মুক্তধারা

কর্মজীবী নারী বনাম পুরুষালী দৃষ্টিভঙ্গিঃদ্বান্দিকতাপূর্ন

জিন্নাতুন নেছা: সকাল সকাল ম্যাসেঞ্জার এর নোটিফিকেশন মনে করিয়ে দিলো আজ ৮ই মার্চ, নারী দিবস।উত্তরাধুনিকতা আর লিবারালিজমের এই যুগে অনেককেই হয়তো মানতে নারাজ নারীদের আলাদা করে দিবসের দরকার কি? প্রতিটি দিনই নারী দিবস,আই মিন নারীদের। আমি দুটোর সাথেই একমত। কিভাবে বলছি..

প্রথমতঃ দেশ অনেক এগিয়ে গেলে ও আমাদের গাও গেরামে এমন অনেক অনেক নারী আছেন যারা তাদের জীবনে অনেক অনেক পিছিয়ে। যারা সকল কিছুকেই জীবনের স্বাভাবিক মনে করেন। এই স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বের করার জন্যই দরকার হয় বিশেষ কিছুর। তারা এতটায় অরক্ষিত যে প্রতিনিয়ত পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে হেন কোন নির্যাতন নাই তার শিকার হচ্ছেন না।এমনকি সেসকল নারীরা বোঝেই না তারা প্রতিনিয়ত এসব নিপীড়ন, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যাদের জন্য এরকম হাজারো দিনের দরকার আছে যেদিনগুলো তাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে আসবে একটু একটু করে।এটা তো বললাম প্রান্তিক, গাও গেরামের মা বোনদের কথা।অনেক শিক্ষিত,কর্মজীবী নারী ও আছেন যারা ও প্রতিনিয়ত নানান হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

আমি অনেককেই দেখেছি এমন অনেক হয়রানিমূলক কথায় আছে যেগুলো শোনার পর ও তারা হাসি মুখে উড়িয়ে দিচ্ছে।যেনো কিছুই ঘটেনি,কিছুই শোনেনি। আমার যেমন রাগ হয় তেমন করুনা ও হয় বিশ্বাস করুন?এদের জন্য এমন মেলা মেলা দিনের দরকার আছে। যে তারা বুঝবে আমরা নারী,আমরা মানুষ,আমরা পারি। আর যারা মনে করেন প্রতিদিনই নারীদের নারী দিবস তারা কিছু মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী যারা কিনা নারী আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার চেষ্টায় অব্যাহত।তবে তার ফল কতটুকু সর্বস্তরের নারীর হাতে পৌছায় তা দেখার বিষয়।তবে আমি এদের স্বাগত জানায়।

আজ নারী দিবস আমি কর্মজীবী নারীদের কাজের পরিবেশ নিয়ে কিছু বলবো।বাংলাদেশ পুরুষতান্ত্রিক দেশ হিসেবে একজন নারী কর্মে প্রবেশ করা কতটা চ্যালেঞ্জের তা আমরা বোধকরি কম বেশি সকলেই জানি। আর সেটা যদি হয় এনজিও সেক্টর,গার্মেন্টস সেক্টর তাহলে তো কথায় নাই।যেমন গতকাল রাতে ও মা ফোন দিয়ে কিছুক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করলো সরকারি চাকরির জন্য তা যদি প্রাইমারির মাস্টার হয় তাহলে ও ভালো। আবার যদি স্বামী,শ্বশুর, শ্বাশুড়ি থাকে তাদের আলাদা আলাদা রিকোয়ারমেন্ট থাকে যাকে উপেক্ষা করে,ভেংগে বা মানিয়ে নিয়ে খুব কম নারীই পারে কর্মে যোগ দিতে।আর যদি দিতে পারে ও তাহলে বাড়ি,ঘর,স্বামী,বাচ্চা,অফিস নিয়ে নারীর/বেটির বেসামাল অবস্থা।এইটা হলো কর্মে যোগদান করার ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা,পারিবারিক বাধা।

কিন্তু আমি বলতে চাই এত কষ্ট করে চাকরি শুরু করার পর যদি কর্মপরিবেশ নারী বান্ধব না হয় তাহলে সেই নারীর কি অবস্থা হবে একবার ভেবে দেখেছেন?

একটা গল্প বলতে চাই,ঠিক গল্প নয় এনজিও কর্মীজীবী নারীর বাস্তবতা।
সকল কিছু সামলিয়ে একজন নারী যখন ঠিক নয়টায় হন্তদন্ত হয়ে অফিসে প্রবেশ করেন তখন চারপাশের কলিগদের তাকানোর দৃষ্টি আমার কাছে অদ্ভুদ লাগে।আর ১০-১৫ মিনিট দেরী হলে তো বস বলেই ফেলবেন আজ মনে হয় একটু বেশিই ঘুমিয়েছেন তাই না,আপা?

