কারণে এই ষাট কেজি ওজনের কাঠটি মাত্র ছয়শ ফুট দূরে তিনি নিয়ে যেতে পারছিলেন না। [৪]

সেখানে নিয়ে যাবার পর প্রথমে আড়াআড়িভাবে দুইটা কাঠ একত্রে গাঁথা হয় [যেটাকে আমরা ক্রুশ বলি]। একটি অনুভূমিকভাবে, আর একটা উলম্ব। অনুভূমিক কাঠের দুই প্রান্ত বরারর দুই হাত প্রসারিত করে কব্জি বরাবর প্রায় পাঁচ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের পেরেক গাঁথা হয়। তারপর উলম্ব কাঠে পায়ের পাতা দুইটি উপরে আর নীচে রেখে আরেকটি তীক্ষ্ণ পেরেক গাঁথা হয়, যেটি দুইটি পায়ের পাতা একসাথে ভেদ করে। [৫]
এরপর ক্রসটি উপরে উঠানো হয় রশি দিয়ে। সৈন্যরা একবার ক্রসটি উপরে উঠায়, আরেকবার নীচে। এর ফলে হাত আর পায়ে তীব্র ব্যাথা অনুভূত হয়। এতো অত্যাচারের পরও প্রধান কোন ধমনী ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়ায় সাধারণত মানুষ প্রায় চার থেকে পাঁচদিন বেঁচে থাকে ক্রসের উপর। তবে লোকটা বেঁচেছিল মাত্র ৩-৬ ঘন্টার মত [৬]।

এ প্রক্রিয়াটাকে বলা হয় “ক্রুসিফিকশন”। আর এই শব্দটা আসলেই যার নাম প্রথমে আমাদের চোখে ভেসে আসে তিনি Jesus Christ বা যিশু খৃষ্ট, আমরা যাকে ঈসা মাসীহ(আঃ) বলি। শুরুতেই বলেছিলাম, পৃথিবীতে উনাকেই সবচেয়ে বেশী ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

যেমনঃ তার নামটাই ধরি। প্রায় দুইশো কোটি মানুষ, যাদেরকে আমরা খৃষ্টান বলি, তারা তাকে ডাকে “Jesus” নামে। অথচ তার আসল নাম ছিল Yahshuah (Hebrew: יהשוה‎‎)। সবাই ডাকত “ইশো’’ নামে। যেমনঃ আমরা রিচার্ডসনকে ডাকি রিচার্ড নামে। সেখান থেকে আরবী ঈসা(আঃ)। খুব কাছাকাছি নাম। কারণ, হিব্রু আর আরবী অনেকটা জমজ বোনের মত। খৃষ্টানরা প্রায়ই মুসলিমদের সাথে মজা নেয়। বলে ঈসা(আঃ) নামে কেউ ছিলেন না তখন, অথচ “ইশো’’ আর ঈসা(আঃ) কত কাছাকাছি নাম!

যদি সরাসরি এরামায়িক [ঈসা(আ:) এর মাতৃভাষা] থেকে তার নামটা ইংরেজি করা হতো, তাহলে হয়তো আমরা Yahshuah নামের কাছাকাছি কিছু পেতাম। সমস্যা হচ্ছে, প্রথমে তার ইশো নামটা গ্রীক করা হয়, ফলে নামটা হয়- “ihsoun” বা “ Iesous” । সেখান থেকে ল্যাটিন “Iesus” (ইসাস)। আর আধুনিক ইংরেজিতে “J” যুক্ত করে বানানো হয়েছে “Jesus”।[৭] একই কাজ তারা অন্য নবীদের বেলাতেও করেছেঃ

