অনুরণন

আসে যদি মেঘ

অনেকক্ষন ধরেই স্যারের চেহারার দিকে তাকিয়ে ছিল বৃষ্টি। মেয়েদের চোখে ছোট ছোট পরিবর্তন গুলো খুব সহজেই চোখে পড়ে।এক অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে মেপে নিচ্ছে যেন ইয়াং এবং জটিল সব সমস্যার সমাধান এর নায়ক আহমেদ সিনান কে। বৃষ্টির এই এক নজরে তাকিয়ে থাকাটা চোখ এড়ায়নি সিনানের।কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে আড় চোখে তাকাতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন বৃষ্টি।

-কিছু বলতে চাও বৃষ্টি ?গলা টা যেন খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সিনান।
-নাহ স্যার,তেমন কিছু না এমনি।
-কিছু বলার থাকলে বলে ফেল।আজকে আমি ফ্রি এবং মনটাও ভীষণ ভালো।
বৃষ্টি কিছুতেই যেটা মনে আসে সেটা বলতে পারবেনা।তাই ভাবল চুপ থাকাই ভালো। যতই সিনান দুদে ব্যারিস্টার হোক না কেন সে না বললে তার মনের কথা বুঝতে পারবেনা।

লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে ঢাকায় এখন প্র‍্যাক্টিস করছেন সিনান।বেশ নাম ডাক আছে।তার সহকারী হিসেবে কাজ পেতে বৃষ্টিকে অনেক কাঠখড় পোঁড়াতে হয়েছে।তাই অযথা কৌতুহলে নিজের জায়গাটা হারাতে রাজি নন বৃষ্টি।তাই কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরানো চেষ্টা করল,বের হবেন কখন স্যার?আজকে কি আবার আমাকে আপনার বাসায় যেতে হবে?আজ কিন্তু আমার শপিং আছে স্যার।একটু আগে ছাড়তেই হবে।প্লিজ স্যার, রিকোয়েস্ট স্যার।

– ওরে বাপরে।মেয়েটা বড্ড নাছোড়বান্দা। ঠিক আছে আজ তেমন কাজ নেই।এখুনি চলে যাও।আর কাল কিন্ত অনেক কাজ। আমি কোন অজুহাত শুনব না,বলে দিলাম।
সিনান অনেক বড় মাপের ব্যারিস্টার হলেও কোর্টের বাইরের মানুষটা একদম ভিন্ন।খুব সহজ তার জীবন, চলাফেরা।খুবই বন্ধুবৎসল তিনি।এত দিনের কাজে বৃষ্টি ও তাই তার কাছের।দুজনকে দেখলে কেউ কেউ বন্ধু বা ভাই বোন ভেবে নেন।

সিনান এর নিজের চেম্বার তার নিজের বাসায়।ডুপ্লেক্স ভিলার নিচ তলায় অফিস আর উপরে তার বাসা।সেই সুত্রে বৃষ্টির পা এখন অন্দরমহল অব্দি।
সিনান বিবাহিত,এক সন্তানের জনক।স্ত্রী পেশায় চিকিৎসক। আর তাদের ঘর আলো করা সন্তান ইশা।এইবার সে তিনে পদার্পণ করল।
বাসায় ফিরেই সিনান এর জীবন যাপন খুব একঘেয়ে।অন্য আর দশ টা সাধারণ মানুষ এর মতই।কিন্তু মনের ভিতরের সিনান বড্ড চঞ্চল,একটু জেদি, একরোখা, অবুঝ কিন্তু মনটা খুব মায়ায় ভরা,শান্ত কিন্ত ভালোবাসায় পুর্ন।

