অনুরণন

বেস্ট ফ্রেন্ড

সুস্মিতা জাফরঃ মাঝে মাঝে মিতার মনে হয় ছোটবেলার জীবনটা কত আজবই না ছিল, একদিকে বাবা-মার শাসনে পরাধীন একটা সময় আর একদিকে কাছের খুব প্রিয় বন্ধুদের সাথে কাটানো অবাধ শিশুবেলা।

১৯৯৫ সালের ৩১ শে জানুয়ারি,ভিকারুননিসা নূন স্কুলে মিতার প্রথম দিনের ক্লাস, বহু পড়াশোনা করে ওই অতটুকু বয়সেই তাকে মেধার জোড়ে চান্স পেতে হয়েছিল দেশ সেরা স্কুলটাতে,পরদিনই বন্ধুত্ব হয় নিষার সাথে,মিতা মুসলিম, নিষা হিন্দু,অথচ এই নিয়ে তাদের বন্ধুত্বে কোন কালেই কোন প্রশ্ন ওঠে নি, নিষা ক্লাসে ১ম হত কিন্তু মিতা কোন মতে পাশ নাম্বার তুলতে পারলেই আনন্দে লাড়ে লাপ্পা হয়ে যেত-শুধু ১ম হয়ে নিষা যেসব মজার মজার বই উপহার পেত সেগুলো ধার করে পড়তে পারার মাঝেই ছিল মিতার যাবতীয় সুখ!! নিষা মন খারাপ করে ভাবত, ওর বন্ধুটা এত হাবলু কেন,এত অল্পতেই খুশি থাকে কীভাবে মেয়েটা?

নিষা কী দারুন সব ছবি আঁকত,কী নিখুঁত সেলাই এর কাজ জানত,আর মিতা কিচ্ছু পারতনা,পরীক্ষার সময় মিতার সেলাইটাও নিষা ই করে দিত!! নিষা যেমন ছিল খুবই গোছানো স্বভাবের ঠিক তেমনি মিতা ছিল দারুন এলোমেলো,প্রচুর ঝগড়া করত তারা মিতার অভিমান ছিল বেশি,সে কথায় কথায় ‘জীবনের আড়ি’ নিয়ে হেড ডাউন করে থাকত, নিষা আবার বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারত না, সে মাথার নিচে গুজে থাকা মিতার আঙুল বের করে জোড় করে ‘জীবনের ভাব’ নিয়ে নিত!!

ঝগড়া হলেও দুইজনে ছুটির পর শেডের নিচে দাঁড়ায় একে অপরকে পাহাড়া দিত গার্জিয়ান না আসা পর্যন্ত কেন যেন নিষার আব্বু কিংবা ড্রাইভার দূর থেকেই বুঝতে পারতেন ওরা আজ মহা ঝগড়া করেছে,আংকেল এসে হেসে জিজ্ঞেস করতেন, ” কী, দুই বন্ধুতে খুব ঝগড়া হল,নাকি??” আর ওরা দুইজন অবাক হয়ে ভাবত আব্বুরা কী করে যে সবকিছু বুঝে ফেলে,কে জানে?

ক্লাস টু থেকে থ্রি তে ক্লাসরুম চেঞ্জের সময় নিষা শক্ত হাতে ধরে রাখত মিতার ব্যাগ, যেন সে অন্যান্যবারের মত আবার ভুল করে অন্য কারো পাশে বসে না পড়ে,একবার ক্লাস থ্রি তে ‘my best friend’ paragraph লিখতে দেয়া হল। মিতা আর নিষা দুইজন ই রুমাল দিয়ে ঢেকে লিখতেসিল কে তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড,নিষার রুমালটা লুকিয়ে লুকিয়ে সরিয়ে মিতা দেখে নিল, খাতায় কার নামটা শোভা পাচ্ছে, সেই থেকে মিতা ক্লাস টেন পর্যন্ত একজনকেই বেস্ট ফ্রেন্ড মানত,সে হল নিষা অথচ অবাক হলেও সত্যি, ক্লাস ফোর এর পর নিষা ভারত চলে গেলে আর কখনো তাদের দেখাই হয় নাই, ক্লাস সেভেনের পর আর কোনদিন কথাও হয় নাই!! মিতা প্রায়ই স্বপ্ন দেখত নিষা তার সাথে স্কুলে এসে খেলছে,ঘুম ভাংগার পর তার ভীষণ মন খারাপ হত।

১৯৯৮ এ মিতা চলে এল মর্নিং শিফট, কিন্তু নিষা ডে শিফটেই রয়ে গেল,তাই বলে ওদের নিয়মিত দেখা এবং ফোনে আশ মিটিয়ে ঝগড়া করা কোনটাই থেমে থাকল না!! মিতা ছুটির পর অপেক্ষা করত নিষা কখন আসবে, তারপর দুজনে এক চোট ঝগড়া করে তবেই বাসায় ফিরত! এভাবে একদিন নিষা ভারত চলে গেল,যাওয়ার আগে একদিন মিতার বাসায় কার্ড,পিজ্জা,কলম আর ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ নামের গল্পের বই উপহার নিয়ে এসেছিল যেগুলো ১৯ বছর পরেও মিতা যত্ন করে তুলে রেখেছে ড্রয়ারে!!

এরপর মিতা হারিয়ে ফেলল তাকে, ফেসবুক বের হবার পর কত যে খুজল, পেল না! যখন একদম আশা ই ছেড়ে দিল, ঠিক তখনই ১৪ বছর পর ২০১৫ তে মেসেঞ্জারে একটা এ মেসেজ পাঠাল নিষা, তারা দেখা করল বছর শেষে,১৭ বছর পর!!! নিষা ঠিক সেভাবেই মিতাকে গভীর আলিঙ্গন করল যেভাবে করেছিল ৯৭ এ,মিতা যেদিন ডে শিফটে শেষ ক্লাস করল, সেই শেষ ক্লাসের দিন নিষাকে কাদতে দেখে মিতা খুবই চমকে গেসিল, নিষা শক্ত হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে তার জন্য কাঁদছে,তাকে মিস করবে বলে কেউ আজ কাঁদছে!!

মিতা জানেনা, নিষা আজও তাকে মিস করে কিনা,তবে মিতা করে,হঠাত হঠাত খুবই মিস করে, খুবই ইচ্ছা করে ক্লাস ওয়ান থেকে থ্রিতে ফিরে যেতে…