ইয়াকুব(আঃ) ———————- Jacob
ইউসুফ(আঃ)———————– Joseph
ইয়াহিয়া(আঃ) ——————— John

খৃষ্টানরা ইশো থেকে ঈসা(আঃ) হজম করতে পারে না, অথচ “Jesus” ঠিকই হজম করে। কিন্তু ঈসা(আঃ) জীবনে “Jesus” নামটি শুনেননি। আহমেদ দিদাত(রহঃ) খুব মজা করে বলতেন, তিনি যখন আবার পৃথিবীতে আসবেন তখন কেউ তার সামনে এসে “Jesus, Jesus!” করলে তিনি ফিরেও তাকাবেন না।

কুর’আন নাযিল হবার আগে ইহুদিদের পবিত্র ধর্মীয়গ্রন্থ তালমুদের সুবাদে তার সম্পর্কে মানুষ অনেক বিশ্রী কথা জানত। তালমুদে বলা হতঃ তার মা ব্যভিচারিণী ছিলেন[৮]। ঈসা(আঃ) নাকি জাদুকর ছিলেন[৯]। মূর্তিপূজা করতেন [১০]। জাহান্নামের আগুনে পুড়বেন পরকালে[১১]। তিনি অভিশপ্ত, কারণ বাইবেল অনুসারে- সকল ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া লোকই অভিশপ্ত[১২]। ইহুদিরা টেস্ট করতে চেয়েছিল তিনি সত্যিই মসীহ নাকি! মসীহ হলে তো আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। আর কুর’আন অনুসারে করেছিলেন ও।

অপরদিকে খৃষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ তথাকথিত ইঞ্জিলে তাকে দেয়া হয় অতিরিক্ত সম্মান। বানানো হয় ঈশ্বর[১৩]।
ঈশ্বরের একমাত্র ঐরসজাত সন্তান [১৪] । ট্রিনিটির একজন[১৫]।

প্রায় ছয়শ বছর পর একজন উম্মী নবী আসলেন। আল্লাহ তায়ালা কুর’আন নাযিল করলেন। সেখানে ইহুদি আর খৃষ্টানদের সতর্ক করা হলো এই বলে যেঃ তোমরা বাড়াবাড়ি করছ। বলা হলোঃ তিনি নিজেকে ঈশ্বর দাবী করেননি আবার মূর্তিপূজাও করেননি যেমনটা ইহুদিরাও বলে । বরং বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি আমার আর তোমাদের প্রভু।”[১৬] । তার মাকে দেয়া হয় বিরল সম্মান, যিনি অলৌকিকভাবে কোন পুরুষের সাহায্য ছাড়া একজন সন্তানের জন্ম দেন। [১৭]

সত্যি বলতে খৃষ্টানদের Jesus আর আমাদের ঈসা(আঃ) এর মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। যেমনঃ বাইবেল অনুসারে, ঈসা(আঃ) এর প্রথম মিরাকল ছিল পানিকে মদ বানানো[১৮] । আর কুর’আন অনুসারে , তার প্রথম মিরাকল ছিল কোলের শিশু হয়ে মাকে ইহুদিদের সামনে ডিফেন্ড করা। [১৯]
বাইবেল অনুসারে, তিনি তার মাকে অভদ্রতার সাথে “মহিলা” বলে সম্বোধন করতেন[২০] । অথচ কুর’আন অনুসারে, তিনি মায়ের প্রতি অনুগত ছিলেন। [২১]
আর হ্যাঁ, তিনি অবশ্যই ক্রুশবিদ্ধ হননি[২২]। আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন এই অপমান থেকে। কারণ, খৃষ্টানরা যেভাবে দেখায়, ক্রুসিফিকশন মোটেও সেরকম ছিল না। ক্রুসিফিকশন এর সময় অপরাধীকে পুরো উলঙ্গ করে ফেলা হতো[২৩] । কি তীব্র লজ্জার! তাকে এই লজ্জা আর কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। একজন সম্মানিত রাসূল হিসেবে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছিলেন।