অন্যান্য দিন কাজ থাকে প্রচুর চেম্বারে। কিন্তু বিয়ের শপিং এ সময় লাগবে বলেই বৃষ্টি আগে থেকেই অনেক কাজ গুছিয়ে রেখেছে আর তার পরই আজ ছুটি মঞ্জুর হল।আর নয়তো সিনানের সাথেই সে বাসার অফিসে ফেরে আর তাতে বিকেলটা কাজের মধ্যে ভালো কাটে সিনানের।আজ একটু ব্যতিক্রম হল।আজ বিকেলটা ইশার সাথে খেলেই পার করবে।ব্যস্ত বাবার সাথে খুব একটা সময় কাটানো হয় না তার।তবুও মা বাবা মিলেই যতটা সম্ভব মেয়েকে সময় দেয়।আর বৃষ্টি ও মাঝেমধ্যে সংগী হয় তাদের।

বাসায় ফিরতেই ফোন অরুপের। বৃষ্টি জানালো ভালো ভাবেই ফিরেছে সে। অরুপও চলে যাবে সামনে ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডন তাই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে অরুপ আর বৃষ্টির।

একমগ কফি নিয়ে স্যারকে ফোন দিল বৃষ্টি।ওয়েটিং। সন্দেহটা বেড়েই চলেছে বৃষ্টি।স্যার কে কি জিজ্ঞেস করবে?নাহ, কাল জিজ্ঞেস করেই নেবে এত ভাবতে ভালো লাগছে না।নিজের সামনে বিয়ে বলেও হয়ত কিছুটা জানতে চাচ্ছে ভবিতব্য।আসলে ভবিতব্য কি জানা যায়?সময়ের জালে বন্দী জাগতিক সব ঘটনা।দিন যায় আমরা আরো বন্দী হই।প্রতিটা সুর্যের উদয় নতুন নতুন সম্পর্কে বন্দী করে আমাদের।কেউ কি জানি,কাল কোন নতুন কিছু অপেক্ষায় আছে।শুধু আশা নিয়ে পথচলা,যেটা নতুন ঘটবে সেটা যেন ভাংন না হয়। সেটা যেন হয় নতুন শুরু।

পর্না হাসপাতালে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এরই মধ্যে সময় করে ইশা কে একটা ফোন করে নিল।সিনানকেও একটা।সিনান এর সাথে প্রতিদিন দুপুরবেলা কথা হয়। লাঞ্চ করেছ কিনা,কখন ফিরবে এইসব আর কি।সেও বিকেল নাগাদ বের হওয়ার চেষ্টা করে কিন্ত সন্ধ্যে হয়েই যায়।খুব ব্যস্ততম দিন কাটে তার রোগীদের সাথে। হাসপাতালে সদা হাস্যমুখী আর সবার জন্য হেল্পফুল সে। যার যত সমস্যা তার কাছে বলেই অন্যেরা আনন্দ পায়।পর্নারও বেশ লাগে।ইশাকে কথা দিয়েছে আজ একটু জলদি ফিরবে বাসায়।সিনান কে আবার একটা ফোন করে মনে করাতে হবে।ইশার বায়না আজ মা বাবা দুজনকেই তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে আর তবেই সে ডিনার করবে।সিনান কে না মনে করালে ভুলেই যাবে হয়ত।নম্বর টা ডায়াল করতেই বিজি টোন। এটা নতুন কিছু নাহ।সে ব্যস্ত ব্যারিস্টার। ফোনে কথা বলা তার নিত্যকার প্রয়োজন। কিন্ত একই সময়ে এই ব্যপারটাই ভাবাচ্ছে বৃষ্টিকে।আজকাল যেন সিনান আগের মত নেই। অনেকটা অন্যরূপ অনেক বিষয়ে।বৃষ্টি এটাও ভাবছে পর্না ধরতে পারছে কিনা ব্যপারগুলো।বৃষ্টি ভাবল পর্না কে ফোন করে নিবে একটা।ভাবতেই পর্নার ফোন এল,বৃষ্টি তো ঝলমলিয়ে উঠে কথা শুরু করল,

