মুক্তধারা

ফুল চুরি | একুশের স্মৃতি

তালহা মাহমুদ অভীকঃ আমার শৈশব এবং কৈশোরের দিনগুলি কেটেছে গ্রামে! গ্রাম বলতে একদম অজপাড়াগাঁ বলতে যা বুঝায় তাই। আমি চষে বেড়িয়েছি গ্রামের পথে-প্রান্তরে, মাঠ-ঘাটে, বনে-বাদাড়ে, গাছে-বাঁশে। কৈশোরের সেই দূরন্তপনা আমার স্মৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ!

শেকলবিহীন জীবন হয় দূরন্ত, দূর্দান্ত, রোমাঞ্চকর! গ্রাম ছিলো আমাদের সেই রোমাঞ্চকর জীবনের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। আশেপাশের আট দশটা গ্রামের কোথায় কি ছিলো আর না ছিলো, সবই আমাদের নখদর্পণে জানা থাকতো। কোন বাড়ীর ফুল-পাখি সুন্দর তা যেমন জানা ছিলো তেমনি কোন বাড়ীর ফল বেশি মিষ্ট তাও অজানা ছিলো না!

আমাদের গ্রামে সামাজিক বা জাতীয় অনুষ্ঠান গুলো খুব ঘটা করে আয়োজিত হতো। শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসে আমদের ব্যস্ততার সীমা থাকতো না। ক্লাবের বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় আমরা বিভিন্ন কাজে নেমে পড়তাম অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে! এসব দিবসে ফুল চুরি করা ছিলো সবচেয়ে কঠিন কাজ। ফুল চুরি করা যেমন হৃদয়হীন কাজ তেমনি দুঃসাধ্য ব্যাপার! উঠানের কোণে পরম মমতায় যে কিশোরী ফুল ফুটিয়েছে তার ফুল চুরি করা তো হৃদয়হীন কাজই! আর ঘুরেফিরে সেই দায়িত্ব এসে পড়তো আমি এবং আমার বন্ধুগণের উপর!

২০১১সাল! আমরা তখন ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ি। একুশে ফেব্রুয়ারি “শহিদ দিবস” পালনের জন্য ফুল চুরি করার দায়িত্ব যথারীতি আমাদের উপর! আমাদের দল ছিলো ছয়জনের। সোহাগ, রাকিব, আলীমুজ্জামান, সুমন, রিজন আর আমি! ২০ শে ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ফুল চুরি করতে। গন্তব্য বিজন স্যারদের বাড়ী। জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত। মনে হচ্ছে রুপা গলিয়ে কেউ হাওয়ার সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ! এত জ্যোৎস্নায় চুরি করা যায় না। আমরা চাঁদ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলাম।

শীত ঋতু শেষ হয়ে গেলেও ফাল্গুনের মৃদুমন্দ বাতাসে শীত শীত লাগছে সাথে মশার উৎপাত! আমরা সবাই প্রস্তুত হয়ে বাড়ীর পাশে জলার ধারে বসে আছি। ফুল চুরি আজ করতেই হবে! নাহলে বড় ভাইদের সামনে মান ইজ্জত কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। খুব সন্তর্পনে বাড়ীর ভিতর ঢুকে পড়লাম। সোহাগ গিয়ে গৃহস্থের বাড়ীর দরজার শিকল বাইরে থেকে আটকে দিয়েছে যাতে বাড়ির লোকজন টের পেলেও হুট করে বের হতে না পারে। রাকিব দাড়িয়ে আছে রাস্তায়, কোন লোক দেখলেই শিষ বাজাবে। একদম মাষ্টার প্লান!

আর বাকি চারজন মিলে ফুল ছিঁড়তে শুরু করেছি। বুকের মধ্য ধুকপুকানি ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। এরই মধ্যে আলীমুজ্জামান এক ভয়াবহ কাজ করে ফেললো! সে “হেইয়ো” বলে জোরে চিৎকার দিয়ে ফুলগাছ মাটি থেকেই শিকড়সহ তুলে ফেলেছে! শব্দ শুনে গৃহকর্ত্রী জেগে চিৎকার চেচাঁমেচি শুরু করলেন। আসন্ন বিপদ বুঝে শুরু করলাম দৌড়। এরইমাঝে আশেপাশের লোকজন জেগে গেছে। তারাও “চোর চোর” বলে লাঠিসেটা নিয়ে আমাদের পিছু পিছু ধাওয়া করতে থাকলো। আমরা দৌড়াচ্ছি তো দৌড়াচ্ছি ই! জীবন বাঁচানোর দৌড়। ধরা পড়লেই আগে কড়া করে মাইর, তারপর বিচার! এলাকায় মুখ দেখানো অসম্ভব ব্যাপার হবে তখন।

শীতে চাষ করা জমির ঢেলাগুলো হয় খুব শক্ত। আমরা সেই চাষ করা জমির পাথরের মতো ঢেলার মধ্যে একটানা দৌড়ে চলেছি। দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর পর মনে হলো আমাদের পিছনে আর কেউ নেই! আমরা থামলাম। কঠিন মাটির বুকে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। বড় বড় নিশ্বাস নিতে থাকলাম। স্বস্তির নিশ্বাস! এবারের মতো বাঁচা গেল! বুকটা কামারের দোকানের হাপরের মতো উঠা নামা করছে তখন। সারা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে!শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল রক্তের স্রোত নেমে গেল। একসময় পায়ে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলাম। হাত দিয়ে দেখি তাজা রক্ত! ঢেলার গুঁতোয় পা ছিঁড়েফেটে গিয়েছে, সেখান থেকেই রক্ত বের হচ্ছে! জামরুল পাতা ডলে তার রস লাগালাম। রক্ত তখনকার মতো বন্ধ হলো।

সকালবেলা শহিদ মিনারের বেদিতে যখন ফুল দিতে গিয়েছি তখন দেখি ক্ষত স্থান থেকে রক্ত ঝরছে! আর সেই রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ভাষা শহিদদের রক্তে ভেজা মিনারের বেদিতে…..