অনুরণন

হাতে নিয়ে আলোকবর্তিকা

আদৃতার মন ভালো নেই। কিছুদিন হল নতুন একটা শহরে এসেছে তারা,বাবার বদলির সুবাদে। নতুন স্কুলটা একদম ভালো লাগেনি আদৃতার। ক্লাস নাইনে উঠে পুরানো স্কুলের বান্ধবীদের ছেড়ে নতুন স্কুলের মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করতে একটুও ভালো লাগেনা তার। এর আগেও স্কুল বদল হয়েছে তার,সেসব জায়গায় খেলতে খেলতেই নতুন বন্ধু হয়ে গেছিল তার। কিন্তু এই তেরো-চৌদ্দ বছরে এসে সেটা হবার উপায় নেই। কয়েকজন বন্ধু হবার আগ্রহ দেখিয়েছে কিন্তু আদৃতার কারো সাথেই মিশতে ইচ্ছা করেনা। নিজেকে রবিঠাকুরের “ছুটি” গল্পের ফটিক মনে হয়,তেরো-চৌদ্দ বছরের বালাই মনে হয়। রোজ স্কুল থেকে ফিরেই কান্নাকাটি,পুরানো বান্ধবীদের জন্য।ওরা অবশ্য নিয়ম করে আদৃতাকে চিঠি লেখে,ওগুলোই একটু মন ভালো করা।

আদৃতার ভাই-বোন নেই।নতুন জায়গার নিঃসঙ্গতা তাকে কুরে কুরে খায়।অনেক মন খারাপের মাঝে সে আপন করে নেয় তার পড়ার বই আর গল্পের বইগুলোকে।তারপর…..এক অবাক করা কান্ড ঘটে।আদৃতা বরাবর ভালো ছাত্রী ছিল কিন্তু কখনো টানা প্রথম হয়নি সে।এবার সে টানা প্রথম হতে লাগল আর তারপরের গল্পটা পিছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

গল্পটা বলা শেষ করে সামনে বসা রিনির হাতটা শক্ত করে ধরে সে।আদৃতা এখন একটা স্বনামধন্য সরকারি হাসপাতালের ইন্টার্ন ডাক্তার।আর রিনি তার ওয়ার্ডে সদ্য ভর্তি হওয়া রোগী।তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সের একটি ফুটফুটে মেয়ে,যে কিনা একটা পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়ে বাবা মায়ের বকুনি খেয়ে সুইসাইড করতে গিয়েছিল।প্রয়োজনীয় চিকিতৎসা পেয়ে রিনি এখন মোটামুটি সুস্থ।ইভনিং ডিউটিতে রোগীর চাপ কম থাকায় আদৃতার মনে হল রিনিকে একটু কাউন্সিলিং করা যাক।কারণ সে জানে,বিষণ্ণতার পিছনের গল্পগুলো যত তুচ্ছই হোক না কেন,কোনও কোনও বয়সে গিয়ে একটু সমমর্মিতা আর অনুপ্রেরণার অভাবে সেগুলো ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

পরদিন সকালে হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায় রিনি।যাওয়ার আগে আদৃতাকে কথা দিয়ে যায়,এবার থেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করবে সে,একটুতে আর ভেঙে পড়বে না।রিনির চোখে কৃতজ্ঞতার হাসি,নতুনভাবে বাঁচতে চাওয়ার প্রত্যয়।

লিখেছেনঃ ডাঃ মৌমিতা ধর