-এই জানো ভাবি মাত্র তোমাকে ফোন দিচ্ছিলাম আর ভাবতেই তুমি দিলে।
-পর্না হেসে বলল একেই বলে মনের টান,বুঝলে।
-হুম বুঝলাম।তা কেন এই সময়ে ফোন?
-বলছি শোন, লক্ষী বোন আমার একটা সাহায্য করতে পারবে?
-আরেহ বলই না।অত ফর্মাল হচ্ছ কেন?
-কাল একটা স্কুলের খোজ এনে দেবে,কিডস স্কুলটা যেটা তোমাদের এলাকায়?
-ও হ্যা। সিনান স্যার বলেছিলেন তো।
-সিনান তো বলেই খালাস, খোজ নেয়ার সময় তো তার আর হয় না।
-হুম,বুঝেছি।ঠিক আছে আমি কাল খোঁজ নিয়ে জানাব তোমায়।তো,কোথায় তুমি এখন?
-আরেহ বাসায় যাচ্ছি। আর বলোনা,ইশার বায়না আজকে সবাইকে একসাথে ডিনার করতে হবে তাই জলদি জলদি ফেরা।
-ও তাই বল।স্যার ও আজকে আমায় তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দিল।
-হুম।সিনান আমার পাশেই।আমাকে হাসপাতাল থেকে এই মাত্র পিক করল।
-ওকে ভাবী, ভালো থাক তাহলে রাখছি।
-হুম।ওকে বাই।

নাহ ভাবীর কথায় কিচ্ছু টের পেলনা বৃষ্টি। তাহলে কি সে অহেতুক সন্দেহ করছে।ভাবী কি কিছুই টের পায়নি।আসলে ব্যাপারটা বোঝার না,উপলব্ধির।ভাবী বড় ব্যস্ত থাকে আলাদা করে না বুঝতে পারলে কিছু বলার নেই।নাকি ওদের সম্পর্কের বন্ধন টাই আলগা হয়ে গেল?
কেন যে এত ভাবছে বৃষ্টি। না ভেবেই শান্ত থাকতে পারছে কই।সে তো কিছু আভাস পাচ্ছেই।সেগুলো কে উড়িয়ে দেয়া কত টুকু ঠিক হবে বুঝতে পারছে না।সিনান স্যার এর পরিবার টাকে সে খুব ভালো বাসে।তাদের ভালো চায় বলেই ভাবনাটা খুব ভোগাচ্ছে। সিনান স্যার তো শুধু স্যার নন।ভাই,মেন্টর সর্বোপরি ভাল বন্ধুও বটে।শুধু স্যারই নন।ভাবি,ইশা ওরাও খুব আপন বৃষ্টির।

সমস্যার শুরু একটা ফোন কল থেকে।ফোনটা আসলেই স্যার খুব আনন্দিত হয়ে যান।এমনকি কোর্টরুমে ফোন আসলেও মোটেই বিরক্ত হননা।কে হতে পারে ফোনের ওপাশে তা জানতে ইচ্ছে হলেও জানা সম্ভব হয়নি।স্যারকে ঠারেঠোরে জিজ্ঞেস ও করেছে সে।কিন্তু জবাবে শুধু পেয়েছে হাসি।আর বৃষ্টির ধারনা এই হাসি শুধু মানুষ প্রেমে পরলেই হাসতে পারে।আর আজকাল যে সব পাগলামি করছেন স্যার,সেগুলো মাত্রা ছাড়ানো বাকি।যেমন এইতো সেদিন রাস্তায় জ্যামের মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে স্যার বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করলেন।কি অদ্ভুত অবস্থা।এমন পরিস্থিতি তে কখনওই পরতে হয়নি বৃষ্টিকে।অন্য গাড়ি থেকে তাকিয়ে ছিল লোকগুলো।কি যে লজ্জার ছিল ব্যাপারটা তা আর বলার না।ফোনের ব্যাপারটা শুরু আরও ছয় মাস আগের থেকেই।আর ইদানীং ঘটনা বেড়ে গিয়ে লুকোচুরি খেলায় এসেছে।গত কয়েকদিন যাবত বৃষ্টি একাই বসছে চেম্বারে।বিকেলে মাঝেমধ্যেইই হাওয়া হয়ে যাচ্ছেন স্যার।অন্তত গত পাঁচ বছরে এটা দেখেনি বৃষ্টি। কোথাও গেলে অবশ্যই বলে যান।আজ আবার বলে গেলেন পর্না যদি জানতে চায় তাহলে বলতে যে তিনি ক্লায়েন্ট মিটিং এ আছেন।কিন্ত ক্লায়েন্ট মিটিং এ গেলে বৃষ্টি সাথেই যায়।ভাবতেই পর্না এসে হাজির।দৌড়ে দৌড়ে আসছে, পেছনে ইশাও।

বৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল,
-কি মা মেয়েতে যে খুব খেলা হচ্ছে।
-হুম,বৃষ্টি ছুটি নিলাম আজ।মেয়েটা যে বড় হয়ে যাচ্ছে আর আমি তা দেখতেই পেলাম নাহ।
পেছন থেকে ইশা জাপটে ধরল বৃষ্টিকে, আদর করে গাল টিপতেই বৃষ্টির ভয় সত্যি হয়ে গেল,
-বাবা কোথায়?
-বাবা তো একটু কাজে বেরিয়ে গেছে মামনি।চলে আসবে এখুনি।
-কখন আসবে?প্লিজ মাম্মা বাবা কে ফোন কর না,চলে আসতে বল,প্লিজ।

ইশার বায়নায় পর্না ব্যতিব্যস্ত হয়ে বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করল,
-কোথায় গেল সিনান?তুমি কি জান বৃষ্টি।
-আ,মানে ভাবি, আসলে হয়েছে কি, একজন নতুন ক্লায়েন্ট তার সাথে মিটিং।
-ও,তাহলে তুমি যাওনি যে,আর বাইরে ই বা কেন?চেম্বারে না বসে কোথায় গেল?
-আসলে ভাবী এই ক্লায়েন্ট স্যার ছাড়া কাউকে কিছু বলবেন না।আর চেম্বারেও দেখা করবেন না,বললেন কি সব লোক লেগেছে নাকি পিছনে!!এইসব আবোলতাবোল বুঝাতে লাগল পর্নাকে। আসলে পর্নাকে কষ্ট দিতে চাচ্ছিল না।কিন্ত হুট করে পর্নাই বলে বসল,
-আচ্ছা বৃষ্টি তুমি তোমার স্যারের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছ?
-কেমন?
-এই যেমন কেমন একটু অগোছালো চলাফেরা, অনিয়ম করছে আজকাল,বাসায় ফিরতেও রাত করে মাঝেমধ্যে।
-আসলে ভাবী,স্যার একটু ব্যস্ত ইদানীং।একটু কাজের চাপ আছে এই আর কি। যাই হোক এতদিনে তো এটা বুঝে গেছ যে, আমাদের পেশাটা মোটেই সাধারণ নয়।সো,প্লিজ এগুলো ভেবে সময় নষ্ট, ঘুম বরবাদ কর না।ও স্যার এমনি। ঠিক হয়ে যাবে।

মিষ্টি হেসে চেম্বার থেকে বের হয়ে গেল পর্না ইশাকে নিয়ে।
নাহ, আর যাই হোক, চাকরী থাক না থাক স্যার কে জিজ্ঞেস করেই ফেলবে।তারপর যা হবে দেখা যাবে।
স্যারকে একটু ভয় পায় বৃষ্টি। কিন্ত তাও ভয়ে ভয়ে বলেই ফেলল কথাটা।
-স্যার,এতটা অন্যরকম লাগে ইদানীং আপনাকে যে কোনদিন যে আপনাকে বুঝতে পারতাম সেটাই ভুল মনে হয়।আপনি কি একটু অন্যমনস্ক নন?
-তোমাকে কি পর্না কিছু বলেছে বৃষ্টি?
-নাহ তো স্যার।এমনি জিজ্ঞেস করলাম ইচ্ছে না হলে বলার দরকার নেই।
– নাহ, ঠিক আছে। আমি নিজেও তো কিছুটা বদল টের পাচ্ছি।তো নিজের কাছের লোকেরা চিন্তিত হবে এটাই স্বাভাবিক।

চেম্বারের চেয়ে অনেক ভালো হচ্ছে গাড়িতে কথা বলা, কারন স্যার নিজেই ড্রাইভ করছেন কদিন ধরেই।তাই এই চলতি পথের সময়টাই বেছে নিল সে।
স্যার কথা বলতে বলতে থেমে গেছেন।
একটু পর আবার শুরু করলেন বলা।
-বৃষ্টি, তুমি কখনো কাউকে পাগলের মত ভালোবেসেছ?কিছু না জেনে,না বুঝে।আগে পিছে না ভেবে?
-নাহ, স্যার।
-নিজের একদম মনের মত বা এমন কাউকে পেয়েছ যার ভেতরে নিজের ভেতরটা দেখতে পাও?
-নাহ।
-কখনো কাউকে এমনি করে ভালোবেসে দেখ জীবনে আবার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে হবে।
-স্যার, আপনার এই জীবনটাকে কি বোঝা মনে হচ্ছে?
-কি বলি তোমায় বল তো?নিজেই তো ভালো করে বুঝি না।যদি এই সমাজের বিধি অনুসারে বলি তবে জানি তুমি বা তোমরা বলবে কিসের অভাব আমার।কি আর চাই জীবনে?কিন্ত আমার ভেতরটাতো এই জীবন চায় না।আমার অস্তিত্বে মিশে আছে ভেসে যাওয়া,প্রকৃতিগত ভাবে আমি মনে হয় বোহেমিয়ান গোছের।দলবেধে হুটোপুটি করা,মন খুলে গান গাওয়া আমার নেশা।তুমি বা তোমরা যাকে চেন সে আসল আমি না।মুখোশ পরা একজন ব্যক্তি যার নিজের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেয়ার সাহসটুকু ছিলনা।

এস একটা গল্প বলি তোমায়,আমার গল্প,নিজেকে তিলে তিলে বিপরীত মানুষ করে গড়ে তোলার গল্প।ছোট বেলা থেকেই শুনে শুনে বড় হয়েছি আমি খুব সৌভাগ্যবান কারন এই সমাজে আমার পরিবারের আলাদা সম্মান আছে।আর আমাকে সেই সম্মান রক্ষায় আজীবন বাবা দাদার দেখানো পথেই চলতে হবে।আর তাই তো আমি গান করতে পারিনি,ছুটে বেড়াতে পারিনি,নিজের স্বপ্নগুলোকে সত্যি করতে পারিনি।লন্ডনে জোর করে পাঠিয়ে দেয়া হল পড়তে দাদার পছন্দের বিষয়ে। বন্দী একটা জীবনে আমি আমার নিজের অন্তরাত্মা একটু একটু করে কবর দিয়েছি।এমন সময় এক সকালে আমার অনিন্দিতার সাথে পরিচয় হয়।আমার সাথেই পড়ত লন্ডনে।ঠিক আমার মতন।আমরা একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতাম,দৌড়ে মাঠ পেরুতাম,যা খুশী তাই করার শক্তিটা ফিরে পেয়েছিলাম জানো?
দুজন দুজনকে মেলে ধরেছি বহুবার। দেখেছি প্রতিবার এক অমোঘ সত্য।যে সত্য আমাকে অনিন্দিতার বুকের ভেতরে একটু একটু করে জায়গা করে দিয়েছে।আমি যেন ওকে পেয়ে নিজেকে আবার ফিরে পেয়েছিলাম।

