মুক্তধারা

২০১৮তে কি পেলাম আর কি হারালাম

কাজী নাবিলাঃ নতুন বছর এলেই পুরনো বছরের হিসাব-কিতাব বের করে সবাই মোটামুটি লাভ ক্ষতি মিলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। আমিও এর বাহিরে নই। হিসাবের হাল খাতা বের করতেই টের পেলাম যে হিসাবটা অনেকটা সমান সমান। এই হিসাবই এখন বর্ণনা করবো।

কি পেলামঃ
শুরুটা ভালো হিসাব দিয়েই করি। ২০১৮ এর শুরুতে অনেক বড় একটা লক্ষ্য নিয়ে আমার যাত্রা আরম্ভ। আমার পিএইচডি এর পড়াশোনা শুরু হয়। অনেক দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে। অতঃপর প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশে ঘুরতে জাওয়াটাও ভালোই ছিল। ঘুরতে গিয়েই নিজেকে এক নতুন পরিসরে আবিষ্কার করলাম,যে আমি মা হতে চলেছি। সব মিলিয়ে এক অভিনব অভিজ্ঞতা। জীবনের এই এডভেঞ্চারে আরও একটা পর্ব যোগ হল। শেষ পর্যন্ত যা পেয়েছি গত বছরে ভালোই,খারাপ না। কষ্টও পেয়েছি অনেক। সব পাওয়াই তো আর পজিটিভ হয় না। গর্ভবতী মায়ের শরীর যে কতো ভাল-খারাপের মধ্যে দিয়ে যায় তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

কি হারালামঃ
এবার আসা যাক ক্ষতির অংশে। বছরের মধ্যবর্তী সময়ে আমি জানতে পারলাম যে আমার শাশুড়ি দ্বিতীয় বারের মতো স্ট্রোক করেছেন। শোনামাত্রই আমরা বাংলাদেশে যাবার প্ল্যান করে ফেলি এবং যথারীতি যাই জুন মাসের অসহনীয় গরম উপেক্ষা করে। এক মাস ভালোই কেটেছিল। কে জানতো যে এটাই আমার জীবনে শেষ দেখা এবং শাশুড়ির আদর পাওয়া। বছরের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে যখন আমরা দিন গুনছি ভালো খবরের আশায়, ঐ মুহূর্তে দুনিয়ার মায়া ছেড়ে অপ্রান্তের না-ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন তিনি। ভালো মানুষ বেশি দিন বাঁচে না – কথাটার সত্যতার প্রমাণ হাতেনাতে পেয়েছি এবার। খুব কম শাশুড়ি আছেন আমাদের সমাজে যারা ছেলের বউকে নিজের মেয়ের মতো আদর করেন। আমার শাশুড়ি আমার মায়ের চেয়ে বেশি আমাকে আদর করেছেন। এখন আর আমার জন্য হাঁটতে বের হলে কেউ আইসক্রিম কিনে আনবে না, আমি দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকলে আমাকে ঘুম থেকে উঠে নিজে হাতে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিবে না, চুলে গরম তেল মালিশ করে দিবে না। আমার কপালে তার আদর বেশি দিন জুটল না।

২০১৮ তে যা পেয়েছি তার থেকে মনে হয়েছে অনেক বড় কিছু হারিয়েছি। ক্ষণিকের জন্য পেয়েছিলাম তাকে, কিন্তু যা পেয়েছি তা আমার কাছে অনেক মূল্যবান। অনেকের শাশুড়ির কাছ থেকে অনেক দামী উপহার পেয়ে থাকেন, কিন্তু আমি যা পেয়েছি তা আমার কাছে অমূল্যবান সম্পত্তি। উনি শেষ পর্যন্ত আমাকে নিয়েই কথা বলে গেছেন, আমাকে নিয়ে নিজের ছেলের থেকেও বেশি গর্ব ছিল উনার। আমি ছিলাম তার মেয়ে, বাড়ির বউ না। এর থেকে মূল্যবান কিছু মনে হয় না আমাকে আর কেউ কিছু দিতে পারবে।

নতুন বছরে সবাই যখন নতুনকে স্বাগতম জানাতে এবং পুরানো বছরের ছবি দিয়ে ফেসবুক ভর্তি করতে ব্যস্ত, আমি তখন হিসাবের হালখাতা নিয়ে অমূল্যবান এবং অপূরণীয় ব্যক্তিটিকে হারানোর হাহাকারে জর্জরিত। মানুষটির কথা এখন আমার আগামী প্রজন্ম শুধুমাত্র গল্পে শুনেই বেঁচে থাকবেন, মানুষটিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার সৌভাগ্য হল না,এটাই সব থেকে বড় আফসোস।