মুহম্মদ ﷺ একজন ভন্ড নবী হলে তাঁর উচিৎ ছিল, ইহুদী আর খৃষ্টানদের যে কোন একদলকে নিজের দলে নেয়া। এতে করে তার রাজত্ব পাওয়া খুব সহজ হতো। বিশেষ করে তখনকার সুপার পাওয়ার রোমানদের, যারা কিনা ছিল খৃষ্টান। এমন এমন কথাকে ওহী হিসেবে চালানো যা খৃষ্টানদের ফেভারে যায়। কিন্তু তিনি তো ওহী পেতেন আল্লাহর কাছ থেকে, আর আল্লাহ মিথ্যার সাথে আপোষ করেন না।

সালাফদের শিক্ষা ছিল, বাইবেলের যে অংশ কুর’আনের সাথে মিলে যায়, তাকে সত্য মানতে আমাদের আপত্তি নেই। আর সত্যি বলতে গভীরভাবে বাইবেল পড়লে কুর’আনের প্রতি ঈমান আরো বাড়তে বাধ্য। কি সুন্দরভাবেই না কুর’আন বাইবেলের মিথ্যাগুলোকে মিথ্যাই বলেছে, আর সত্যগুলোর প্রতি সত্যায়ন করেছে।
এই বাইবেল পড়েই আবদুল্লাহ বিন সালাম(রাঃ) এর মত জ্ঞানী ইহুদিরা রাসূল ﷺ কে সত্য নবী বলেছেন, Ben Abrahamson এর মত জ্ঞানী ইহুদীরা এই আধুনিক সময়ে রাসূল ﷺ কে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন।

আর মজার ব্যাপার এই বাইবেলকে ভিত্তি ধরেই আমাদের দেশের কিছু বিজ্ঞানমনষ্ক লোক কুর’আনের ভুল ধরে।

“আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে।”[২৪]

“বলুনঃ ‘হে আহলে-কিতাবগণ![ইহুদি ও খৃষ্টান সম্প্রদায়] একটি বিষয়ের দিকে আস-যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান-যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘ তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা তো মুসলিম। [২৫]

তথ্যসুত্রঃ

১। Holy Bible, Gospel of Matthew. 27:27; Gospel of Mark 15:15; Gospel of Mark. 23:16
২। Edwards, William D. Wesley J. Gabel, and Floyd E. Hosmer, “On the Physical Death of Jesus Christ,” Journal of the American Medical Association. Vol. 255. No. 11. 21 March 1986. 1457.
৩। C. Truman Davis, “The Crucifixion of Jesus: The Passion of Christ from a Medical Point of View,” in Arizona Medicine, March, 1965. 184.
৪। Holy Bible , Gospel of Matthew 27:32; Gospel of Mark. 15:21; Gospel of Luke 23:27
৫। DePasquale NP, Burch GE: Death by crucifixion. Am Heart J 1963;66:434-435.
৬। Holy Bible , Gospel of John. 19:14
৭। Word studies in the New Testament, by Marvin R. Vincent
৮। Jesus in the Talmud by Peter Schäfer
৯। Siedman, p 137; Cohn-Sherbok p 48
১০। Cohn-Sherbok, p 48
১১। Babylonian Talmud, Gittin 56b-57a
১২। Holy Bible, Book of Deuteronomy 21:22-23
১৩। Holy Bible,Colossians 1:15.
১৪। Holy Bible, Gospel of john 3:16
১৫। Holy Bible, 1 john 5:7
১৬। Al Quran, Surah Al Imran, verse: 51
১৭। Al Quran, Surah Mariyam, verse: 22
১৮। Holy Bible, Gospel of john 2:11
১৯। Al Quran, Surah Mariyam, verse: 30
২০। Holy Bible, Gospel of John 19:26
২১। Al Quran, Surah Mariyam, verse: 32
২২। Al Quran, Surah Nisa, verse: 157
২৩। Holy Bible, Gospel of Matthew 27:35
২৪। Al Quran, Surah Al Baakara: 146
২৫। AL Quran, Surah Al Imran:64