কিন্ত আমাকে তো পৃথিবীতে আনা হয়েছে সম্মানিত বংশ, সম্মানিত বাবা,দাদাকে আরও সম্মানিত করতে তাই জোর করে বাবা আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসলেন।কয়েকদিনেই বিয়ে হয়ে গেল আমার।হুম,জানি আমি,পর্না অনেক ভালো জীবন সংগী। কিন্ত অনিন্দিতা, আমার সত্ত্বা।নিজেকে যে কি ভীষণ কাপুরুষ ভাবি আমি এখনো তা কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
-স্যার,অনিন্দিতা কি ফিরে এসেছে?
-হুম।
-কিন্ত স্যার ভাবী আর ইশা?
-ভেবোনা বৃষ্টি। আমি আর নতুন করে অন্যায় করব না।
-স্যার,ভাবীকে সবটা জানান প্লিজ।
-জানাব।তবে তার আগে অনিন্দিতা আর আমার নিজের সাথেও বোঝাপড়াটা জরুরি।
সিনান আজ পর্নার মুখোমুখি
-আমার কি দোষ বলত,সিনান?
-পর্না, কোন দোষ তোমার না।তুমি আমাকে ক্ষমা কর।কিন্ত ছেড়ে যেওনা প্লিজ।
-হাসালে সিনান।আমি কোথায় ছেড়ে গেলাম।ছেড়ে গেলে তো তুমি।
-আমি ছাড়তে চাই না পর্না।
-কেন চাওনা?তোমার সবটা জুড়ে তো আছে অনিন্দিতা।
-ছিল।এখন আর নেই।
-কি বলছ এসব?তুমি তো আর নিজেতেই নেই।সবটা তো হারিয়ে গেছে সিনান।
-নাহ, পুরোটা জাননা তুমি।শোন।অনিন্দিতা চলে গেছে।সংগে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সবটা অতীত।আমি ওকে ছেড়ে এসেছিলাম তাই একটু কিছু বাকি রয়ে গিয়েছিল। সবটা দিয়ে ভালোবেসেছিলাম তো। অন্যায় তো কিছু করিনি। বাবার কথায় তোমাকে বিয়ে করেছিলাম।কিন্ত তুমি তোমার ভালোবাসার সবচেয়ে মুল্যবান উপহার আমাকে দিয়েছ। ইশাকে দিয়েছ।তাই আমি পারিনি। আবার তোমার সাথে আরেকটা অন্যায় করতে পারিনি।একবার তো অনিন্দিতাকে ছেড়ে বেঁচে গেছি।কিন্ত আবার তো তোমাকে ছেড়ে বাঁচা সম্ভব না।ইশার জন্য হলেও আমাকে ছেড়ে যেওনা পর্না।

-কিভাবে বিশ্বাস করি তোমাকে বলত?
-র্পনা, অনিন্দিতার প্রতি করা অপরাধ আমাকে টেনে নিয়েছে ক্ষমা চাইতে।আমার অতীতের ভালোবাসার কাছাকাছি থাকার একটা তীব্র নেশা যেন পেয়ে বসেছিল।কিন্তু কিছুদিন যেতেই বুঝে গিয়েছি আমি আর বদলে যেতে পারবনা।এক জীবনে আর নতুন পথে চলার সাহস নেই।তোমাদের ছেড়ে থাকা মৃত্যুর সমান।
অঝোরে কাঁদছে সিনান।

পর্না সিনানকে বুকে টেনে নেয়। সেও জানে কি অজানা ভয়ে সে এত দিন কুঁকড়ে ছিল। আজ যেন সমস্ত ভার অশ্রুজলে ধুয়ে গেল।কতটা নির্ভার লাগছে আজ।অনেকদিন পর যেন সেই আগের সিনান। সুখের কনা যেন ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে বুকের সমুদ্রতটে। আর যেন কোন আড়াল নেই।মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানায়।জীবনে সংসার ছাড়া আর কিছুকে ভালোবাসেনি সে।যত বড় ডাক্তারই হোকনা কেন নিজেকে সিনান আর ইশা ছাড়া অসম্পুর্ন মনে করে সে।শক্ত করে সিনানকে আগলে ধরে পর্না।আর এই বাঁধন আলগা করবে না সে।কখনোই না।

কয়েকবছর পরে
একটা চিঠি হাতে সিনান বসে আছে স্টাডিরুমে।খাম খুলতেই ভেতর থেকে একটা ছবি বেড়িয়ে এল। ছবিতে একটা বাচ্চা ছেলের হাত ধরে একটা মেয়ে সমুদ্র তটে হাঁটছে। ছবিটা পেছন থেকে তোলা হলেও সিনান জানে মেয়েটা অনিন্দিতা। একটা অদ্ভুত ভালোলাগায় মনটা ছেয়ে যায় তার।কিন্ত চিঠির ভেতরে তার জন্য কি সত্য লুকিয়ে আছে জানেনা সে।
সিনান,

প্রিয় লিখিনি। কিন্ত তুমি জান প্রিয় লিখি বা না লিখি তুমিই আমার একমাত্র।এই জীবনে তুমি ছাড়াও আমি চলতে জানি কিন্ত আমি পারিনা। আমার মনের প্রতিটি রন্ধ্রে তোমার বসবাস।তোমাকে ছাড়া কিভাবে বাঁচতে হয় তাতো শিখিনি।চাইনি তোমাকে ছাড়া এই জীবনে আগে বাড়তে। জানি পারতামও না।
তাই বাংলাদেশে ফেরাটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।তোমাকে পুরোটা না পাই কিন্ত একটা অংশ তো আমাকে পেতেই হত।তাই তোমাকে কিছুদিন নিজের মত পাওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না। তোমাকে তো জানি নিজের সন্তানকে ছেড়ে কিছুতেই আসতে পারতে না।আমি সেটা ভাবিওনি।তোমাকে ছিনিয়ে আনা কোন কঠিন কাজ ছিলনা।অন্য একটা মেয়ে আমারই কারণে আমার মত কষ্ট পাক সেই অন্যায়টা করতে পারিনি।কিন্ত তোমায় ছাড়া বাঁচা এ জীবনে সম্ভব নয়।তাই শুধু নিজের বাঁচার রসদ সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম।তোমার একটা অংশ নিজের ভেতরে বহন করে জন্ম দিয়েছি।এখন সেই আমার সব।আমার অস্তিত্ব। আমার জীবন।আর বাকিটা জীবন বেঁচে থাকতে সেই যথেষ্ট।ভাবছ তোমাকে কেন জানালাম?

এই চিঠি আর ছবিটা তোমার আমার সাথে করা অন্যায়ের শাস্তি বলতে পার।আমার কোন দোষ ছিলনা।কিন্ত তবুও কেন আমাকেই কষ্ট পেতে হল।আর বাকিটা জীবন তোমার দেয়া উপহার নিয়ে আমি শান্তিতে থাকব।আর তুমি জানবে আরও একজন আছে তোমার তীব্র সত্ত্বার অংশীদার। কিন্ত কোন দিন ছু্ঁতেও পারবে না।আমি দেব না।
কোনদিনও না।
অনিন্দিতা।

চিঠিটা সিনানকে এলোমেলো করে দিল।সে জানে অনিন্দিতা আর তার সন্তানকে সে কখনওই দেখতে পাবেনা।বাকিটা জীবন সে এই পাহাড় সমান বোঝা নিয়েই বাঁচবে।পারবে কি এই দোলাচলে ভালো থাকতে।জীবন সায়াহ্নে যদি তার আত্নজকে কাছে পাবার আকাঙ্খাকে উপেক্ষা না করা যায় তখন?নিজ সন্তান কি জানবেইনা তার কথা।এতটা নিষ্ঠুরতাই কি তার প্রাপ্য?
নিরুপায় পিতার অযত্নলব্ধ সন্তান কি একবারও ক্ষমা করবে তাকে?

লিখেছেনঃ জুহিঁ জাহান