বস যদি হয় পুরুষ বেটা তাহলে আপনার কাজ থাকুক বা নাই থাকুক উনি যখন ফিল্ড ভিজিটে যাবেন তখন তার একজন নারী সহকর্মী চাই,শুধু তাই নয় সুন্দরী হতে হবে। কর্মজীবনের শুরু থেকেই অনেক পুরুষ কলিগের থেকেই শুনে আসছি নারী সহকর্মী সাথে থাকলে কাজের স্পৃহা বাড়ে, একটা ভালো লাগা কাজ করে। এসব কিছুই না শুধু শয়তান বেটাদের শয়তানী।অনেক সুপারভাইজার আছেন কোন সরকারি অফিসিয়াল পুরুষ বা অন্য কোন এনজিও পুরুষ বসের সাথে মিটিং এর ডেট বা মিটিং করতে হবে নিশ্চিত একজন নারী সহকর্মী রাখবেন। তা যত রাতই হউক।আর এখন তো এনজিও সেক্টরে অফিসে ঢোকার সময় ৯ টা কিন্তু বের হওয়ার সময় নাই।এটা বাস্তবতা।

আর রিক্রুটমেন্ট সিস্টেমে আমার মনে হয় সুন্দরী হওয়া এক বিশেষ যোগ্যতা।সেদিন এক কলিগ বলছিলো,শালা,কি যুগ এলো কেবল মেয়েগো চাকরি হয়।মেজাজ চরমে উঠে গিয়েছিলো বললাম,ভাইয়া,মেয়েদের কি মুখ দেখে চাকরি দেয় নাকি? যোগ্যতার বলেই অর্জন করতে হয়। আবারো বলছিলো আরে না,আপনি জানেন না কিছু,বসের সাথে ভালো সম্পর্ক হলে এমনি এমনি প্রমোশন। মাথাটা এতো গরম হয়ে গেলো কথা বাড়ায়নি। অন্য একজন কলিগ,আমার আর একজন কলিগকে বলছিলো,কি এসব দূর দেশে চাকরি করতে আইছেন, বাড়িতে লক্ষী বউ হয়ে থাকবেন। আমি বললাম আপনার সমস্যা কি? নিজের বউকে তো রাখছেন ঘরে তাতেই শান্ত থাকুন।অন্যকে নিয়ে ভাবতে হবেনা।
মজার ব্যাপার হলো এসকল কথা কিন্তু বলেছিলো সুপারভাইজার এর সামনে কিন্তু সে কোন প্রতিবাদ করেনি।কারন সে ও পুরুষ।

আমি একজন সিজ্ঞেল মা।এটা বোধকরি আমার পরিচিত,পরিজন সবাই জানে। এই ৫-৬ বছর চাকরি জীবনে একটি কথা কানে এখনো বাজে,”আরে শোনেন আপনার সেক্স করার দরকার তাহলে আরো ভালো কাজ করতে পারবেন?” এগুলো হলো আমাদের কর্ম পরিবেশ। এতো এতো নোংরা জীবদের সাথে আমাদের নারীদের মানিয়ে নিয়ে কাজ করতে হয়।

অনেকেই হয়তো বলবেন মানিয়ে কেন নিচ্ছেন,আওয়াজ তুলুন,আমি ও বিশ্বাসী আওয়াজ তুলুন।কিন্তু আওয়াজেই কি সব কাজ হয়?

কেউ কেউ যে সাহসী নাই তা নয়,আওয়াজ যে তুলছে না তা ও নয়।
কিন্তু সমস্যা আমরা নারী।আপনি কোন অভিযোগ করবেন? সেটা নিয়ে প্রতিকারের চাইতে আপনার ইতিহাস খোজা হবে।আপনার চরিত্র কেমন? আপনি সিগারেট খান কিনা? আপনি নেশা করেন কিনা? আপনি প্রেম করেন কিনা?
হ্যা আমি সিগারেট খাই,আমি নেশ করি,আমি প্রেম করি কিন্তু মাগার আপনি আমাকে যৌন হয়রানিমূলক কথা কেন বলবেন? আমি আপনার সাথে প্রেম করবোনা।আপনার সাথে বিছানায় যাবোন।আমি অফিস করি ৯-৫ টা তার জন্য আমারে বেতন দেয় অফিস।আমার ২৪ ঘন্টার বেতন অফিস দেয় না।এর বাহিরে আমি কি করি আমি ডিভোর্সি, নাকি ১০টা প্রেম করেছি,নাকি সিগারেট খাই তাতে কি?? অফিসে ঠিকমত কাজ করতে পারছি কিনা, অফিসের পারপাস আমাকে দিয়ে সার্ভ হচ্ছে কিনা সেটা দেখুন?

আমাদের চিরাচরিত নিয়ম হলো নারীর যে কোন অভিযোগেই ঘটনা নিয়ে না জেনে না বুঝে ঐ নারীর চরিত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি করে। এইটাই বাস্তবতা। এটা সব নারীর পক্ষে মেনে নিয়ে,সাহসী হয়ে যুদ্ধ চালাবার সাহস খুব কম নারীরই আছে। ফেইসবুক ভাই অনেকেই স্ট্যাটাস লিখতে পারেন কিন্তু বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে যুদ্ধ করার সাহস খুব কম নারীর আছে।

এনজিগুলো তা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যাই হোক না কেন অনেক নিয়ম,ম্যান্ডেট,পলিসির অন্তরালে যে লুকায়িত চরিত্র আছে,ক্ষমতার অপব্যবহার আছে,স্টাফদের এক্সপ্লইটেশনের ইতিহাস আছে তা শক্ত হস্তে দমন করতে না পারলে নারীবান্ধব কর্ম পরিবেশ কখনোই তৈরি হবেনা।

আসুন এই নারী দিবসে আমরা পুরুষ সহকর্মী এবং নারী সহকর্মী সকলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই আর নয় কোন যৌন হয়রানি মূলক বাক্য,ইংগিত,নয় কোন বৈষম্য। কর্মপরিবেশ করে তুলি নারী বান্ধব।

পুরুষতন্ত্র নিপাত যাক
নারী দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে।